বিশ্ববাজারের প্রভাবে দেশেও হু হু করে বাড়ছে স্বর্ণের দাম, যার প্রভাবে বিক্রি কমেছে গয়নার। বুধবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম ওঠেছে। আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
দেশের বাজারে এক মাস আগে অর্থাৎ অগাস্টে এক ভরি স্বর্ণের যে দর ছিল তার থেকে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে এখন। এক মাসের ব্যবধানে কিনে রাখা এক ভরি স্বর্ণের দর বেড়ে গেছে ২০ শতাংশের মতো।
স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু দেশে নয়, গোটা দুনিয়ার কোথাও কোনো পণ্যের দাম এতটা বাড়েনি। কিন্তু এর কারণ কী? ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশে স্বর্ণ ধরে রাখতে তাদেরও দাম বাড়াতে হয়েছে, না হয় সব স্বর্ণ চলে যাবে সীমান্তের বাইরে অন্য কোনো দেশে।
এমন পরিস্থিতিতে দেশে সার্বিকভাবে স্বর্ণ কেনা-বেচা ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশের মত কমে গেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বজুড়ে অস্থিতিশীল সময়ে সোনাকে ‘মূল্য সংরক্ষণের’ মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। এবছর এখন পর্যন্ত সোনার দাম বেড়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ, ২০২৪ সালে যা ছিল ২৭ শতাংশ।
বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির পারদ কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউিইয়র্ক সুদহার কমিয়ে দেওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। এতে ডলারের দরও কমে যাচ্ছে।
মুনাফা ধরে রাখতে কয়েকটি দেশ ফেডারেল রিজার্ভের এই সিদ্ধান্তে স্বর্ণে বিনিয়োগ শুরু করেছে। ফ্রান্স ও জাপানে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলমান থাকায় বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, ইউক্রেইন সংঘাত, ফ্রান্স ও জাপানের রাজনৈতিক অস্থিরতা- এসব কিছুও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়াচ্ছে।
কয়েকটি দেশ ডলারের সঙ্গে স্থানীয় মুদ্রা বিনিময় হার ধরে রাখতে স্বর্ণের মজুতও করে চলছে। সেই তালিকায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে চীন। এমনকি প্রতিবেশি দেশ ভারতও স্বর্ণের মজুত বাড়াচেছ। তাতে বাংলাদেশেও স্বর্ণের বার ও গয়না প্রবেশে খরচ বেড়েছে ব্যবসায়ীদের।
বাংলাদেশে ব্যবহৃত স্বর্ণের প্রায় পুরোটাই অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে আসে, যার বেশিরভাগই চোরাই পথে। এছাড়া কিছু আসে প্রবাসীদের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত অবস্থায়। আর কোনো প্রবাসী বেশি পরিমাণে আনতে চাইলে প্রতি ভরিতে ৫ হাজার টাকার শুল্ক পরিশোধ করতে হয়।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এর দর নির্ধারণ সংক্রান্ত কমিটির চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান বলেন, ‘আমরা তো দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্রেতা। আমাদের কাছে কেউ বার নিয়ে আসে বা কেউ পুরাতন গয়না নিয়ে আসে। তা দিয়ে নতুন ডিজাইন বানাই বিক্রি করি।’
‘এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমাদের দেশেও বাড়াতে হবে। কারণ হল, এটা না বাড়ালে স্বর্ণ তো দেশে থাকবে না। সব চলে যাবে।’
বিশ্ব বাজারের ডলারের সঙ্গে স্বর্ণের দাম উঠানামার বিষয়টি প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করে বাজুস ও পুরান ঢাকার তাঁতী বাজারের একটি দল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের একজন বলেছেন, ব্লুমবার্গ, ওর্য়াল্ড গোল্ড কাউন্সিল ও কয়েকটি আন্তর্জাতিক বুলিয়ান এক্সচেঞ্জ প্রতি মূহূর্তে স্বর্ণের দামের সঙ্গে অন্যান্য মুদ্রার বিনিময় হার প্রকাশ করে।
সেই দরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশে স্বর্ণের বাজার দর ঠিক করা হয়। দর নিয়ে বিশৃঙ্খলা এড়াতে সারা দেশের ব্যবসায়ীদের ঠিক করে দেওয়া দরে স্বর্ণ বিক্রির নির্দেশনা দেয় বাজুস।
উল্লেখ্য, গেল ৩০ আগস্ট ২২ কারেটের প্রতি গ্রাম স্বর্ণের দর ছিল ১৪ হাজার ৯৪৫ টাকা। সবশেষ বুধবার তা হয় ১৭ হাজার ৯২৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতি গ্রামে বেড়েছে ২ হাজার ৯৮২ টাকা বা ১৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এতে এক ভরিতে (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম বেড়েছে ৩৪ হাজার ৭৮২ টাকা।
সময়ের আলো/এআর