জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের রায় দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন শহিদ পরিবার এবং আহতরা। পাশাপাশি পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পাঁচ বছরের সাজার রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ এবং রায় প্রত্যাখ্যান করে ন্যূনতম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দাবি করেছেন তারা।
দ্রুত রায় কার্যকর চায় শহিদ পরিবার ও আহতরা
আইজিপির রায় পুনর্বিবেচনার দাবি
এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণার পাশাপাশি জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের রাজনৈতিক ভূমিকা তদন্ত করে জুলাই গণহত্যায় অভিযুক্ত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
তারা বলছেন, রায় কার্যকর হওয়ার আগপর্যন্ত শহিদ পরিবারগুলোর স্বস্তি নেই। মামুনের নির্দেশনা অনুযায়ীই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর বর্বর গণহত্যা চালিয়েছে। সেই তুলনায় ৫ বছরের সাজা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যূনতম যাবজ্জীবন সাজা আশা করেছিল সবাই।
সোমবার (১৭ নভেম্বর) বিকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় আহত ও জুলাই শহিদ পরিবারগুলো এ অসন্তোষ জানান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সেমন্তী বলেন, সাবেক আইজিপি মামুন যেহেতু রাজসাক্ষী হয়েছেন, সেই পরিপ্রেক্ষিতে তাকে পাঁচ বছরের সাজা শোনানো হয়েছে। তবে এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমাদের দাবি, সে যতটুকু যা অপরাধ করেছে পাঁচ বছর কিছুই না।
সেমন্তী আরও বলেন, আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের ফাঁসি দেখতে পাচ্ছি ততক্ষণ আমাদের লড়াই বন্ধ রাখব না।
শহিদ মুগ্ধর ভাই মীর স্নিগ্ধ বলেন, আমার ভাইকে রাস্তায় মেরে রক্তাক্ত করা হয়েছে। আমার ভাইয়ের রক্ত রাস্তায় পড়েছিল। আইনের কথা আমি এখন ভাবছি না। মানবিক দিক থেকে, শহিদ পরিবারগুলোর মানসিক অবস্থার দিক থেকে বিষয়টা দেখার অনুরোধ করি। মামুনের ৫ বছর সাজা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, তার শাস্তি ফাঁসি হওয়ারই কথা ছিল। কিন্তু আমরা চাইছি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
শহিদ মীর মুগ্ধর বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই রায় সঠিক দিকের একটি পদক্ষেপ। তবে এটি কেবল শুরু। তিনি জানান, তাদের পরিবারের সঙ্গে অন্য শহিদ পরিবারগুলোর প্রত্যাশা, দোষীদের দণ্ড কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তাদের মুখে প্রকৃত হাসি ফুটবে না।
তার ভাষায়, যে ঘটনার বিচার হচ্ছে তা দেশের ইতিহাসের একটি বড় ট্র্যাজেডি। এ রায় কিছুটা আশা জাগালেও পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের পূর্ণতা দেখতে চায় দণ্ড কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে।
তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা মানবকন্যা নন, তিনি দানবকন্যা। তার যে দানবতা আমরা দেখেছি, তার জন্য শুধু ব্যক্তি নয়, তার দল আওয়ামী লীগকেও নিষিদ্ধ করা উচিত। এ জন্য ফ্যাসিস্ট বলা হলেও কম বলা হয়। এই দল জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান করেছে। রাষ্ট্রকে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলীয় জোটের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের দমনে যারা রাজনৈতিকভাবে সহযোগিতা করেছে, জাতীয় পার্টি হোক বা ১৪ দল, তাদের ভূমিকা তদন্ত করে জুলাই গণহত্যায় অভিযুক্ত করা উচিত। রাজনৈতিকভাবে যারা এই ঘটনার পেছনে ছিল, আগামী সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।
রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় শহিদ মিরাজের বাবা আবদুর রব বলেন, আমরা কোনো ব্যক্তি নয়, পুরো ঘটনার বিচার চাই। আওয়ামী লীগ যেভাবে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে হত্যার নির্দেশ দিয়েছে, সেটা শুধু একজন নেতার সিদ্ধান্ত হতে পারে না। জাপা ও ১৪ দল সে সময় যেভাবে সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে, সেই রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া এত বড় গণহত্যা সম্ভব ছিল না। আমরা চাই তাদের ভূমিকারও বিচার হোক।
রায়ের পর আদালতপাড়ায় জড়ো হওয়া শহিদ পরিবার ও জুলাই আহতরা জানান, ব্যক্তিগত শাস্তি ঘোষণায় তারা স্বস্তি পেলেও রাজনৈতিক বিচার ও সংঘটিত দায় নির্ধারণের দাবি এখনও পূর্ণ হয়নি।
জেডও/