উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে ঢাকা, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০ টা ৩৮

2025-11-22T20:21:27+00:00
2025-11-22T20:21:27+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে ঢাকা, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৫, ৮:২১ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।  শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০ টা ৩৮ মিনিটে টাঙ্গাইলসহ সারা দেশে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। 

শনিবার (২২ নভেম্বর) সকাল ১০ টা ৩৬ মিটিটেও বাইপাইলে ৩ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। দুটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী। যেটি মধুপুর ফল্টের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে। এছাড়া সন্ধ্যায়ও ৩.৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

গত ১৫-২০ বছরের মধ্যে ঢাকার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় ২০১০ সালে। যেটির মাত্রা ছিল ৫.১।  ১৮৮৫ সালে ঢাকার কাছে মানিকগঞ্জে ৭.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের ইতিহাস রয়েছে। সবশেষ শুক্রবার আঘাত হানে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প। যার উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার কাছের নরসিংদীর মাধবদীতে।

এদিকে ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা। একটি জরিপে জানা গেছে, রাজধানীতে ২১ লাখ ৪৫ হাজার ভবন রয়েছে। ঢাকার নিকটবর্তী মধুপুর ফল্টে (টাঙ্গাইল) ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলেই ঢাকা শহরের কয়েক লাখ ভবন ধসে পড়তে পারে। 

এর অন্যতম কারণ– অধিকাংশ ভবন তৈরির ক্ষেত্রে জাতীয় ভবন নির্মাণ কোড অনুসরণ করা হয়নি। বেশিরভাগ ভবন নির্মাণে সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেই। ৯৫ ভাগ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে অনুমোদিত নকশার বাইরে।

জানা গেছে, চলতি বছর প্রায় সাড়ে ৩ হাজার অবৈধ ভবন চিহ্নিত করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। এসব ভবনের বিরুদ্ধে অভিযানও পরিচালনা করছে সংস্থাটি। তাছাড়া কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই নগরীর বসিলা, ঢাকা উদ্যান ও কেরানীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় শত শত ভবন গড়ে উঠেছে।
 
ঢাকায় ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাব্য ঝুঁকি বাড়ার পেছনে বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। যার মধ্যে রয়েছে– বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এ শহরে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা বহুতল ভবন, বস্তি এবং সরু রাস্তা। তাছাড়া অনেক ভবনই ভূমিকম্প সুরক্ষা মানদণ্ড মেনে তৈরি হয়নি, যা এগুলোকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মাটির গঠনগত দুর্বলতাও ঝুঁকির একটি বড় কারণ। দেশের বড় অংশই আলগা ও জলাবদ্ধ পলিমাটির ওপর গঠিত। শক্তিশালী কম্পনে এই মাটি তরলীকৃত হয়ে যেতে পারে, যা ভবন ধসের কারণ হতে পারে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতায় থাকা ভবনগুলোর ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভবনই ২০ থেকে ৩০ বছর আগে নির্মিত। অনেক জায়গায় রড-সিমেন্টের মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি, আবার কোথাও অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে ভবন তৈরি করা হয়েছে। ফলে সামান্য কম্পনেও এসব ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

শুক্রবার (২১ নভেম্বর) হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানীর ১৪টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসার মো. সালাহ উদ্দীন-আল-ওয়াদুদ। 

তার দেওয়া তথ্যমতে, মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় ১টি, আরমানিটোলায় ১টি, সূত্রাপুরের স্বামীবাগে ১টি, বনানীতে ১টি, কলাবাগানে ১টি, বসুন্ধরায় ১টি, নর্দ্দা এলাকায় ১টি, দক্ষিণ বনশ্রীতে ১টি, মোহাম্মদপুরে ১টি, খিলগাঁও এলাকায় ২টি, বাড্ডা এলাকায় ১টি, মগবাজারের মধুবাগে ১টি এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় ১টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, রাজধানীতে গড়ে ওঠা ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনীয় কি না সেটি নির্ণয়ের মতো প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতি নেই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)। ঢাকায় অনুমোদনহীন ভবনের সঠিক সংখ্যাও জানা নেই তাদের। খাল-বিল নদী দখল করে কত ভবন হয়েছে সেই সংখ্যাও জানা নেই। 

ঢাকায় লাখ লাখ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। এসব ভবন অপসারণ না করেই নতুন নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে ঢাকায় বসবাস করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিকল্পনা করে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন করা দরকার। তা না হলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে দেশে ব্যাপক মানবিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তাই সব নতুন ভবন নির্মাণে নকশা ও বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণ করা দরকার।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারী বলেন, শুক্রবারের ভূমিকম্পটা বড় ভূমিকম্প আসার আগে যে ছোট ছোট ভূমিকম্প হয়, তার অন্যতম। রিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রায় যে ক্ষতি হয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে ৭ মাত্রার হলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেড়ে যাবে, ভেঙে যাবে বহু ভবন, প্রচুর হতাহত হবে। ঢাকার ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে এমন ভূমিকম্প হলে ঢাকায় অনেক ক্ষয়ক্ষতি হবে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. আব্দুল লতিফ হেলালী বলেন, ঢাকা ও আশপাশের ভবনগুলো ন্যূনতম মান বজায় না রেখেই তৈরি হয়েছে, হচ্ছে। এ কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও মারাত্মক। যদিও ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করতে এরই মধ্যে মাটির গুণগতমান পরীক্ষা করে একটি রিস্ক সেনসিটিভ ল্যান্ড ইউজ প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। ভূমিকম্প সহনীয় ব্যবস্থা ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন পরীক্ষার জন্য ‘আরবান সেফটি অ্যান্ড রেজিলেন্স ইনস্টিটিউট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ভূমিকম্প বার্তা দিচ্ছে যে আমাদের এখানে বড় আকারে ভূমিকম্প আসছে। যেটা অনেক দিন ধরে আমরা বলছিলাম। কিন্তু শুক্রবারের ভূমিকম্পে এত বড় ঝাঁকুনির পর এখন ঢাকা শহরের প্রতিটা অধিবাসী অনুভব করতে পারছে বিপদ নিকটে। ভূমিকম্পের মতো বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় ঢাকা শহরে জনসাধারণের আশ্রয় নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ ও খোলা জায়গার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। আতঙ্কিত হয়ে মানুষ যখন হুড়োহুড়ি করে বের হয়ে একটু নিরাপদ বা খোলা জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে, তখন অধিকাংশ এলাকায় সেই খোলা জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না।

করণীয় নিয়ে এই নগরপরিকল্পনাবিদ বলেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। জরুরি ভিত্তিতে কঠোরভাবে ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড ও নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি (বিবিআরএ) গঠন করে দ্রুত বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নিম্নাঞ্চলে নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। জলাধার, বেসিন এলাকা বা পানি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন স্থান ভরাট করে কোনো সরকারি-বেসরকারি উন্নয়নই অনুমোদন করা যাবে না। পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা প্রকাশ ও উচ্ছেদের পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত সব বিপজ্জনক ভবন দ্রুত খালি করতে হবে।

নকশাবিহীন ভবন নিয়ে কী ভাবছে রাজউক?

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন এলাকায় গড়ে ওঠা লাখ লাখ ভবনের অনুমোদিত কোনো নকশা নেই। এগুলো নকশাবিহীন এবং অবৈধ– বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের জানা থাকলেও এগুলো অপসারণ করা বা কঠোর কোনো পদক্ষেপে যেতে পারেনি রাজউক। তবে, শেষ পর্যন্ত এসব স্থাপনা ও ভবনের বিষয়ে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছে সংস্থাটি।

সেই নীতিমালায় প্রস্তাব ও সুপারিশ করা হয়েছে, যেসব ভবন ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে, রাজউকের মাস্টার প্ল্যানের ব্যত্যয় না ঘটিয়ে এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করে গড়ে উঠেছে, সেগুলোকে বৈধতা দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে খসড়া নীতিমালার সুপারিশে বিদ্যমান নকশা অনুমোদন ফি’র তিন থেকে পাঁচ গুণ জরিমানা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, খসড়া নীতিমালাটি নগর উন্নয়ন কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। তারাও বেশকিছু সুপারিশ দিয়েছে।

সময়ের আলো/এআর



  বিষয়:   উচ্চমাত্রা  ভূমিকম্প  ঝুঁকি  ঢাকা  বিশেষজ্ঞ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: