রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ দুলে ওঠে চারপাশ। কয়েক সেকেন্ডের কম্পন থামতেই মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া- হাত চলে যায় মোবাইলের দিকে। প্রশ্ন একটাই: ভূমিকম্পটি কতটা শক্তিশালী ছিল? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত নির্ভর করে তিন উৎসে- ইএমএসসি, ইউএসজিএস এবং আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি)। তিন প্রতিষ্ঠান তিনভাবে তথ্য দেয়, তবে লক্ষ্য একই- তাৎক্ষণিক সতর্কতা এবং নির্ভুল বিশ্লেষণ।
ইউরোপিয়ান-মেডিটেরিনিয়ান সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমএসসি) বর্তমানে ভূমিকম্প সম্পর্কিত সবচেয়ে দ্রুত তথ্যদাতাদের একটি। তাদের সিস্টেম সেন্সর ডেটার পাশাপাশি মানুষের তাৎক্ষণিক অনলাইন আচরণকে ব্যবহার করে।
কোনো অঞ্চলে হঠাৎ গুগল সার্চে ‘ভূমিকম্প’ বাড়লে, লাস্টকোয়েক অ্যাপে ব্যবহারকারীর চাপ বাড়লে, কিংবা সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট ছড়িয়ে পড়লে- ইএমএসসির অ্যালগরিদম তা সঙ্গে সঙ্গে সনাক্ত করে। ফল- সাধারণত দুই মিনিটেরও কম সময়ে প্রাথমিক সতর্কতা। ব্যবহারকারীদের পাঠানো ছবি, ভিডিও ও বর্ণনা যোগ করে তারা পরিস্থিতির বাস্তবচিত্রও তুলে ধরে। তাদের দর্শন সহজ: মানুষই হলো প্রথম ও সবচেয়ে সংবেদনশীল সেন্সর।
আরও পড়ুন
১৮৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভূমিকম্প বিশ্লেষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। গতি নয়, তাদের লক্ষ্য বিশ্লেষণের নিখুঁততা। তাদের শেকম্যাপ জানায় কোন এলাকায় কম্পনের তীব্রতা কত ছিল, পাগার মডেল জানায় সম্ভাব্য প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষতি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির প্রাথমিক পূর্বাভাস।
সবুজ থেকে লাল- রঙ কোডেই বোঝা যায় ক্ষতির মাত্রা। আন্তর্জাতিক সংস্থা, জাতিসংঘ, এমনকি ইঞ্জিনিয়াররাও উদ্ধার পরিকল্পনায় ইউএসজিএসের ডেটাকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসেবে মানেন।
বাংলাদেশে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণের সরকারি দায়িত্বে আছে আবহাওয়া অধিদপ্তর (বিএমডি)। ১৯৫৪ সালে চট্টগ্রামে প্রথম মানমন্দির স্থাপনের পর আগারগাঁও, সিলেট, রংপুর ও গাজীপুরে গড়ে উঠেছে তাদের সিসমিক নেটওয়ার্ক। ডিজিটাল সিস্টেম, উন্নত রাডার এবং রিয়েল-টাইম বিশ্লেষণ যোগ হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে।
দেশের সিসমিক জোন ম্যাপ তৈরি করে, ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে ভূমিকম্পবিষয়ক নির্দেশনা দেয় এবং দেশের জন্য সরকারি ভূমিকম্প তথ্য সরবরাহ করে। মানুষের কাছে জাতীয়ভাবে নিশ্চয়তা পাওয়া যায় এখান থেকেই।
ইএমএসসির গতিময় সতর্কতা, ইউএসজিএসের গভীর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং বিএমডির সরকারি নিশ্চয়তা- এই তিনটি তথ্যই মিলেমিশে ভূমিকম্প পরিস্থিতিকে স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
কম্পন থামার সঙ্গে সঙ্গে আমরা যে তিন জায়গায় ধাবিত হই, তা কৌতূহলের কারণে নয়- নিরাপত্তার প্রয়োজনে। ভূমিকম্প সময় জানায় না, কিন্তু তথ্য পাওয়া যায়- যদি আমরা সঠিক উৎসে কান পাততে জানি।
এএডি/