অতি গোপনীয়তায় লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনাল ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডের কোম্পানির সঙ্গে করা ইজারা চুক্তি বাতিল এবং নিউমুড়িংসহ অন্য বন্দর টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা। একই সঙ্গে আগামী ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে ইজারা চুক্তি বাতিল এবং নিউমুড়িংসহ অপরাপর বন্দর বিদেশিদের ইজারা দেওয়ার তৎপরতা বন্ধ না করলে আগামী ৪ ডিসেম্বর ১১টায় প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেন নেতারা।
রোববার (২৩ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাম জোট আয়োজিত সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল থেকে এ দাবি জানানো হয়।
বাম জোটের সমন্বয়ক ও বাসদ সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদের (মার্কসবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আব্দুল আলী। সমাবেশ পরিচালনা করেন বাসদ কেন্দ্রীয় বর্ধিত ফোরামের সদস্য খালেকুজ্জামান লিপন।
নেতারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার জনমত উপেক্ষা করে পতেঙ্গার লালদিয়ার চরে কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৪৫ বছরের জন্য চুক্তি করেছে। এ ছাড়া কেরানীগঞ্জে অবস্থিত পানগাঁও নো টার্মিনালটি ২২ বছরের জন্য পরিচালনা করতে সুইজারল্যান্ডের মেডিটেরানিয়ান শিপিং কোম্পানি মেডলগ এস প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। অথচ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে ২০১৩ সালে ১৫৬ কোটি টাকায় এই টার্মিনাল গড়ে তোলে। গত ১৭ নভেম্বর যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ অপরাধীদের বিচারের রায় হচ্ছে এবং দেশের জনগণের দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ করে হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই দুটি দেশবিরোধী চুক্তি করেন। এর আগে প্রয়োজনীয় বোর্ড সদস্য ছাড়াই অনুমোদন নিয়ে সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় মূল্যায়ন কমিটিকে পাশ কাটিয়ে ৭ ও ৮ নভেম্বর সাপ্তাহিক ছুটির দিনে চুক্তির নেগোশিয়েশন ও চূড়ান্ত দলিলের কাজ শেষ করেন।
তারা আরও বলেন, সরকারের এই ধরনের চুক্তি করার কোনো এখতিয়ার নেই। সরকারের উচিত দ্রুত নির্বাচন দিয়ে চলে যাওয়া। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত স্থানে বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর নির্মাণ ও পরিচালনা জন্য ইজারা দেওয়া সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। সরকারের দেশবিরোধী এই তৎপরতার বিরুদ্ধে বন্দর শ্রমিকসহ দেশপ্রেমিক জনগণ রাস্তায় নামছে। স্কপ আগামী ২৬ নভেম্বর বন্দর প্রবেশমুখ অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বাম জোটের সমাবেশ থেকে স্কপের ওই কর্মসূচির প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন ব্যক্ত করা হয়।
বন্দর অবরোধেও থাকছে বাম জোট : এদিকে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল এবং লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার ভার বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার প্রতিবাদে ‘শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের’ (স্কপ) অবরোধ কর্মসূচিতে একাত্মতা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও বাম গণতান্ত্রিক জোট। গতকাল রোববার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটির সঙ্গে যুক্ত ৪৭টি শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সভা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংগঠনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম পুরাতন রেল স্টেশন চত্বরে সমাবেশ থেকে অবরোধ সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা।
বাংলাদেশ সড়ক ফেডারেশনের বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মুছার সভাপতিত্বে এ সভা হয়। সভায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন পূর্বাঞ্চল (চট্টগ্রাম ও সিলেট) কমিটির সভাপতি মৃণাল চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। মৃণাল চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের পাশে দেশের নৌবাহিনীর দফতর, তেল শোধনাগার কেন্দ্র ও বিমানবন্দর রয়েছে। এ ধরনের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশে চট্টগ্রাম বন্দর ‘দুবাই-ভিত্তিক মার্কিনীদের’ তত্ত্বাবধানে গঠিত ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের’ হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
বন্দর পরিচালনা ব্যবস্থাপনা এবং তাদের অবাধ যাতায়াত অধিকার দেওয়ার কারণে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকি বলেও মনে করেন শ্রমিক নেতা মৃণাল চৌধুরী। সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম বিভাগীয় আঞ্চলিক কমিটির কার্যকরী সভাপতি রবিউল মওলা ও সাধারণ সম্পাদক অলি আহামদ।
রোববার বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাসদ (মার্কসবাদী) চট্টগ্রাম জেলা সমন্বয়ক শফি উদ্দিন কবির আবিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি অশোক সাহা, বাসদ নেতা আল কাদেরি জয় ও আহমেদ জসিম। গত শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জুলাই বিপ্লব হলে স্কপের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কনভেনশন থেকে ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এএডি/