শুঁটকি মাছ পছন্দের তালিকায় নেই, এমন বাঙালি খুব কম পাওয়া যাবে। আগে খাল, বিল, নদীতে প্রচুর মাছ ছিল। মানুষ খাওয়ার প্রয়োজন মিটিয়ে মাছের শুঁটকি তৈরি করত। নদীর নাব্যতা, দূষণ, খাল, বিল ভরাটের কারণে খাওয়ার মাছ জোগাড় করা কঠিন। শুঁটকির জন্য সামুদ্রিক মাছের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ কারণে নিত্যপণ্যের বাজারে প্রায় সব পণ্যের মতো নীরবে বাড়ছে আমিষজাত খাবার শুঁটকির দাম। গত এক বছরের ব্যবধানে ছুরি, ফাঁইস্যা, লইট্যাসহ প্রায় সব ধরনের শুঁটকিতে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি। ছোট ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার কথা বললেও বড় ব্যবসায়ীরা বলছে স্বাভাবিক রয়েছে। বিষয়টি তা নয়, বাজারে দেশের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি পণ্যটির অবস্থা ক্রমেই সংকটাপন্ন। দেশের সাগর, নদী, খাল, বিল ও পুকুরে মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় শুঁটকি উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে। পাশাপাশি বিদেশি শুঁটকি বাজার দখল করে নিয়েছে। বর্তমানে দেশের শুঁটকির প্রায় ৬০ শতাংশই আমদানি হয়ে আসে ভারত ও মিয়ানমার থেকে, যা মূলত স্থলবন্দর ও চোরাইপথে প্রবেশ করে। এই বিদেশি শুঁটকির বাজার দখলে থাকায় দেশের শুঁটকি শিল্পের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে এগোচ্ছে। নানা সংকটে শুঁটকি উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছে উৎপাদকরা।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- অপ্রতুল উৎপাদন ও উচ্চ শুল্কের কারণে দেশের শুঁটকিপল্লীগুলো ধীরে ধীরে বন্ধের পথে। উৎপাদকরা পেশা পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকছেন। চট্টগ্রামের হিমাগারে এখন পড়ে আছে প্রায় ৪০ লাখ টাকার শুঁটকি, যা বিক্রি হচ্ছে না। বিষের ভয়ে অনেক মানুষ শুঁটকি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। এসব পরিস্থিতির মাঝে শুঁটকি রফতানি এখনও আশার আলো দেখাচ্ছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বছরে ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার শুঁটকি বিদেশে রফতানি হয়। এই রফতানি মূলত হংকং, সিঙ্গাপুর, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডে হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে রফতানি আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছে, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শুল্কের মাধ্যমে এই শিল্পের বিকাশ সম্ভব।
বাংলাদেশের শুঁটকি বাজারে বিদেশি শুঁটকির দাপট বাড়ছে। দেশের উৎপাদিত শুঁটকি কমে যাওয়ায় ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি বেড়েছে। আসাদগঞ্জের বৃহত্তম শুঁটকি আড়ত থেকে প্রতিদিন অন্তত ২ লাখ কেজি শুঁটকি বিক্রি হয়। এই বাজারে মূলত লইট্টা, ছুরি, চিংড়ি, রূপচাঁদা ও মলা মাছের শুঁটকি বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। দামও তুলনামূলকভাবে বেশি, যার ফলে স্থানীয় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুঁটকি তৈরির জন্য মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ ও রফতানি আয় দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা নানা বাধার সম্মুখীন। আড়তদারদের ঋণ ও বকেয়া টাকা, শুল্কের উচ্চহার ও মাছের সংকট এসবের মধ্যে প্রধান। এ ছাড়া বিষের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী ও সমুদ্রে মাছ কমে যাওয়া ও দূষণের কারণে মাছের উৎপাদন অনেক কমে গেছে। এ পরিস্থিতি দ্রুত উন্নত না হলে, দেশের ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলের উচিত, এ শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। সহজ শুল্ক, প্রণোদনা ও মাছের পর্যাপ্ত সরবরাহের মাধ্যমে শুঁটকি উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাইরে থেকে আসা বিদেশি শুঁটকি নিয়ন্ত্রণ ও মানসম্মতভাবে উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। তা হলেই দেশের অর্থনীতিতে এ শিল্পের অবদান বাড়বে এবং দেশের বাজারে ঐতিহ্যবাহী এ পণ্যটির বিকল্প থাকবে না। দেশে মাছের উৎপাদন ও পরিবেশের উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মাথায় রেখে শুঁটকি উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানো জরুরি। না হলে এ শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। সংশ্লিষ্টরা মাছের শুঁটকি উৎপাদন বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে- না হয় দেশের এ পণ্যটি ক্রমাগত নাগালের বাইরে চলে যাবে।
সময়ের আলো/এসকে