ইসলামে বিয়ে সুন্নত। গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও। মুসলিম নারী-পুরুষের বিয়েতে প্রথমে একপক্ষকে প্রস্তাব দিতে হয়। অপরপক্ষকে বিয়ে সংঘটিত হয় এমন শব্দে গ্রহণ করতে হয়। সেখানে সাক্ষীর উপস্থিতিও অত্যাবশ্যক।
দেশের আইন অনুযায়ী, সরকারি নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজির মাধ্যমে বিয়ের রেজিস্ট্রেশন বা নিবন্ধন করতে হয়। এটিকে কাবিননামা বলে। কাবিননামা মুসলিম বিয়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি। এটি ধর্মীয় ও সামাজিক দিক সুরক্ষিত করে। বিয়ের সময় বর এবং কনের মধ্যে যে চুক্তি সম্পন্ন হয়, এর সব শর্তাবলি ও দায়বদ্ধতা এই নথিতে অন্তর্ভুক্ত থাকে।
এই কাজি পদে এত দিন পর্যন্ত শুধু আলিম সনদধারীরা চাকরি করতে পারতেন। আবেদন করার সুযোগও ছিল শুধু তাদের। গতকাল আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ঘোষণা দিয়েছেন, দাওরায়ে হাদিস সনদধারীরাও কাজি হতে পারবেন। তিনি বলেছেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করার মাধ্যমে কওমি মাদরাসার উচ্চ ডিগ্রি অর্জনকারীদের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি উন্মুক্ত করে দিল। এই সংশোধনের ফলে কওমির ডিগ্রিধারীরা সরকারিভাবে স্বীকৃত এই পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেলেন।’
এর আগে গত ৫ আগস্ট ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন দাওরায়ে হাদিস সনদধারীদের নিকাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্স দিতে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টাকে উদ্যোগ নিতে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্ট্যাডিজ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. হাফেজ এবিএম হিজবুল্লাহ বলেনে, ‘বিষয়টিকে আমি ইতিবাচক দেখছি। এ জন্য সরকারকে আন্তরিক মোবারকবাদ। পাশাপাশি ধর্ম উপদেষ্টাকেও মোবারকবাদ জানাতে হয়। তিনি ডিও লেটার পাঠিয়েছিলেন। যে কারণে আইন মন্ত্রণালয় আইন সংশোধন করে ও প্রজ্ঞাপন জারি করে কওমি মাদরাসার ছাত্রদের জন্য কাজি হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।’
ঢাকার টঙ্গীর আন নূর জামে মসজিদের খতিব ও মাদরাসা আবু রাফে (রা.)-এর পরিচালক মাওলানা আলী হাসান তৈয়ব বলেন, ‘কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস সনদধারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজি হতে পারবেন—ব্যাপারটি ইতিবাচক। সরকারকে ধন্যবাদ। এতে মানুষের বড় উপকার হয়েছে, আগে বিয়ে রেজিস্ট্রারের জন্য কাজি আনতে হতো, পড়ানোর জন্য আনতে হতো আলেম। এখন একজন আলেমই দুটি কাজ করতে পারবেন। কাজিরা আলেম না হওয়াতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শরয়ি মাসয়ালাগুলো আলেমদের মতো জানেন না, তারা না বুঝেও অনেক মাসয়ালা দেন। এখন আলেমরা সুযোগ পাওয়ার কারণে শরয়ি বিষয়টা সঠিকভাবে পরিপালন হবে।’
নারায়ণগঞ্জ বন্দরের জামিয়া বাইতুল কুরআন মাদরাসার শাইখুল হাদিস মুফতি জুনাইদ আহমদ ফয়েজী বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয়ের এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে কওমি শিক্ষার্থীদের একটি কর্মক্ষেত্র বৃদ্ধি পেল। যদিও সনদের মান ও কর্মক্ষেত্রের মান একই পর্যায়ের নয়। তবে এর মধ্য দিয়ে তো আমাদের শিক্ষাব্যব্স্থার একপর্যায়ের স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হলো। এটাতে আমি আশার আলো দেখছি। ক্রিটিক করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না।’
দেশের শীর্ষ আলেমরা মনে করেন, কওমি শিক্ষার্থীদের সরকারি বিভিন্ন সেক্টরে কাজের সুযোগ দেওয়া উচিত। তারা প্রচণ্ড মেধাবী। তারা একনিষ্ঠভাবে দেশের কল্যাণে কাজ করবে। বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক পদে আলেমদের নিয়োগ দিতে জোর দাবি জানান তারা। ড. হাফেজ এবিএম হিজবুল্লাহ বলেন, আমাদের কওমির ছাত্ররা বেশ প্রতিভাবান, তারা দেশের বিভিন্ন সেক্টরে অবদান রাখতে সক্ষম। বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকেই শিক্ষক হিসেবে দেশ ও জাতির সেবা করছেন। শিক্ষা গবেষণায় অবদান রেখে চলেছেন। শুধু কাজি পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাইমারি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক লেভেলেও তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। আমি সরকারকে বলব, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে কওমি ছাত্রদের দেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণের সার্বিক সুযোগ-সুবিধা অবারিত করুন।
কেউ কেউ কাজির পদ ছোট করে দেখছেন, এটা উচিত নয় বলে মনে করেন আলী হাসান তৈয়ব। তিনি বলেন, ‘দাওরায়ে হাদিস পাসের পর যে এ চাকরিতে নিজেকে যোগ্য মনে করবে, সে করবে। অন্যদের ভালো কিছু করার সুযোগ থাকলে, করবে। অনেক অযোগ্য আছেন, গ্রামে মাদরাসা করে শিক্ষকদের ৪-৫ হাজার টাকা মাসিক বেতন দেন। এটা তো অমানবিক। এর থেকে তো কাজি—সরকারি পদ—ভালো পদ। এখানে আয়-উপার্জনের সুযোগ আছে। কাজি পদ সৃষ্ট হওয়া নিয়ে সমালোচনা করা উচিত নয়।’
আরআর