গুম কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেছেন, গুম যে ধরনের ক্ষত তৈরি করে সমাজে, সেগুলো চোখে দেখা যায় না। সেগুলো অনুভব করা যায়। এ কারণে দেশে আর গুম থাকতে পারবে না। এটা চূড়ান্ত।
মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বেগম রোকেয়া পদক ২০২৫ গ্রহণকালে তিনি এসব কথা বলেন। বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এদিন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার হাতে পদক তুলে দেন।
ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, আমি গুম কমিশনের সদস্য। আমাদের অবস্থান হচ্ছে, গুম বাংলাদেশে ফিরতে পারবে না। অনেক কিছু হয়তো ফিরবে, কিন্তু গুম ফিরতে পারবে না। কেন ফিরতে পারবে না, আমি উদাহরণ দিয়ে বুঝাচ্ছি—একজন বাবা—তৎকালীন আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী দলের কর্মী ছিলেন। তিনি গুম হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে তার বাচ্চা হয়। বাচ্চা প্রিম্যাচিউট বা অপরিপক্ক ছিল। তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। প্রিম্যাচিউট বাচ্চাকে সাথে সাথে এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। বাচ্চাকে কোলে নেওয়ার আগে তিনি গুম হন। আমাকে বলেছিলেন যে, আয়নাঘরে তাকে একটা ছোট পানির বোতল দেওয়া হয়েছিল। যখনই বাচ্চার কথা মনে পড়ত, তখন বোতলটাকে কোলে নিয়ে বসে থাকতেন তিনি।
আরেকজন বাবা—গ্রামের সাধারণ কবিরাজ—আমার অফিসে এসেছিলেন। দুপুরে আমি তাকে বিফ খিচুড়ি খাওয়ার অফার করি। তিনি কিছুতেই খাবেন না। আমি তাকে না খাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করি। তখন জানালেন, তিনি গুম থাকা অবস্থায় তার পরিবার প্রচণ্ডরকম অর্থের কষ্টে ছিলেন। তারা অনেক সময় না খেয়ে ছিল। গুম পরবর্তী সময়ে তিনি বিফ খিচুড়ির মতো লাক্সারিয়াস খাবার খেতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন না। এ কারণে তিনি আর সেদিন আমার এখানে খাননি।
আরকজন বাবা আমাকে বলেছিলেন, তিনি যখন বন্দী ছিলেন—পরিবার এতটা অর্থের অভাবে ছিলেন—চিকিৎসার টাকা দিতে পারেনি বলে তার দুটি সন্তান মারা যায়। তিনি যখন গুম থেকে বের হন, তার আর কোনো সন্তান ছিল না।
গুম কমিশনের এ সদস্য বলেন, গুমের লড়াইয়ে খুব নীরব কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী সৈনিক নারীরা। গুম হওয়া ব্যক্তির পক্ষ হয়ে নারীরা অবিরাম লড়াইটা জারি রাখে? কে বাঁচিয়ে রাখে তার স্মৃতি? কে তার বাচ্চাদের আগলে রাখে? কে কোর্ট-কাচারিতে দৌড়ায়? কে সংসারের হাল ধরে? সর্বক্ষেত্রে উত্তরটা হলো—নারী।
পদক তার একক অর্জন নয় উল্লেখ করে নাবিলা ইদ্রিস বলেন, এই পদক আমার একক অর্জন নয়, এটি সামষ্টিক অর্জন। গুম কমিশনে আমার সহযোদ্ধারা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। এই স্বীকৃতি তো তাদের বটেই; তবে পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নিরাপত্তা সংস্থার অনেক ব্যক্তি—আমি জানি তারা খুব সাহসের সঙ্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ইনসাফের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের দেশপ্রেম এবং ত্যাগী মনোভাব আমাকে সত্যি চমৎকৃত করেছে। আমি তাদের কাছে প্রচণ্ড কৃতজ্ঞ। এই পদকে তাদের অংশীদারিত্ব আছে।
আরআর