আইসিইউ সংকটে বিপর্যস্ত সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা

প্রজ্ঞা দাস

সম্পাদকীয়

জাতিসংঘ ঘোষিত পাঁচটি মানবাধিকারের মধ্যে অন্যতম একটি মানবাধিকার অধিকার হলো- চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার। সব ধরনের আয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের উদ্দেশ্যেই

2025-12-11T02:29:44+00:00
2025-12-11T02:31:34+00:00
 
  শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬,
২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
আইসিইউ সংকটে বিপর্যস্ত সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা
প্রজ্ঞা দাস
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ২:২৯ এএম  আপডেট: ১১.১২.২০২৫ ২:৩১ এএম  (ভিজিট : ১৩২)
সংগৃহীত ছবি
জাতিসংঘ ঘোষিত পাঁচটি মানবাধিকারের মধ্যে অন্যতম একটি মানবাধিকার অধিকার হলো- চিকিৎসাসেবা পাওয়ার অধিকার। সব ধরনের আয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের উদ্দেশ্যেই সরকারি হাসপাতালগুলোর পথচলা। যেখানে বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকে সাধারণ মানুষ। তবে এসব সরকারি হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের ঘাটতি, সংকট এবং অব্যবস্থাপনা লক্ষণীয়। তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে আইসিইউর সংকট। 

জনসংখ্যার আকার, রোগের প্রকৃতি, ক্রমবর্ধমান জটিলতা ও নগরায়ণসহ বিভিন্ন কারণে আইসিইউ সেবা এখন আর অতিরিক্ত সুবিধা নয় বরং চিকিৎসা ক্ষেত্রে এটি মৌলিক জীবন রক্ষাকারী কাঠামোতে রূপ নিয়েছে। অথচ সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেডের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় এখনও অত্যন্ত কম, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিতে দুর্বলতা সর্বত্র লক্ষ করা যায় এবং দক্ষ জনবলেরও সংকট রয়েছে। ফলে যেকোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় সরকারি হাসপাতালগুলোকে। বাংলাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউর তীব্র ঘাটতি আজকের এক দিনের ঘটনা নয়। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে, যা লাখ লাখ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় সরকারি হাসপাতালগুলোতে এক হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা স্থাপনে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হয়েছিল, কিন্তু আজ সেই বিনিয়োগের একটি বড় অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে আছে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি করুণচিত্র তুলে ধরে। একে তো বাংলাদেশ অধিক জনসংখ্যার দেশ সেখানে আইসিইউর মতো এমন জীবন রক্ষাকারী ইউনিট যদি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে থাকে, তবে এই ঘাটতি শুধু সংখ্যাগত নয়, বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যা। যা জনবলের অভাব, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার ফলে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে, প্রতিদিন শত শত গুরুতর রোগী আইসিইউ না পেয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে, যা দেশের স্বাস্থ্য খাতের ব্যর্থতাকে নির্দেশ করে। এই সংকটের ফলে গরিব-দুঃখী মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার খরচ তাদের নাগালের বাইরে। 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ৪২টি জেলার ৭৪টি সরকারি হাসপাতালে মোট এক হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অকার্যকর। যা জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে হাজারো রোগীকে বঞ্চিত করছে। কোভিড সময়ে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রজেক্টের অধীনে ৫১২ কোটি টাকা ব্যয় করে ৪৮টি জেলায় ১০টি করে আইসিইউ শয্যা স্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে ১২০ কোটি টাকার সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ অনেক ইউনিট এখনও চালু হয়নি। 

সেসব ইউনিটের সরঞ্জাম গুদামে ধুলা জমে পড়ে আছে। আরও একটি অবাক করা বিষয় হলো, যে কটি আইসিইউ ব্যবস্থা কার্যকর আছে তার মধ্যে ৭৫৮টি শয্যা অর্থাৎ ৫৫ শতাংশ ঢাকার ২২টি হাসপাতালে কেন্দ্রীভূত। যা জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার অসমতা এবং ঘাটতিকে তুলে ধরে। ফলে বাকি জেলা পর্যায়ে বসবাসরত মানুষের জন্য থাকে মাত্র ৬১৪টি শয্যা, অর্থাৎ প্রতি লাখে ০.৭৯টি আইসিইউ শয্যা, যা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ন্যূনতম সুপারিশের প্রায় এক-দশমাংশ।

ডিজিএইচএসের দেওয়া রিপোর্ট অনুসারে, জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার অভাবে রোগীদের ঢাকায় রেফার করা হয়, যা মৃত্যুর হার বাড়াচ্ছে। শুধু তাই নয়, দক্ষ ডাক্তার, নার্স এবং জনবলের চিত্র তো আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশ সোসাইটি অব অ্যানেস্থেসিওলজিস্টস, ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড পেইন ফিজিশিয়ানস এবং ডিজিএইচএসের ২০২৫ সালের যৌথ রিপোর্ট অনুযায়ী,সরকারি খাতে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট পদের ৬৮ শতাংশ খালি। 

আইসিইউ-প্রশিক্ষিত নার্সের সংখ্যা মাত্র তিন হাজার ৮৫০ জন, যেখানে এক হাজার ৩৭২টি শয্যা পূর্ণ ক্ষমতায় চালাতে প্রয়োজন কমপক্ষে ৯,৫০০-১১,০০০ জন নার্স। দেশে বছরে মাত্র ১৫০-১৮০ জন নতুন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট উৎপাদিত হচ্ছে। এই সংকটের ফলে প্রতি বছর কত মানুষ মারা যাচ্ছে তার সঠিক সংখ্যা সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয় না। তবে বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচ ও ডিজিএইচএসের ২০২৪ সালের একটি অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে অনুমান করা হয়েছে যে, আইসিইউ না পাওয়ার কারণে বছরে ৪৫,০০০-৬০,০০০ মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে।
 
যার মধ্যে বেশিরভাগই শিশু, প্রসূতি মা এবং হৃদরোগী। এত বড় একটা সংখ্যা স্বাস্থ্য খাতের জন্য অতীব লজ্জার বিষয়। এ ক্ষেত্রে আরও বড় একটা দুর্বলতা হলো, একটি আইসিইউ শয্যা বছরে চালাতে খরচ হয় ৪০-৫৫ লাখ টাকা, কিন্তু জেলা হাসপাতালগুলোর বার্ষিক বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ প্রায় শূন্য। আরও হতাশার বিষয় হলো- বেশিরভাগ বাজেটে আইসিইউ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো পৃথক খাত রাখাই হয় না। 

ফলে ভেন্টিলেটর নষ্ট হলে মেরামত হয় না, অক্সিজেন প্লান্ট বিকল হলে চালু করার কোনো খোঁজই থাকে না। এই সংকট সমাধানের জন্য শুধু অবকাঠামো তৈরি যথেষ্ট নয় প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন। সেই লক্ষ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ করতে হবে এবং কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে প্রতিটি জেলা হাসপাতালে অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ ইউনিট বাধ্যতামূলক থাকতে হবে। ক্রিটিক্যাল কেয়ার চিকিৎসক উৎপাদন বৃদ্ধি, আইসিইউ নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, নিয়মিত স্কিল আপডেট প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। যন্ত্রপাতি যেন অচল না থাকে তার জন্য আলাদা বিভাগ ও অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন। 

সারা দেশের আইসিইউ ব্যবস্থাপনার রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। আইসিইউ স্থাপনে বিলম্ব, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম-এসবের ওপর কঠোর নজরদারি করতে হবে। বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি আইসিইউ বেড ব্যাংক তৈরি করা যেতে পারে। যেখানে ব্যয়-নিয়ন্ত্রিত বেসরকারি বেড যুক্ত করা হবে। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সারা বিশ্বের কাছে বাহবা কুড়াচ্ছে। এই অবস্থায় স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক ভিত্তি শক্ত না হলে উন্নয়নের গতি ঊর্ধ্বগামী থাকতে পারবে না। কেননা আইসিইউ সংকট শুধু চিকিৎসা সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রের মানবিক ও নীতিগত সক্ষমতার মাপকাঠি। তাই ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যাক। একটি মানুষও যেন বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়, এই হওয়া উচিত আমাদের প্রতিজ্ঞা।

লেখক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন কলেজ 

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   আইসিইউ  সংকট  বিপর্যস্ত  সরকারি  চিকিৎসাব্যবস্থা 


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: