মহান বিজয় দিবস আজ। আমাদের চির গৌরবের দিন। ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে এখন পর্যন্ত বাঙালির সবথেকে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয়; অর্থাৎ পৃথিবীর মানচিত্রে লাল-সবুজের পতাকার স্থান পাওয়ার আজকের এই দিনটি। বাংলাদেশ নামে নতুন একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের আত্মপ্রকাশ ঘটে এদিন।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিজয় দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন। রয়েছে দিনভর কর্মসূচি।
বাঙালি জাতিসত্তার গোড়ায় রয়েছে ভাষা; মানে ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতি আমাদের জাতিসত্তার মূল ভিত্তি। ভাষার ভিত্তিতে একত্রিত হওয়া কোনো জনগোষ্ঠী, যারা সুদীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন; এমন দুয়েকটি জাতিই কেবল নিজেদের জন্য পৃথক ভূখণ্ড আদায় করে নিতে পেরেছে। আমরা তেমনি এক জাতি। এটি অনন্য ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন।
এই জনপদের মানুষ হিসেবে বাঙালি সংগ্রাম করেছে বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে, বিভিন্ন পর্যায়ে। নিরন্তর মুক্তির এই লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল ক্ষমতাশালী সংস্কৃতের বিপরীতে প্রাকৃত ও অপভ্রংশ থেকে জন্ম নেওয়া বাংলা ভাষার মধ্য দিয়ে। বিদেশি শাসনে পাল-সেন যুগ পেরিয়ে সুলতানি আমলের দিল্লির অধীনতার বিরুদ্ধেও ছিল বারো ভূঁইয়া ঈসা খাঁ-দের আঞ্চলিক আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এরপর বাঙালি মুসলমান পরিচয়কে সঙ্গী করে ব্রিটিশ তাড়ানো আর ঔপনিবেশিক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই। তারই ধারাবাহিকতায় এই নিজস্ব ভূখণ্ড প্রাপ্তি আমাদের।
বিজয় দিবস উপলক্ষে দিনের শুরুতে দেশের সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং রাতে গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র। ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো মাসব্যাপী প্রচার করছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান। এ ছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও উপাসনার আয়োজন করা হয়েছে।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে স্বাধীনতার সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে উল্লেখ করে এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি মহান মুক্তিযুদ্ধসহ স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন সেসব বীর শহিদদের। তাদের এই আত্মদান আমাদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা ও সাহস জোগায়, সব সংকটে-সংগ্রামে দেখায় মুক্তির পথ।’
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ডাকে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয় এবং হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করার মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয় উল্লেখ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ১৬ ডিসেম্বরকে জাতির অহংকার, আনন্দ আর বেদনার এক মহাকাব্যিক দিন। ১৯৭১-এ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি শত্রুমুক্ত হলেও চক্রান্তকারীদের নীলনকশা এখনও চলমান। আগ্রাসী শক্তি আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অবজ্ঞা করার ঔদ্ধত্য দেখায়। সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে একটি স্মারক ডাকটিকেট, উদ্বোধনী খাম ও সিলমোহর অবমুক্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
বিজয় দিবসে কর্মসূচি : মহান বিজয় দিবস-২০২৫ উদযাপন উপলক্ষে প্রত্যুষে ঢাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে।
সকাল ৬টা ৩৪ মিনিটে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান উপদেষ্টা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার নেতৃত্বে উপস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।
বেলা ১১টা থেকে ঢাকার তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী পৃথকভাবে ফ্লাই পাস্ট মহড়া পরিচালনা করবে। চলবে বিজয় দিবসের বিশেষ ব্যান্ডশো। সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, বিজিবি, আনসার বাহিনী ও বিএনসিসির বাদক দল বাদ্য পরিবেশন করবেন।
এ ছাড়া জাতীয় পতাকা নিয়ে ৫৪ জন প্যারাট্রুপার অবতরণ করবে। দিবসটি উপলক্ষে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সুবিধাজনক সময়ে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে ক্রীড়া অনুষ্ঠান, ফুটবল ম্যাচ, টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, কাবাডি, হাডুডু প্রভৃতি খেলার আয়োজন করা হবে।
রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বঙ্গভবনে অপরাহ্ণে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। এ ছাড়া মহানগর, জেলা ও উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহিদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে।
দেশের সব হাসপাতাল, জেলখানা, বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা, পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র, ডে-কেয়ার ও শিশু বিকাশ কেন্দ্র এবং শিশু পরিবার ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হবে।
এফআর