সেদিন প্রতীক্ষায় ছিলেন শতাধিক সাহসী যুবক। কখন বেজে উঠবে সেই গান, আসবে সেই সংকেত। সবাই এক জায়গায় নয়। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ ও দাউদকান্দি নৌবন্দরে তাদের সতর্ক অবস্থান। প্রতিটি দলের কাছেই আছে রেডিও। সেই রেডিওতে আসবে অভিযান শুরুর সংকেত।
একদিকে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার প্রতীক্ষা, অন্যদিকে অনিশ্চয়তা। সামান্য গড়বড় হলেই নিশ্চিত মৃত্যু। ১৯৭১ সালের ১৪ আগস্ট সকালে আকাশবাণী কলকাতার গানের অনুষ্ঠানে বেজে উঠল ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান, তার বদলে চাই নে কোনো দান।’
এই গানই সংকেত। শুরু হয়ে গেল প্রস্তুতি। এরপর ১৫ আগস্ট আরেকটি গান বাজলেই পাওয়া যাবে অভিযানে নামার চূড়ান্ত সংকেত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই অভিযান ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামে খ্যাত। সময়ের আলোর পাঠকদের আজ জানাব, অপারেশন জ্যাকপট কী এবং এই অভিযানের নেপথ্যের কাহিনী...
কেন অপারেশন জ্যাকপট
অপারেশন জ্যাকপটের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান সরকারের প্রচারণা ভন্ডুল করে দেওয়া। অবরুদ্ধ বাংলাদেশের অবস্থা স্বাভাবিক বলে বহির্বিশ্বে প্রচারণা চালাচ্ছিল পাকিস্তান সরকার। কিন্তু নৌ কমান্ডোদের সফল অভিযানের মাধ্যমে তা মিথ্যায় পর্যবসিত হয়। বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারিত হয় এই নৌ অভিযানের খবর। মুক্তিযুদ্ধ বহির্বিশ্বে ব্যাপক পরিচিতি পায়।
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে ১৪৮ জন নৌ কমান্ডোকে চারটি দলে ভাগ করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল। ১৫ আগস্ট রাত ১২টার পর শুরু হয় অপারেশন জ্যাকপট।
১৫ আগস্ট রাত ১টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম বন্দর কেঁপে ওঠে। বন্দরে এমভি হরমুজ এবং এমভি আল-আব্বাস নামে দুটি পাকিস্তানি জাহাজসহ বেশ কয়েকটি বিদেশি বার্জ ও জাহাজ ধ্বংস হয়। এমভি হরমুজে ৯ হাজার ৯১০ টন এবং এমভি আল-আব্বাসে ১০ হাজার ৪১৮ টন সামরিক সরঞ্জাম ছিল। চট্টগ্রাম বন্দর অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন সাবমেরিনার আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী।
অন্যদিকে সাবমেরিনার আহসানউল্লাহর নেতৃত্বে ৪৮ জন নৌ কমান্ডো মোংলা বন্দরে অভিযান চালান। বন্দরের ছয়টি জাহাজ মাইনের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়।
চাঁদপুর নৌবন্দর অভিযানে সাবমেরিনার বদিউল আলমের নেতৃত্বে ২০ জন নৌ কমান্ডো সফল হন। তারা ১৫ আগস্ট রাতে একই সময় চাঁদপুর বন্দরে মাইন দিয়ে কয়েকটি জাহাজ ধ্বংস করেন। সেই সঙ্গে সাবমেরিনার আবদুর রহমানের নেতৃত্বে ২০ জনের কমান্ডো দল নারায়ণগঞ্জ এবং শাহজাহান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ৯ জন কমান্ডো দাউদকান্দি নদীবন্দরে সফল অভিযান পরিচালনা করেন।
গোপন প্রস্তুতি ও সময় নির্বাচন
অপারেশন জ্যাকপটের পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। অভিযানের সময় নির্ধারণ করা হয় ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট রাত—যেদিন পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে বন্দরে নিরাপত্তা কিছুটা শিথিল থাকবে বলে ধারণা করা হয়।
একই রাতে, একই সময়ে, দেশের বিভিন্ন বন্দরে একযোগে আঘাত হানার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—যাতে পাকিস্তানি বাহিনী বিভ্রান্ত হয় এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বিকট বিস্ফোরণে ডুবে যেতে থাকে পাকিস্তানি বাহিনীর জাহাজ। এক রাতে ধ্বংস বা অচল হয়ে পড়ে বহু জাহাজ ও নৌযান। এই অভিযানের পর পাকিস্তানি নৌবাহিনী দীর্ঘ সময় কোনো বড় নৌচলাচল নিশ্চিত করতে পারেনি।
নীরব বীরদের আত্মত্যাগ
অপারেশন জ্যাকপটের নায়করা ছিলেন আড়ালের মানুষ। অনেক কমান্ডো অভিযানের সময় শহীদ হন, কেউ আহত অবস্থায় ধরা পড়ে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। দীর্ঘদিন ধরে তাদের অনেকের নাম ইতিহাসে উচ্চারিত হয়নি।
পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা ও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে—এই অভিযানে অংশ নেওয়া যোদ্ধাদের সাহস ছিল অতিমানবিক। জীবন বাজি রেখে তারা পানির নিচে শত্রুর বুকে আঘাত হেনেছিলেন।
ইতিহাসের বিচারে অপারেশন জ্যাকপট
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, অপারেশন জ্যাকপট ছিল গেরিলা যুদ্ধের একটি ক্লাসিক উদাহরণ। সীমিত অস্ত্র, কিন্তু নিখুঁত পরিকল্পনা ও সময় নির্বাচনের মাধ্যমে এটি প্রমাণ করে—যুদ্ধ জেতা যায় কৌশল, সাহস ও আত্মত্যাগ দিয়ে। অপারেশন জ্যাকপট আজ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে শুধু একটি অভিযান নয়—এটি প্রতীক হয়ে আছে বুদ্ধিমত্তা, নীরবতা ও নিখুঁত আঘাতের।
সময়ের আলো/এআর