ডিরোজিও, সুকান্ত ও হাদি—তিনজনই কবি, সংগঠক ও রাজনৈতিক-মানুষ।
শরিফ ওসমান হাদি (১৯৯৩-২০২৫) এখন ইতিহাসের পাতায়। অল্প বয়সে কথা, কাজ আর চিন্তা দিয়ে এত খ্যাতি আর জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন এই উপমহাদেশে কেবল আর দুজন; একজন ডিরোজিও আর-একজন সুকান্ত।
হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (১৮০৯-১৮৩১)। ২৬ ডিসেম্বর মাত্র ২২ বছর ২ মাস ৮ দিন বয়সে মারা যান এই ইউরেশীয় কবি, যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ ও শিক্ষক। কিন্তু তার আগে বিপুল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছিলেন। তরুণদের কাছে ছিলেন প্রবল জনপ্রিয়। স্মর্তব্য, এ ক্ষেত্রে হাদিরও একই রকম প্রভাব ও জনপ্রিয়তা লক্ষ করা যায়।
সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় স্মরণকালের বৃহত্তর জানাজায় জনসমাগম। ছবি : সময়ের আলো
মাত্র সতেরো বছর বয়সে শিক্ষক হয়েছিলেন ডিরোজিও, কলকাতা হিন্দু কলেজে। ইংরেজিসাহিত্য ও ইতিহাস পড়াতেন। তার পাঠদানের পদ্ধতি ছিল নিজের ধ্যান-ধারণার মতোই গতানুগতিকতামুক্ত। শিক্ষক হিসেবে শুধু ক্লাসে সীমাবদ্ধ থাকেননি। যেকোনো বিষয়ে তিনি ছাত্রদের সঙ্গে কলেজ প্রাঙ্গণের বাইরেও আলোচনা করতেন। বাস্তবে তার আলোচনার বিষয়বস্তুর পরিসীমা ছিল বহুবিস্তৃত—সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন ও বিজ্ঞান।
ওসমান হাদির সঙ্গে এখানে ডিরোজিওর বিস্ময়কর মিল। তিনিও শিক্ষক, কবি ও রাজনৈতিক-মানুষ। ১৮২৮ সালে ডিরোজিও ‘অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি সাহিত্য ও বিতর্ক সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। হাদি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। হাদির এ প্ল্যাটফর্মেও নিয়মিত আলোচনাসভা, পাঠচক্র ও নানামাত্রিক কার্যক্রম হত।
ডিরোজিওর আকস্মিক মৃত্যু প্রগতিবাদীদের উদ্দেশ্য সাধনের পথে গুরুতর আঘাত হেনেছিল। তবুও এ অসামান্য শিক্ষক তার তরুণ ছাত্রদের মনে সংস্কারমুক্তির যে চেতনা উদ্দীপ্ত করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছিল এবং বাঙালি গোঁড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। হালে প্রায় একই রকম কাজ ও প্রভাব রেখে গেলেন ওসমান হাদি। তবে আততায়ীর হাতে তারও আকস্মিক প্রয়াণ কতটা প্রভাব বিস্তার করে রাখবে তার শিষ্য-সমর্থকদের, সেটি সময়ই বলে দেবে।
কলকাতার সাউথ পার্ক স্ট্রিট কবরস্থানে ডিরোজিওর সমাধি। ছবি : সংগৃহীত
ডিরোজিওর ছাত্রদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েকজনের নাম করা যাক। এরা হলেন—কৃষ্ণমোহন ব্যানার্জি, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামতনু লাহিড়ী ও রসিক কৃষ্ণ মল্লিক অন্যতম। এদের মধ্যে ডিরোজিওর উদারনৈতিক প্রভাব ছিল গভীর। রামতনু লাহিড়ী পৈতা ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। তার অনেক ছাত্রই যোগ দিয়েছিলেন ব্রাহ্মসমাজে। কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায় খ্রিস্টান হয়ে যান। প্যারিচাঁদ মিত্র নামে তার এক ছাত্র ছিল। যিনি পরে বাংলায় প্রথম উপন্যাস লেখার কৃতিত্ব অর্জন করে ইতিহাসের অংশ হন।
উপমহাদেশে একই রকম প্রভাবশালী আরেক তরুণের নাম সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭)। মাত্র ২০ বছর ১০ মাসের জীবন। অথচ কী বিস্ময়করভাবে উজ্জ্বল করে নিজের নামটি লিখে রেখে গেছেন এই তরুণ কবি। তিনিও ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। এ প্রসঙ্গে ইংরেজ কবি জন কিটসের শরণ নেওয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না। বেঁচে ছিলেন মাত্র ২৫ বছর ৪ মাস। অথচ ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম কবি তিনি। লর্ড বায়রন ও পার্সি বিশি শেলির সঙ্গে তিনিও ছিলেন দ্বিতীয় প্রজন্মের রোমান্টিক কবিদের একজন। সুকান্ত-কিটস দুজনেই যক্ষ্মায় মারা যান। দুজনেরই লেখকজীবন ছিল মাত্র ছয় বছরের।
সুকান্তের মূল ক্ষেত্র ছিল কবিতা। সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, যন্ত্রণা ও বিক্ষোভ তার কবিতার প্রধান বিষয়বস্তু। তার রচনাকর্মে গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাণী উচ্চারিত হয়েছে। শোষণহীন ও ইনসাফের নতুন সমাজ গড়ার কথা বারবার বলে গেছেন সুকান্ত।
ডিরোজিও, সুকান্ত ও হাদি—তিনজনই কবি, সংগঠক ও রাজনৈতিক-মানুষ। বয়স বিবেচনায় এই তিন তরুণের ভাষা, কবিতা, রাজনীতি সচেতনতা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড এত বলিষ্ঠ ছিল, যা খুবই বিস্ময়কর ও অসাধারণ বলে মনে করা হয়। যুগের পর যুগ ‘সামান্য সময়ের জীবন পাওয়া’ এই তিন তরুণ উপমহাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও সাহিত্যে প্রভাব রেখে যেতে থাকবেন নিঃসন্দেহে।
আমরা দ্রোহের কথা বলি। জাগরণের কথা বলি। ইনসাফের কথা বলি। একজন তরুণের মাঝে যতখানি বারুদ থাকতে পারে তার পুরোটাই ছিল হাদির ভেতর। স্বল্পকালীন জীবনে বিপ্লবকে ধারণ করেছেন তিনি। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপোসহীন। শত্রুর বিচারেও ইনসাফের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ। রাজনীতি, সংগঠন, কবিতা ও বক্তব্য-ভাষণে ‘আশ্চর্য ইসরাফিল’ শরিফ ওসমান হাদি। নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার মতোই ছিল তার ও তাদের জীবন।
গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার উনশিয়া গ্রামে সুকান্ত ভট্টাচার্যের পৈত্রিক ভিটা। ছবি : সংগৃহীত
সূত্র : ১. বাংলা পিডিয়া, বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ, এশিয়াটিক সোসাইটি ২. দ্য ডেইলি স্টার, ১৩ মে ২০২১ / আহমাদ ইশতিয়াক ৩. সামহোয়ারইনব্লগ, ২ জানুয়ারি ২০০৯ / ইমন জুবায়ের