ঝালকাঠি জেলার শহরতলি ও প্রত্যন্ত এলাকায় ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে খেজুর গাছ ও গাছি। কিন্তু রসের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে দামও। প্রতি লিটার খেজুর রস বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা দরে। সন্ধ্যা হলেই খেজুর রস সংগ্রহের জন্য দূরদূরান্ত থেকে লোকজন গাছিদের কাছে সিরিয়াল দিচ্ছেন। আবার স্থানীয়দের সহায়তায় কিছু লোক শখের বসে রাতে রস চুরি করছে। গাছিরাও চাহিদা সামাল দিতে দিন-রাত সমানতালে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
সরজমিন দেখা যায়, খেজুর গাছের সংখ্যা আগের তুলনায় কম। এর মূল কারণ পরিকল্পিতভাবে কেউ খেজুর গাছ রোপণ বা বপন করছেন না। আবার অনেক খেজুর গাছ ইট পোড়ানোর জন্য বিক্রি করা হচ্ছে।
খেজুর গাছের মালিক আলম জানান, গাছের অনেক বয়স হয়ে গেলে তা দুর্বল হয়ে যায়। তখন গাছের মাথা ছোট হয়ে শুকাতে শুরু করে, গাছটি মারা যায়। আগের মতো যারা গাছে ওঠে খেজুরের রস সংগ্রহ করতে, তাদেরও এখন আর সেই শক্তি নেই।
আব্দুল আজিজ বলেন, এই বছর আমি ১৫ থেকে ২০টি খেজুর গাছ কেটেছি, রস মাত্র ৭-৮ হাঁড়ি হয়েছে। বিক্রি করলে প্রতি হাঁড়ির দাম ১৫০-১৭০ টাকা, যা লাভজনক নয়। অনেকে গাছ কাটার জন্য রাজি নয়। তাই আমি নিজে গাছ কেটে রস সংগ্রহ করছি।
অপরদিকে খেজুর রসের ক্রেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, আগে খেজুরের রস সস্তা খাওয়া যেত। এখন এক হাঁড়ির (৩ লিটার পরিমাপ) দাম ২০০ টাকা, যা সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে। যদি এই পরিস্থিতি থাকে, ভবিষ্যতে আমাদের পরবর্তী তৃতীয় প্রজন্ম খেজুরের রস চোখে দেখলেও খুব কমই দেখতে পাবে। ধনী লোকেরা হয়তো কেনে খেতে পারবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যে না-ও জুটতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, ইট পোড়ানোর জন্য খেজুর গাছের চাহিদা বেশি থাকায় রসের উৎস খেজুর গাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে খেজুর রস একটি বিলুপ্তপ্রায় উপাদান হবে।
এ নিয়ে বিষখালী নদীর তীরের সাচিলাপুর গ্রামের বাসিন্দা, আব্দুল মালেক, আব্দুল আজিজ, লিটু গোমস্তাসহ কথা হয় বেশ কয়েকজনের সঙ্গে।
তারা জানান, অগ্রহায়ণ মাসের শুরুতে গাছের মাথার বিশেষ অংশ পরিষ্কার করার মাধ্যমে রস বের করার উপযোগী করা হয়। শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রসের উৎপাদন শুরু হয়। অগ্রহায়ণ, পৌষ ও মাঘ মাসে রসের মৌসুম থাকে। বিষখালী নদীর বেড়িবাঁধে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া খেজুর গাছ থেকে রস বের করা হয়। যার জমির মাথায় বেড়িবাঁধের গাছ সেই ভোগ করে। আগে মাটির হাঁড়ি গাছে ঝুলিয়ে রস সংগ্রহ করা হতো। এতে কিছু দুষ্ট ছেলে ঢিল ছুড়ে নষ্ট করে। তাই প্লাস্টিকের বোতল গাছে ঝুলিয়ে রস সংগ্রহ করা হয়। বাইরে থেকে যাতে রসের পরিমাণ বোঝা না যায় সে জন্য প্লাস্টিকের বোতলে রং মেখে দেওয়া হচ্ছে।
তারা আরও জানান, দুপুর দেড়টা থেকে গাছের বাকল কেটে পাত্র দেওয়া শুরু হয়। একেকটি গাছে (আকারভেদে) ৫-৭ মিনিট সময় লাগে। সন্ধ্যা ৭-৮টার দিকে প্রথমবার রস নামানো হয়। এরপর আবার রাত ১১-১২টার দিকে দ্বিতীয়বার, ভোরে তৃতীয়বারে রস নামানো হয়। তখন আবার অন্য পাত্র ঝুলিয়ে রাখা হয়, যাতে দিনের রসও সংগ্রহ করা যায়। আমরা বিক্রির সময় মাটির হাঁড়ি মেপে ক্রেতাকে দিই। প্রতি হাঁড়িতে ৩ লিটার পরিমাণে থাকে। তাতে দাম রাখা হয় রসের মানভেদে প্রতি হাঁড়ি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।
এফআর