নিলামে কম দামে বিলাসবহুল গাড়ি কেনা ভেস্তে গেল

সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম

খবর

কম দামে বিলাসবহুল গাড়ি কিনতে নিলাম ব্যবসায়ীদের কৌশল ভেস্তে গেল। চট্টগ্রাম বন্দরের অকশন ইয়ার্ড থেকে সাবেক এমপিদের সেই ৩১টি গাড়ি

2025-12-28T04:07:54+00:00
2025-12-28T04:07:54+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬,
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
খবর
নিলামে কম দামে বিলাসবহুল গাড়ি কেনা ভেস্তে গেল
সাইফুদ্দিন তুহিন চট্টগ্রাম
প্রকাশ: রোববার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৪:০৭ এএম   (ভিজিট : ২০৩)
প্রতীকী ছবি
কম দামে বিলাসবহুল গাড়ি কিনতে নিলাম ব্যবসায়ীদের কৌশল ভেস্তে গেল। চট্টগ্রাম বন্দরের অকশন ইয়ার্ড থেকে সাবেক এমপিদের সেই ৩১টি গাড়ি যাচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর হচ্ছে। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের নিলাম শাখায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের নিলাম ইয়ার্ডে নতুন করে গাড়িগুলোর ইনভেন্ট্রি (সরেজমিন তথ্যাদি সংগ্রহ) সম্পন্ন হয়েছে। গাড়িগুলো নেওয়া হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরিবহন পুলে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা আছে মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করতে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ে গাড়িগুলো হস্তান্তর হচ্ছে বলে কাস্টমস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এতে ভেস্তে গেল কম দামে বিলাসবহুল গাড়ি কেনার নিলাম ব্যবসায়ীদের উদ্যোগ।

এর আগে সাবেক এমপিদের বিলাসবহুল গাড়ি কম দামে নিতে নামমাত্র দর জমা দিয়েছিলেন দুই ডজন বিডার। নেওয়া হয় কৌশলের আশ্রয়। ১০ কোটি টাকার গাড়ি কিনতে এক লাখ টাকার দরপত্রও জমা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দাম পর্যাপ্ত না হওয়ায় নিলামে তোলা বন্ধ করে দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। শেষ পর্যন্ত ৩১টি গাড়ি দেওয়া হচ্ছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। তবে নিলাম ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েকটি নিলামে কম দর জমা পড়ায় এত দ্রুত মন্ত্রণালয়ে হস্তাস্তর ঠিক হচ্ছে না। পরবর্তী নিলামে প্রত্যাশিত দর জমা পড়ার যথেষ্ট সুযোগ ছিল। তাদের মতে নিলামে বিক্রি না করায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার নাহিদুন্নবী সময়ের আলোকে বলেন, গাড়িগুলো চলতি সপ্তাহেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর হচ্ছে। হস্তান্তর করতে সব ধরনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। গাড়িগুলো চাইলে সাবেক এমপিরা নিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে পুরো শুল্ক-কর পরিশোধ করেই ছাড় করতে পারবেন।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ইমরান হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, গাড়িগুলোর ইনভেন্ট্রি হয়ে গেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

কাস্টমসের সহকারী কমিশনার রাসেল আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে গাড়িগুলো হস্তান্তর করা হবে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে গাড়িগুলোর ডিউটি পরিশোধ করেছে। গাড়িগুলো নিলাম ইয়ার্ড থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিয়ে যাবে। ক্লিয়ারেন্স সংক্রান্ত সবকিছু চূড়ান্ত করা আছে। তবে মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর হলেও সাবেক এমপিরা শুল্ক পরিশোধ করে নিজেদের গাড়ি নিজেরা ফের নিতে পারবেন এমন সুযোগ রাখা হয়েছে।

একবার সরকারি কাজে ব্যবহারের পর ব্যবহারযোগ্য গাড়িগুলো ফের ডিউটি দিয়ে কীভাবে নেওয়া যাবে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, পুলে সাবেক এমপিদের গাড়িগুলো নেওয়া হলেও ব্যাপক ব্যবহার হবে না। ভিআইপিরাই ব্যবহার করবেন। সে ক্ষেত্রে গাড়িগুলো সাবেক এমপিরা চাইলে শুল্ক পরিশোধ করে নিতে পারেন। তাতে কোনো সমস্যা হবে না।

শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা এসব গাড়ি বন্দর থেকে ছাড় করার আগেই বেশিরভাগ এমপি লাপাত্তা হয়ে যান। গত বছরের ৫ আগস্টের পর আত্মগোপনে থাকা এমপিরা ছাড় করার কোনো উদ্যোগই নেননি। সাবেক এমপিদের নামে নোটিস পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি। এরপর দুই দফা গাড়িগুলো নিলামে তোলা হয়। ১০ কোটি টাকা দামের একেকটি গাড়ির জন্য কেউ কেউ এক লাখ টাকা পর্যন্ত দর জমা দেন। নিলামে সর্বোচ্চ দর জমা পড়েছিল তিন কোটি টাকার কিছু বেশি। অথচ সাত কোটি টাকার কমে এসব গাড়ি বিক্রির কোনো সুযোগ নেই।

দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা এসব গাড়ি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেয় এনবিআর। এসব গাড়ি যানবাহন অধিদফতরে হস্তান্তরের জন্য গত ১২ নভেম্বর বিশেষ আদেশ জারি করেছে এনবিআর।

এ সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিলুপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদের কয়েকজন সদস্যের বিশেষ শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা গাড়ির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রযোজ্য হবে কি না জানতে চেয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস নির্দেশনা চায়। গত বছরের ৮ ডিসেম্বর এনবিআর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে জানিয়ে দেয় আমদানি করা গাড়িগুলো খালাসের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রযোজ্য হবে না এবং আমদানিকারকরা স্বাভাবিক হারে শুল্ক-কর পরিশোধ করে গাড়িগুলো খালাস করতে পারবেন।

এনবিআর নির্দেশনা অনুসারে, শুল্ক-কর পরিশোধ করে আমদানি করা ৩১টি গাড়ি আমদানিকারকদের কেউ খালাস করেননি। তাই ২০২৩ সালের কাস্টমস আইনের ধারা ৯৪ (৩) অনুসারে গাড়িগুলো নিলামে তোলা হয়। ওই নিলামে কোনো নিলামকারী গাড়িগুলোর যৌক্তিক মূল্য বিড না করায় গাড়িগুলো নিলামে বিক্রি না করে অতি মূল্যবান গাড়িগুলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তরের জন্য এই বিশেষ আদেশ জারি করা হয়েছে। এদিকে বিলাসবহুল গাড়ি মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তরের মাধ্যমে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হবে বলে মনে করছেন চট্টগ্রাম কাস্টমস নিলাম ব্যবসায়ীরা।

নিলাম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইয়াকুব চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, কয়েক দফা নিলামে প্রতি গাড়ি পিছু দর কম জমা পড়েছে। ওই দরে নিলামে বিক্রি করা যাবে না তা আমরা জানি। গাড়িগুলো নিলামে বিক্রি করতে আরও কয়েক দফা নিলামে তোলার দরকার ছিল। তখন উপযুক্ত দর অবশ্যই জমা পড়ত। এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর হলে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হবে। বিক্রিও হলো না আবার রাজস্বও পেল না সরকার। আমরা চাই মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর না করে গাড়িগুলো নিলামে বিক্রি করা হোক।
গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার নির্বাহী কমিটির সদস্য হাবিবুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, গাড়িগুলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাবেক এমপিদের এসব বিলাসবহুল গাড়ি নিয়ে করণীয় নির্ধারণে এনবিআরের একটি কমিটির সদস্য ছিলাম আমি। নিলামে যখন উপযুক্ত দর পাওয়া যায়নি তাই গাড়িগুলো জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমরা ব্যবসায়ীদের কিছু বলার নেই। 

সরকারি কর্মকর্তারা তিন কোটি টাকার দামের গাড়ি ব্যবহার করতে পারে না। সে ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা মূল্যের গাড়িগুলো মন্ত্রণালয় কীভাবে ব্যবহার করবে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান তিন কোটি টাকা দামে সাবেক এমপিদের একটি গাড়ি ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় আপত্তি করায় তিনিও এই গাড়ি নিতে পারেননি। দেখা যাক গাড়িগুলো কে কীভাবে ব্যবহার করে।

এ ব্যাপারে জানতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সরকারি যানবাহন অধিদফতরের পরিবহন কমিশনার মো. খাইরুল কবির মেননকে কয়েকবার ফোন করা হলেও ব্যক্তিগত সহকারী প্রতিবার জানান তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন।

প্রসঙ্গত দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী এমপিরা শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানি করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে শুল্ককরসহ ১০/১১ কোটি টাকার গাড়ি মাত্র এক থেকে দেড় কোটি টাকায় আমদানি করতে পারেন। বিদেশ থেকে শুল্ক-কর ছাড়া কেনা দামেই গাড়ি আমদানি করতে পারতেন এমপিরা। বিলুপ্ত দ্বাদশ সংসদ সদস্যদের অনেকেই শুল্কমুক্ত সুবিধার গাড়ি আমদানি করেন চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে। আমদানি করার পর গত বছরের ৫ আগস্টের আগে সাবেক এমপিদের মাত্র কয়েকজন ছাড় করতে পেরেছিলেন। এরপর লাপাত্তা এমপিদের গাড়ি বন্দরের গাড়ির শেডেই পড়ে আছে।


Loading...
Loading...
খবর- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: