মুক্তিযুদ্ধে খালেদা জিয়ার যে নির্দেশে বেঁচে গিয়েছিল সহস্রাধিক সেনা

সময়ের আলো ডেস্ক

জাতীয়

তখন ১৯৭১ সাল। দেশে যুদ্ধ চলছে। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে অস্ত্র সরিয়ে নিতে আসে বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা। যাদের উদ্দেশ্য

2025-12-30T18:09:09+00:00
2025-12-30T18:09:09+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
জাতীয়
মুক্তিযুদ্ধে খালেদা জিয়ার যে নির্দেশে বেঁচে গিয়েছিল সহস্রাধিক সেনা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৬:০৯ পিএম   (ভিজিট : ২৮৪)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
তখন ১৯৭১ সাল। দেশে যুদ্ধ চলছে। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে অস্ত্র সরিয়ে নিতে আসে বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা। যাদের উদ্দেশ্য ছিল, এসব অস্ত্র বিদ্রোহী সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে। এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন হাবিলদার জিয়াউর রহমানের বাসায় যান। সেখানে তখন জিয়াউর রহমান ছিলেন না। ওই হাবিলদার খালেদা জিয়ার কাছে তখন জানতে চান, স্যার কোথায় আছেন? খালেদা জিয়া বলেন, স্যার বাসায় নেই, কেন তাকে খুঁজছে তা জানতে চান। ওই হাবিলদার বলেন, ১৭ বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা আমাদের ব্যাটালিয়ন থেকে অস্ত্র কেড়ে নিচ্ছে। খালেদা জিয়া তখন জানতে চান, কে তাকে পাঠিয়েছে? তিনি জানান, হাবিলদার কাদের। তারপর খালেদা জিয়া তাকে ফিরে যেতে বলেন এবং বলেন জিয়াউর রহমানের নির্দেশ ছাড়া কিছুই যেন বের না হয়। ওই হাবিলদার নুরুল হক পরবর্তীতে বলেন, বেগম জিয়া যদি সেদিন ওই নির্দেশ না দিতেন, তাহলে ১ হাজার ১০০ দেশপ্রেমিক সেনাকে ওইসব অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হতো।

বেগম খালেদা জিয়ার ওই নির্দেশে রক্ষা পায় মুক্তিকামী সেনাদের প্রাণ। স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে সক্ষম হন জিয়াউর রহমান। আনুষ্ঠানিক ওই ঘোষণায় শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। মানুষ জানতে পারে, দেশে যুদ্ধ চলছে।

খালেদা জিয়াকেও পালিয়ে থাকতে হয় এরপর থেকে। তিনি প্রথমে চট্টগ্রামেই পালিয়ে থাকেন তার এক আত্মীয়ের বাসায়। প্রায় দুই মাস নিজেকে এবং দুই ছেলেকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। তবে, চট্টগ্রাম আরও অনিরাপদ হয়ে ওঠে তাদের জন্য। সেখান থেকে দুই ছেলেকে নিয়ে প্রথমে যান নারায়ণগঞ্জ। নারায়ণগঞ্জে তখন থাকতেন তার বোন খুরশিদ জাহান হক। বেগম জিয়া তার দুই ছেলেসহ নারায়ণগঞ্জ যান ১৯৭১ সালের ১৬ মে। তবে, এই যাওয়াও সহজ ছিল না। কালো বোরকায় নিজেকে ঢেকে চট্টগ্রামের লঞ্চঘাটে যেতে হয়েছিল তাকে। গাড়িতে লঞ্চঘাট যাওয়ার সময় নিয়মিত সড়ক ব্যবহার না করে তাকে বেছে নিতে হয়েছিল বিকল্প অপ্রচলিত পথ। কারণ, পাকিস্তানি সেনারা তখন মোড়ে মোড়ে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাহারা বসিয়েছিল। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে লে. মাহফুজের স্ত্রীসহ চট্টগ্রাম লঞ্চ টার্মিনাল থেকে লঞ্চে ওঠেন তিনি।

পুরো যাত্রায় তার খেয়াল রাখতে হয়েছিল তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমানের ওপর। তারা কেঁদে উঠলে বা কোনো আপত্তি করলে তা চোখে পড়ে যাবে পাকিস্তানি সেনাদের। বিশেষত আরাফাত রহমান কোকোর বয়স তখন দুই বছর। শিশু সন্তানের কারণে যেন কোনো সন্দেহ তৈরি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হচ্ছিল বারবার। দুই শিশু সন্তানও হয়তো তখন বুঝতে পেরেছিল যুদ্ধের ভয়াবহতা।

নারায়ণগঞ্জে লঞ্চ পৌঁছামাত্র বোন খুরশিদ জাহান হক এবং তার স্বামী মোজাম্মেল হক সঙ্গে নিয়ে আসা গাড়িতে খালেদা জিয়া ও তার দুই সন্তানকে তুলে নেন। সেই গাড়িতে ছিল রেডক্রসের স্টিকার। সেখান থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রক্তচক্ষুর সামনে দিয়ে তারা পৌঁছান ঢাকার খিলগাঁওয়ে। তবে, অল্প সময়েই পাকিস্তানি সেনারা খালেদা জিয়ার বিষয়ে তথ্য পেয়ে যায়। তারা জানতে পারে যে, খালেদা জিয়া তার এক আত্মীয়ের আশ্রয়ে আছে, যার নামের সঙ্গে হক আছে। তারা তখন মোজাম্মেল হকের অফিসে গিয়ে খোঁজ নেয়। এ খবরে মোজাম্মেল হক ২৮ মে খালেদা জিয়াকে নিয়ে যান ধানমন্ডিতে তার এক চাচার বাসায়। তবে, সেখানেও নিরাপদ বোধ না করায় খালেদা জিয়া তার দুই ছেলেকে নিয়ে সিদ্ধেশরীর এক বাসায় লুকিয়ে থাকেন। এ সময়ে গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হন মোজাম্মেল হক। তবে, অনেক নিপীড়নেও তিনি স্বীকার করেননি খালেদা জিয়া কোথায় আছেন।

অবশেষে ২ জুলাই গ্রেফতার হন খালেদা জিয়া। সেদিন সকালে তিনি ঘুম থেকে উঠে ওই বাড়ির বাগানে গিয়ে দেখেন চারপাশ থেকে পাকিস্তানি সেনারা তাদের ঘিরে রেখেছে।গ্রেফতারের পর খালেদা জিয়া ও তার দুই সন্তানকে প্রথমে পুরাতন সংসদ ভবন এবং পরে ঢাকা সেনানিবাসের একটি বাড়িতে রাখা হয়। ওই বাড়িতে তিনি ছিলেন দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত। যুদ্ধের সময়ে ভারতের গোলা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় এসে পড়তো বলে খালেদা জিয়া জানান। তিনি জানান, বোমা বিস্ফোরণের শব্দ তাদের মনে প্রচণ্ড ভয় ধরিয়ে দিত।


তবে, গ্রেফতারের সময় খালেদা জিয়া ছিলেন স্থির এবং চুপচাপ। এ সময়ে তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে জিয়াউর রহমানকে আত্মসমর্পণের হুমকি দেওয়া হয়। এতেও বিচলিত হননি খালেদা জিয়া। জিয়াউর রহমান পাল্টা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ধমক দিয়ে চিঠি লেখেন।

সম্ভবত, ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শমসেরনগরে নিয়ে যাওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। সঙ্গে ছিল তার দুই সন্তান। এরপর কুমিল্লায় জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তারা থাকতে শুরু করে।

মুক্তিযুদ্ধে এমন বীরত্বপূর্ণ অবদান শুধু নয়। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় গঠনসহ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনেক অবদান রাখেন।

এদিকে, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খালেদা জিয়ার অবদান বর্ণনা করতে গিয়ে এ. কে. এম. ওয়াহিদুজ্জামান লিখেছেন, ‘১৯৯১ সালে নির্বাচনে জিতে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন বেগম খালেদা জিয়া। দায়িত্ব নিয়েই তিনি দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৯২ সালের ১৫ ডিসেম্বর খেতাবপ্রাপ্ত সকল মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক দেওয়া হয়। কিন্তু, একজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না...তারামন বিবি বীরপ্রতীক। ১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর তাকে খুঁজে বের করে নিজ হাতে পদক পরিয়ে দেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯৩ সালে একাত্তরের বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন খালেদা জিয়া। গড়ে তোলা হয় রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। ২০০১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা সমুন্নত রাখতে গঠন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ২০০২ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা ২০ থেকে ৬৬ শতাংশ বাড়ানো হয়। ২০০৩ সালে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয় অনুদান দেওয়া হয়। উদ্যোগ নেওয়া হয় বীরশ্রেষ্ঠদের কবরের পাশে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের। ২০০৪ সালে খুলনায় বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০৬ সালে বেগম জিয়ার অনুরোধে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে পাঠায় পাকিস্তান। তাকে সসম্মানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শায়িত করা হয়। এ সময় ঢাকার প্রতিটি রাস্তার নামকরণ করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের নামে। বেগম জিয়া মুক্তিযুদ্ধকে নির্বাচনে জেতার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেননি, মুক্তিযুদ্ধ ছিল তার বিশ্বাসের অংশ।’

সূত্র : বাসস

আরআর


  বিষয়:   খালেদা জিয়া  মুক্তিযুদ্ধ  সেনা  জিয়াউর রহমান 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: