প্রকাশ: বুধবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৩:৫৩ এএম (ভিজিট : ১৭০)
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি নারীদের নেতৃত্বে আসার এক শক্তিশালী প্রতীক। স্বাধীনতার পর পুরুষপ্রধান রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তিনি যে দৃঢ়তা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দিয়েছেন, তা দেশের অসংখ্য নারীকে সাহস জুগিয়েছে। তার শাসনামলে নারীদের শিক্ষা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক ক্ষমতায়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
নারী শিক্ষায় খালেদা জিয়ার অবদান অনেক। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনগত অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। নারী শিক্ষার প্রসারে তিনি মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি ও অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেন এবং দুটি গার্লস ক্যাডেট কলেজ স্থাপন করেন।
তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে শক্তিশালী করেন ‘ফুড ফর এডুকেশন প্রোগ্রাম’ এবং পরবর্তীতে ‘প্রাইমারি এডুকেশন স্টাইপেন্ড প্রোগ্রাম’ চালুর মাধ্যমে। তার যুগান্তকারী ‘ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম (১৯৯৪)’ গ্রামীণ মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা বিনামূল্যে করে দেয়। যার ফলে ভর্তি বৃদ্ধি পায়, বাল্যবিয়ে কমে যায়, জন্মহার হ্রাস পায়। এই উদ্যোগ গ্রামবাংলার দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। মেয়েদের স্কুলে পাঠালে পরিবার আর্থিক সহায়তা পেত- ফলে শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। আজ বাংলাদেশের মেয়েরা শিক্ষাক্ষেত্রে ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তার পেছনে এই নীতিগত সিদ্ধান্তের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।
তিনি হেলথ, নিউট্রিশন অ্যান্ড পপুলেশন সেক্টর প্রোগ্রাম চালু করেন, যা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করে এবং মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে। তিনি ১৯৯৫ সালে ‘বেগম রোকেয়া’ পদক প্রবর্তন করেন যা বাংলাদেশের নারীদের জন্য অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মাননা।
তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নারী কোটা চালু করেন। তিনি ‘ন্যাশনাল ফোরাম ফর উইমেন’ এর মাধ্যমে নারীর অধিকারকে শক্তিশালী করেন এবং পুলিশ বাহিনীতে নারীর অন্তর্ভুক্তি পুনরায় চালু করেন যা প্রথম শুরু করেছিলেন তার স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী। নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশু অধিকার রক্ষায় ১৯৯৪ সালে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেন তিনি।
সংসদে নারীর সংরক্ষিত আসন ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করেন, ফলে জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর প্রতিনিধিত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। নাগরিক প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও জাতীয় রাজনীতিতে নারীর ভূমিকা সম্প্রসারিত হয়। ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা পর্যায়ে নারীরা সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্বে আসার সুযোগ পেতে শুরু করেন, যা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পথকে আরও প্রশস্ত করে।
১৯৯৩ সালে তিনি প্রথম নারী হিসেবে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন, যা বাংলাদেশকে আঞ্চলিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে। নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে অবদানের জন্য তিনি ২০০৫ সালে বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের ‘বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নারী’ তালিকায় স্থান পান, যেখানে তিনি ২৯তম স্থানে ছিলেন।
তার সরকার ধর্ষণ, অ্যাসিড সন্ত্রাস ও যৌতুকের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন করে- যেখানে শাস্তি দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড থেকে শুরু করে গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। কর্মজীবী ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকেও খালেদা জিয়ার সরকারের নজর ছিল।
খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বড় অবদান একজন নারী হয়েও তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। তার এই অবস্থান বাংলাদেশের নারীদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে যে নেতৃত্ব শুধু পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার নয়। রাজনীতি, প্রশাসন বা সমাজ- সব ক্ষেত্রেই নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারে, এই বিশ্বাসকে তিনি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সংস্কারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন খালেদা জিয়া। বিশেষভাবে তিনি নারীর সাক্ষরতার হার বাড়াতে এবং তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হন। এ জন্য তিনি মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং বাংলাদেশের রফতানিমুখী পোশাক খাতের বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখেন যেখানে বহু নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে।
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মেয়েদের স্কুলমুখী করতে বিনামূল্যে শিক্ষার পাশাপাশি শুধু তাদের জন্য আলাদা উপবৃত্তির ব্যবস্থাও করেন তিনি। বিদেশি দাতাদের সহায়তায় স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে দুপুরের খাবার সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে তার আমলে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তির হার বেড়ে যায়।
১৯৯৩ সালের ১৭ নভেম্বর মার্কিন পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখায় খালেদা জিয়া প্রশংসিত হন। পত্রিকাটিতে লেখা হয়, ‘একসময়ের লাজুক এবং চাপা স্বভাবের গৃহবধূ খালেদা জিয়া, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শিক্ষা খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছেন, বিশেষ করে নারী শিক্ষায়। খালেদা জিয়া অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে কারিগরি প্রশিক্ষণকেও উৎসাহিত করেছেন মেয়েদের মাঝে।’
খালেদা জিয়ার অবদান শুধুই কিছু নীতিমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তিনি বাংলাদেশের নারীদের সামনে সম্ভাবনার একটি দরজা খুলে দিয়েছেন। তার এই পথচলা নারীর ক্ষমতায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারীদের জন্য সাহস, আত্মমর্যাদা ও সম্ভাবনার পথ প্রশস্ত করেছেন। ইতিহাস তাকে মনে রাখবে শুধুই একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়নের এক প্রতীক হিসেবে।
সময়ের আলো/এনএ