দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের মহাকাব্যিক চিরবিদায়

মো. নূর হামজা পিয়াস

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভুবন বহু উত্থান-পতনের আলো-অন্ধকারে দগ্ধ হয়েছে, কিন্তু এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কিছু মুহূর্ত আছে যেগুলো ব্যক্তিগত স্মৃতির মণিকোষে দীপশিখার

2026-01-01T04:00:28+00:00
2026-01-01T04:00:28+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের মহাকাব্যিক চিরবিদায়
মো. নূর হামজা পিয়াস
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:০০ এএম   (ভিজিট : ৩০৪)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভুবন বহু উত্থান-পতনের আলো-অন্ধকারে দগ্ধ হয়েছে, কিন্তু এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কিছু মুহূর্ত আছে যেগুলো ব্যক্তিগত স্মৃতির মণিকোষে দীপশিখার মতো চিরকাল জ্বলে থাকে। গত ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় শীতের ঘন কুয়াশাকে ছাপিয়ে যখন ‘মাদার অব ডেমোক্র্যাসি’ নামে খ্যাত বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবরটি আসে, তখন সারা দেশে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। 

শীতের সেই হিমেল সকালটি যেন কেবল একটি প্রাণের বিদায় ছিল না, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশাল এবং বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের যবনিকা ছিল। খালেদা জিয়া তেমনই এক নাম, যার জীবন ও ভূমিকা বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতিকে কয়েক দশক ধরে নির্মাণ ও প্রভাবিত করেছে।

বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার আবির্ভাব ছিল অভাবনীয় এবং নাটকীয়। ১৯৮১ সালে যখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, তখন দলটি এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছিল। সেই সময় একজন সাধারণ গৃহবধূর জীবন ছেড়ে রাজনীতির বন্ধুর পথে পা রাখা ছিল এক অসম সাহসিকতার পরিচয়। 

তিনি যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের হাল ধরেন, তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও ভাবতে পারেননি যে, এই শান্ত ঘরোয়া নারীটি একদিন দেশের ক্ষমতার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবেন। ক্ষমতার বলয়ের ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া একটি রাজনৈতিক দলকে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের অন্তরে পৌঁছে দেওয়ার যে কৃতিত্ব তিনি দেখিয়েছেন, তা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে বিরল।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল তার মার্জিত ভাষা এবং সংযত আচরণ। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম, তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি কখনোই কারও প্রতি ব্যক্তিগত হিংসা-বিদ্বেষ বা অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেছেন বলে নজির নেই। এমনকি চরম রাজনৈতিক সংকটে বা ব্যক্তিগত অপমানের মুখেও তিনি তার গাম্ভীর্য ও শালীনতা হারাননি। 

এই চারিত্রিক দৃঢ়তা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা একটি উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। তার বক্তৃতা ও বিবৃতিতে যে শিষ্টাচার প্রতিফলিত হতো, তা আজকের প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য একটি বড় শিক্ষার বিষয়। প্রতিহিংসার রাজনীতির ভিড়েও তিনি নিজেকে একজন পরিশীলিত রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, যা তার ব্যক্তিত্বকে এক পৌরাণিক মহিমায় ভূষিত করে।

১৯৯১ সালের ২০ মার্চ তিনি যখন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, তখন দেশজুড়ে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়। তার হাত ধরেই বাংলাদেশে আবার সংসদীয় সরকারব্যবস্থা ফিরে আসে, যা দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে এক আমূল পরিবর্তন আনে। নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তার এই অবস্থান ছিল একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে নারী নেতৃত্ব আজও নানা বাধার সম্মুখীন হয়, সেখানে আশির দশকের শেষে তার রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো ছিল দক্ষিণ এশিয়ার নারী জাগরণের এক নতুন দিগন্ত।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে খালেদা জিয়ার শাসনকাল বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে গভীর ছাপ রেখে গেছে। তার আমলে নারী শিক্ষার প্রসারে বিনামূল্যে শিক্ষাদান এবং উপবৃত্তি চালুর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা আজ বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন সূচকের ঈর্ষণীয় সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে গণ্য করা হয়। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রঋণের বিস্তারে তার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে খালেদা জিয়াকে কেবল একটিমাত্র দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা অসম্ভব। তিনি যেমন ছিলেন গণতান্ত্রিক ধারার একজন প্রধান প্রতিনিধি, তেমনি বাংলাদেশের সংঘাতময় রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও একটি অংশ ছিলেন। তার শাসনকাল যেমন সাফল্যে মোড়া ছিল, তেমনি নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার চ্যালেঞ্জও তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। তার পুরো রাজনৈতিক জীবন ছিল এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মতো। এই যে প্রতিকূলতার মুখে নতি স্বীকার না করার মানসিকতা, এটিই তাকে তার সমর্থকদের কাছে এক অজেয় আইকনে পরিণত করেছে।

২০২৫ সালের হালনাগাদ তথ্য ও পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের একটি বিশাল অংশ আজও খালেদা জিয়ার আপসহীন রাজনৈতিক জীবনকে গবেষণার বিষয় হিসেবে গণ্য করে। দেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করেন যে খালেদা জিয়ার শাসনামলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তিগুলো শক্তিশালী হয়েছিল। 

বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের বিকাশ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে তার সরকারের অবদান আজও পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি রাজনীতি থেকে শারীরিকভাবে দূরে ছিলেন, তবু জনমতে তার প্রভাব কমেনি। এক ডিজিটাল এনগেজমেন্ট রিপোর্টে দেখা গেছে, তার মৃত্যু সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং শোকাবহ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন আমাদের এই কঠোর শিক্ষা দেয় যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব ও মানুষের ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী। ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ইতিহাসের পাতায় তার যে যাত্রা, তা আসলে বাংলাদেশের রাজনীতিরই এক সচিত্র প্রতিচ্ছবি। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে পরাজয়ের গ্লানি ঝেড়ে ফেলে আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। তার শারীরিক অনুপস্থিতি হয়তো জাতীয়তাবাদী দলের জন্য এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করবে, কিন্তু তার আদর্শ ও জীবনদর্শন বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের জন্য চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের লড়াইয়ে তার ভূমিকার পাশাপাশি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তিনি ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছিলেন। তার আমলেই লুক-ইস্ট পলিসি বা পূর্বমুখী নীতির মাধ্যমে এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন মাত্রা যোগ হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) কার্যক্রমকে বেগবান করতে তার উদ্যোগ ছিল প্রশংসনীয়। তিনি সবসময় চেয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক।

একজন নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ছিলেন অত্যন্ত ধৈর্যশীল এবং কৌশলী। বিএনপির মতো একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও বড় দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা ছিল তার নেতৃত্বের অন্যতম বড় সাফল্য। সামরিক বাহিনী থেকে আসা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হয়েও তিনি সিভিল সোসাইটি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার দল পরিচালনা পদ্ধতি ছিল অনেকটা অভিভাবকসুলভ। 

দলীয় নেতাকর্মীদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো এবং তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখার যে ক্ষমতা তার ছিল, তা তাকে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দল যখন বিপর্যয়ে পড়েছে, তখন তার একটি আহ্বানই হাজার হাজার কর্মীকে রাজপথে নামাতে সক্ষম হতো।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যপুস্তক হতে পারে। রাজনীতির মারপ্যাঁচ, চড়াই-উতরাই এবং প্রবল চাপের মুখেও কীভাবে ধৈর্য ধারণ করতে হয়, তা তার জীবনী থেকে শেখার আছে। তিনি দেখিয়ে গেছেন যে, ধৈর্য এবং সহনশীলতা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং তা নেতৃত্বের বড় গুণ।

দীর্ঘ অসুস্থতার মধ্যেও তিনি তার ব্যক্তিত্বের মর্যাদা রক্ষা করেছেন। কোনো লোভ বা ভয়ের কাছে তিনি মাথা নত করেননি। এই যে নৈতিক দৃঢ়তা, এটিই তাকে ইতিহাসের পাতায় নন্দিত করেছে। তার মৃত্যুতে দেশ কেবল একজন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে হারায়নি, বরং হারিয়েছে এক মূর্ত প্রতীককে, যিনি গণতন্ত্রের জন্য বারবার ত্যাগ স্বীকার করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন নেতৃত্বের মেরুকরণ শুরু হতে পারে। তবে তার রেখে যাওয়া আদর্শ এবং বাংলাদেশ বাদের চেতনা দলের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের যে অনন্য সংমিশ্রণ তিনি তার রাজনীতিতে প্রয়োগ করেছিলেন, তা বাংলাদেশের মানুষের একাংশের কাছে একটি শক্তিশালী বিশ্বাসের নাম। এই বিশ্বাসের ওপর ভর করেই তার দল আগামী দিনে এগিয়ে যাবে। ব্যক্তি চলে যান কিন্তু তার রেখে যাওয়া কীর্তি ও অধ্যায় ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।

বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে কয়েক দশক ধরে উজ্জ্বলভাবে জ্বলছিল। তার মহাপ্রয়াণ কেবল একটি শোকাবহ ঘটনা নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ইতিহাসের বিচারে তাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে দেখা যায়, তিনি যেমন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন, তেমনি তার সময়ের সীমাবদ্ধতাগুলোও ইতিহাসের অংশ হয়েছে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে তার পরিচয় তিনি ছিলেন কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় আসীন একজন আপসহীন নেত্রী। আজ যখন তিনি ইতিহাসের অন্তিম শয়ানে, তখন তার রেখে যাওয়া কর্ম ও স্মৃতিগুলোই হবে আগামীর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পাঠ। ইতিহাসের পাতায় তিনি থাকবেন অমøান ও চিরভাস্বর।

লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

সময়ের আলো/কেএইচও


  বিষয়:   রাজনৈতিক  অধ্যায়  মহাকাব্যিক  চিরবিদায় 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: