নতুন বছরের আগমন সবসময়ই মানুষের মনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়। ২০২৬ সাল বাংলাদেশের জন্য ঠিক তেমনই একটি সময়, যখন দীর্ঘ অপেক্ষা, অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধির ভেতর দিয়ে দেশ সামনে এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই বছরকে ঘিরে মানুষের স্বপ্নগুলো আর আকাশছোঁয়া কল্পনায় আটকে নেই, বরং বাস্তব জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠেছে। আমরা দেখতে পাই যে, সাম্প্রতিক বছরগুলো মানুষকে সংযত ও বাস্তববাদী করেছে। তবু স্বপ্ন দেখার শক্তি নিঃশেষ হয়নি। বরং স্বপ্নের ভাষা বদলেছে। এখন স্বপ্ন মানে শান্তিপূর্ণ দিন, নিরাপদ জীবন এবং সম্মানজনক জীবিকার নিশ্চয়তা। উল্লেখযোগ্য হলো, ২০২৬ সালের শুরুতে মানুষের চাওয়ার কেন্দ্রে রয়েছে স্থিতিশীলতা, আস্থা এবং আগামীর ওপর নির্ভরতার অনুভূতি।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ঘিরে আছে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসাকে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা মানুষকে নীরব আশায় ভরিয়ে তুলছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হলে জাতীয় সংসদ আবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। মানুষের কল্পনায় ভেসে উঠছে এমন একটি সংসদ, যেখানে কোরামের অভাবে অধিবেশন থেমে থাকবে না, ওয়াকআউট হবে ব্যতিক্রম, আর স্পিকার নিয়মিত ও মর্যাদার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করবেন। যেহেতু গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি সংসদেই প্রতিফলিত হয়, সেহেতু মানুষের আশা সংসদের প্রতিটি অধিবেশন হবে গঠনমূলক আলোচনা ও যুক্তিনির্ভর বিতর্কে পরিপূর্ণ। বিরোধিতা থাকবে, মতভেদ থাকবে, কিন্তু তা হবে শালীন ও দায়িত্বশীল। অভিজ্ঞতা দেখায়, এমন সংসদই রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনে। তাই বলা যায়, ২০২৬ সালের একটি বড় স্বপ্ন হলো সংসদ আবারও জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রকৃত প্রতীক হয়ে ওঠা।
রাজনীতির এই স্বাভাবিকতার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিকে ঘিরেও প্রত্যাশা বদলাচ্ছে। মোটাদাগে বলতে গেলে, মানুষ আর কেবল প্রবৃদ্ধির সংখ্যা শুনতে চায় না, তারা চায় সেই প্রবৃদ্ধির প্রভাব নিজের জীবনে দেখতে। কৃষকের চোখে সেই প্রত্যাশা সবচেয়ে স্পষ্ট। গ্রামবাংলা স্বপ্ন দেখছে এমন এক সময়ের, যখন কৃষকের গোলা ভরে উঠবে নতুন ধানে। সময়মতো বীজ, সার এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে কৃষি আবারও সম্মানের পেশা হয়ে উঠবে, আর কৃষি ব্যবসা হবে সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ সালে ধান উৎপাদন ৩৭,৫০০ হাজার টন হতে পারে, যা বিগত বছরের চেয়ে বৃদ্ধি পাবে। (সূত্র : টঝউঅ)। অভিজ্ঞতা দেখায়, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সহায়তার ফলে কৃষকরা আরও উন্নত ফসল উৎপাদন করতে পারবে, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, কৃষি জিডিপিতে ১১.৫৫ শতাংশ অবদান রাখছে, যা ৪৪.৪২ শতাংশ মানুষের জীবিকা। এই অগ্রগতি একটি গল্পের মতো বিকশিত হচ্ছে, যেখানে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে এবং দেশের অর্থনীতি মজবুত হবে।
এই ধারাবাহিকতায় তরুণদের স্বপ্নও নতুন রূপ নিচ্ছে। অন্যদিকে শহরের তরুণ সমাজ কেবল চাকরির অপেক্ষায় থাকতে চায় না। তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, তরুণরা এখন উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস দেখাচ্ছে। ২০২৬ সালে লাখ লাখ বেকার তরুণ নতুন পরিচয়ে সামনে আসবে উদ্যোক্তা হিসেবে। ছোট উদ্যোগ, প্রযুক্তিনির্ভর ভাবনা এবং সৃজনশীল চিন্তার মাধ্যমে তারা নিজেদের কর্মসংস্থানের পথ নিজেরাই তৈরি করবে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে আনএমপ্লয়মেন্ট রেট ৫.৮৫ শতাংশ, যা সংস্কারের ফলে কমতে পারে। (সূত্র : ঝঃধঃরংঃধ)। অভিজ্ঞতা দেখায়, স্টার্টআপ এবং প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের মাধ্যমে যুবকরা নতুন ব্যবসা গড়ে তুলছে, যা অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে সহায়তা করবে। এই স্বপ্নের গভীরে রয়েছে আত্মনির্ভরতার শক্ত বার্তা।
এই উদ্যোক্তা যাত্রাকে এগিয়ে নিতে মানুষের আরেকটি বড় প্রত্যাশা প্রশাসনিক পরিবেশের পরিবর্তন। বহুদিনের পরিচিত লাল ফিতার জট যেন অতীতের গল্প হয়ে যায়, এমন আশা এখন জোরালো। সচিবালয়ে সিদ্ধান্ত আসবে দ্রুত, নিয়ম হবে সহায়ক, আর সেবা হবে নাগরিকের অধিকার হিসেবে সহজলভ্য। বাস্তবতা হলো, যখন প্রশাসন মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তখন উন্নয়ন নিজে থেকেই গতি পায়। প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে। তারা কারও আজ্ঞাবহ হবে না, বরং আইনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। এই স্বাধীনতা নিশ্চিত হলে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়বে, আর জনসেবা হবে আরও কার্যকর।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশাও ২০২৬ সালে অনেক বেশি পরিণত। তারা চায় স্থিতিশীল নীতি, ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা। অথচ অতীতে পণ্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নতুন বছরের স্বপ্ন হলো ব্যবসা হবে নৈতিক, বাজার থাকবে নিয়ন্ত্রিত, আর ভোক্তা পাবে ন্যায্য দাম। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে এক্সপোর্ট আয় ৬২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালে বাড়তে পারে। এই পরিবর্তন আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চার মাধ্যমেই স্থায়ী হবে।
শিক্ষা খাত নিয়েও মানুষের আশা গভীর। যদিও আগের অস্থিরতার ছাপ এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি, তবু সত্য হলো পরিবর্তনের প্রত্যাশা শক্ত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে নিরাপদ, মুক্ত চিন্তার জায়গা। শিক্ষকরা ভয়ের নয়, সম্মানের পরিবেশে পাঠদান করবেন। শিক্ষার্থীরা সন্ত্রাস বা অনিশ্চয়তার আতঙ্ক ছাড়াই জ্ঞানচর্চায় মনোযোগ দিতে পারবে, এমন বিশ্বাস নতুন বছরের স্বপ্নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। শিক্ষাঙ্গনগুলো হবে সেশনজটমুক্ত, যেখানে মেধাবীরা পাবে নিরাপদ ও ভয়মুক্ত পরিবেশ। ক্যাম্পাসে থাকবে না কোনো সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বা ক্ষমতার দাপট। হলগুলো আর সিট বাণিজ্যের জায়গা হবে না, শিক্ষার্থীরা পাবে ন্যায্য আবাসন। গেস্টরুমের নামে কোনো নির্যাতন থাকবে না, থাকবে সহমর্মিতা ও সহাবস্থান। মুক্তবুদ্ধির চর্চা হবে আরও জোরালো, ভিন্নমত প্রকাশ হবে স্বাভাবিক ও নিরাপদ। বেরিয়ে আসবে আগামীর তেজস্বী তরুণরা, যারা বিদেশমুখী না হয়ে দেশেই কাজ করবে, দেশেই উদ্ভাবন করবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তিকে ব্যবহার করবে দেশের উন্নয়নে।
সমাজের আরেকটি নীরব প্রত্যাশা হলো স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক শান্তি। মানুষ চায় এমন একটি বছর, যখন রাস্তায় বের হলে ভয় কাজ করবে না, মত প্রকাশ করলে অনিশ্চয়তা থাকবে না। যদিও মাঝে মাঝে চ্যালেঞ্জ আসতেই পারে, তবু মানুষ বিশ্বাস করে এই জাতি সংকটের সামনে মাথা নত করার জন্য জন্মায়নি। আঘাত এলে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি এই সমাজ বারবার দেখিয়েছে। দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি ফিরে আসুক, এই প্রত্যাশা আজ সবার। কারণ গত অর্ধশতাব্দী ধরে এই আকাক্সক্ষা যেন অন্ধকারেই ধুঁকে ধুঁকে মরেছে। বেতার ও টেলিভিশন হবে সত্যিকার অর্থে স্বায়ত্তশাসিত, কোনো পক্ষের মুখপাত্র নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, ন্যায়বিচার হবে প্রভাবমুক্ত ও সময়োপযোগী। দেশের গণমাধ্যমের ওপর কোনো খড়গহস্ত থাকবে না, সংবাদ হবে ভয়মুক্ত ও দায়িত্বশীল।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে ভয় একেবারে নেই এমন নয়, তবে আশার জায়গাটাও শক্ত। অভিজ্ঞতা দেখায়, দুর্যোগ এলে এই দেশের মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের প্রত্যাশা হলো প্রস্তুতি থাকবে, ক্ষয়ক্ষতি কমবে, আর পুনরুদ্ধার হবে দ্রুত। প্রকৃতি যদি কখনো পরীক্ষা নেয়, তবে ঐক্যই হবে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মূল শক্তি। দেশে বসবাসরত প্রায় ৪০ লাখ প্রতিবন্ধী নাগরিক কোনো অবহেলার শিকার হবেন না, রাষ্ট্রীয় নীতি ও সমাজব্যবস্থায় তারা পাবেন মর্যাদা ও সুযোগ। সমতল ও পাহাড়, উভয় অঞ্চলে শান্তি ও সহাবস্থান বজায় থাকবে, বিভাজন নয়, সংলাপই হবে পথ।
এসব ভাবনার ভেতর দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ২০২৬ সালের প্রত্যাশা মূলত স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশা। বড় বড় কথার চেয়ে ছোট ছোট পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় একটি ভালো জীবনের স্বপ্নই মানুষের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। চ্যালেঞ্জ যে নেই তা নয়, তবে সেগুলো এতটাই হালকা সেগুলো স্বপ্নের আলোকে ঢেকে যায়। অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্যোগের মতো চ্যালেঞ্জ থাকলেও সেগুলো হালকা করে দেখা যায়। মুদ্রাস্ফীতি ৯.২ শতাংশ হয়েছে, পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিপরীতে দেখা যায়, এক্সপোর্টের কিছু ডেক্লাইন সত্ত্বেও জগ-এ সেক্টর শক্তিশালী। তবে মনে রাখা দরকার, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিলেও জাতির লড়াইয়ের ক্ষমতা অটুট। অথচ বেকারত্ব ৫.৮৫ শতাংশ সত্ত্বেও যুবকদের উদ্যোগ বাড়ছে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে, কীভাবে এগুলো কাটানো যাবে। তবু সত্য হলো, সম্মিলিত সুতরাং সব বিশ্লেষণ একত্র করে বলা যায়, ২০২৬ সাল বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণের একটি উজ্জ্বল সময়। মোদ্দাকথা এই যে, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র উজ্জীবিত হয়ে উঠবে। শেষ কথা এই যে, কৃষকের ধান, যুবকের উদ্যোগ, শিক্ষার নিরাপত্তা এবং ব্যবসার সততা দেশকে সমৃদ্ধ করবে। সারকথা হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও লড়াই করে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা জাতির শক্তি। ফলাফল স্পষ্ট যে, সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্বপ্নগুলো পূরণ হবে।
সবশেষে বলা যায়, ভবিষ্যতে আরও সংস্কার এবং ঐক্যবদ্ধতা প্রয়োজন। এককথায়, নতুন বছরের শুভকামনা সবাইকে, আসুন, স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাই।
এই প্রত্যাশাগুলো কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি সুস্থ রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। এগুলো পূরণ হলে তবেই ২০২৬ সাল কেবল একটি নতুন বছর হয়ে থাকবে না, বরং একটি নতুন সময়ের সূচনা হবে।
লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
সময়ের আলো/এসকে/