খালেদা জিয়া : এক রাষ্ট্রনায়কের বিদায়

ফেরদৌস সালাম

দেশের ১৮ কোটি মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রদূত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের উজ্জ্বল নক্ষত্র আপসহীন নেত্রী সাবেক

2026-01-02T04:57:16+00:00
2026-01-02T04:57:16+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
খালেদা জিয়া : এক রাষ্ট্রনায়কের বিদায়
ফেরদৌস সালাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:৫৭ এএম   (ভিজিট : ১৭১)
বেগম খালেদা জিয়া। গ্রাফিক : সময়ের আলো
দেশের ১৮ কোটি মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রদূত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের উজ্জ্বল নক্ষত্র আপসহীন নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার সুদীর্ঘ বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন একজন সৎ, সাহসী, ন্যায়নিষ্ঠ, বিচক্ষণ ও বিনয়ী দেশনেত্রী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার সোচ্চার ভূমিকার কারণেই তাকে অভিধা করা হয় ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে। তিনি ছিলেন এই মৃত্তিকায় গণতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ে এক হিমালয়সম দুর্ভেদ্য কণ্ঠস্বর। তার এই মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত বিয়োগ নয়, এটি একটি যুগের অবসান, একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের নীরব সমাপ্তি।

খালেদা জিয়া শুরুতে ছিলেন একান্তই একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী- যার ডাকনাম ছিল পুতুল। অন্য দশজন গৃহবধূর মতোই ছিলেন সাদামাটা এক নারী। স্বামী জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ‘ফার্স্ট লেডি’ হয়েও ছিলেন একজন আটপৌরে রমণী। 
১৯৮১ সালের ৩০ মে স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর তিনিও ছিলেন শোকে আত্মহারা। দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে দেশের অগণিত মানুষের সহমর্মিতার আবেগে তিনিও ছিলেন গভীরভাবে শোকাহত। গৃহিণী হিসেবে দুই পুত্র তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানকে বুকে জড়িয়েই পালন করেছিলেন সংসার-ধর্ম। তখনও তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রাখেননি।

এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে সরিয়ে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। এ সময় বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাই এরশাদের দলে যাওয়ার জন্য পাঁয়তারা করেন। এ পর্যায়ে গভীর সংকটের মধ্যে জাতীয়তাবাদী দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ১৯৮৪ সালে খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, জ্ঞান, মেধা ও শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তার বলে গৃহবধূ থেকে একজন শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিবিদে পরিণত হন। বিএনপি চেয়ারপারসন হিসেবে তার ক্যারিসম্যাটিক নেতৃত্বে দল যেমন সাংগঠনিকভাবে গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত হয়, তেমনি সাধারণ মানুষের ভালোবাসাতেও সিক্ত হন খালেদা জিয়া। এর ফলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দেশের প্রধান শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হতে সক্ষম হয়।

১৯৮৬ সালের স্বৈরাচারী এরশাদের পাতানো নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিলেও খালেদা জিয়া তা প্রত্যাখ্যান করে উপাধি পান আপসহীন নেত্রী হিসেবে। তার এই প্রশংসনীয় উদ্যোগ এবং জনপ্রিয়তার ফলেই ১৯৯০-এর গণআন্দোলন-পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যা গরিষ্ঠ আসন লাভ করে, তিনি হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। 

খালেদা জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৩ বার দায়িত্বপালনের সুযোগ পান। তার আমলেই নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তন আসে। তার ক্ষমতা গ্রহণ মুহূর্তে দেশে সাক্ষরতার হার যেখানে ছিল ৩৫ শতাংশ পরবর্তীতে তা ৭০ শতাংশে উন্নীত হয়। খাদ্য উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। দেশের ব্যাপক শিল্পোন্নয়ন ঘটে, গার্মেন্টস খাতসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় লাখ লাখ নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার এই সাফল্য বিএনপিকে অধিক জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত করে। তার নেতৃত্বেই দেশে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু হয়। দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থায়ী হওয়ার একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে তা দেশ-বিদেশে বিবেচিত হয়।

কিন্তু পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে তত্ত্বাবধায়ক-ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এতে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। আওয়ামী লীগের অধীনে দলীয় নির্বাচনব্যবস্থায় অংশ নিতে বিএনপিকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করতে চাইলেও খালেদা জিয়া তা থেকে বিরত থাকেন এবং সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন-সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। ইতিমধ্যে তার এবং দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দেওয়া হয়। দমন-পীড়ন, বন্দিত্ব, অবিচার কোনো কিছুতেই তিনি দমিত হননি। বরং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সরকারের বিরুদ্ধে আরও জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলেন যা একটি কিংবদন্তি ইতিহাস।

ভোটারবিহীন স্বৈরাচার সরকার খালেদা জিয়াকে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি স্পষ্ট বলেন, দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা বা আশ্রয়স্থল নেই। এ দেশেই জন্মেছি, মৃত্যুর পরও এই মাটিতে থাকব। 

সরকার হিসেবে তিনি যেমন দেশকে উন্নয়নের দিগন্তে প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছেন, তেমনি বিরোধী নেত্রী হিসেবেও জনদাবিকে সোচ্চারভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে উত্তরোত্তর জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন দেশের মাটি ও মানুষের নেত্রী। বিশেষ করে বিগত স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শত নির্যাতন, নিপীড়ন, জেল, জুলুম, মিথ্যা মামলা মাথায় নিয়েও দেশ ছেড়ে যাননি। বিশ্বের গণতান্ত্রিক ধারায় এ ধরনের নেতৃত্ব সত্যিই বিরল। তার সততা, দেশপ্রেম, মানবপ্রেম ছিল সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে। এমনকি মিথ্যা সাজা পেয়েও আইনের প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল। বয়সের ভারও তাকে রাজনৈতিক আদর্শের পথ থেকে বিরত করতে পারেনি। এ কারণেই তিনি আর শুধু দলনেত্রী থাকেননি, হয়ে উঠেছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, দেশনেত্রী। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল সৌজন্যবোধ, মানুষকে সম্মান দেওয়া এবং কটুবাক্য পরিহার করা।

ক্ষমতায় থাকাকালীন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন খাতকে দলনিরপেক্ষভাবে কাজ করার দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। তিনি বলতেন, সরকার কোনো দলের নয়, আপামর জনসাধারণের। এভাবেই তিনি আরবান মিডল ক্লাসের কাছে যেমন হয়ে উঠেছিলেন যথার্থই নেত্রী, এলিট শ্রেণির মানুষ তাকে সম্বোধন করতেন ম্যাডাম। দেশের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন দেশনেত্রী, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে আপসহীন নেত্রী এবং বিশ্ব রাজনীতিতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন স্টেটসম্যান। 

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের একজন রাজনীতিবিদের এই সম্মান শুধু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কাছেই গৌরবজনক নয়, দেশের জন্যও গৌরবের। এই মহান নেত্রীর তিরোধানে জাতি আজ শোকাভিভূত। শোক প্রকাশ করছেন দেশের একজন গৃহবধু থেকে দেশ-বিদেশের অগণিত মানুষ, সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানরা। 

এ কথা সত্য, সেই দৃঢ়কণ্ঠ থেমে গেছে, কিন্তু আদর্শ এখনও থেমে যায়নি। কোটি কোটি মানুষের মধ্যে তা প্রজ¦লিত হয়ে আছে। আমাদের প্রার্থনা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে আখেরাতেও জান্নাতুল ফেরদাউসের সম্মানজনক স্থানে থাকার সুযোগ দিন।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সাবেক ছাত্রনেতা

সময়ের আলো/এসকে/ 




  বিষয়:   খালেদা জিয়া  রাষ্ট্রনায়ক 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: