শীতকালে পথশিশুদের দুর্ভোগ ও মানবিক দায়িত্ব

মো. নূর হামজা পিয়াস

শীত এলেই ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে এক ভিন্ন বাস্তবতা চোখে পড়ে। আলো ঝলমলে বিপণিবিতান, শীতের নতুন পোশাকের বিজ্ঞাপন আর উৎসবের

2026-01-03T04:21:28+00:00
2026-01-03T04:21:28+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
শীতকালে পথশিশুদের দুর্ভোগ ও মানবিক দায়িত্ব
মো. নূর হামজা পিয়াস
প্রকাশ: শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৪:২১ এএম   (ভিজিট : ১৩৬)
ফাইল ছবি
শীত এলেই ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে এক ভিন্ন বাস্তবতা চোখে পড়ে। আলো ঝলমলে বিপণিবিতান, শীতের নতুন পোশাকের বিজ্ঞাপন আর উৎসবের আমেজের আড়ালে ফুটপাথ, রেলস্টেশন, হাসপাতাল চত্বর ও পার্কের কোনায় কাঁপতে থাকে অসংখ্য পথশিশু। তাদের শরীরে নেই পর্যাপ্ত গরম কাপড়, মাথার ওপর নেই স্থায়ী আশ্রয়। একটি পুরোনো কাপড় কিংবা পলিথিন জড়িয়ে তারা রাত পার করার চেষ্টা করে। ঠান্ডার তীব্রতায় তাদের কাঁপুনি থামে না। এই দৃশ্য শুধু মানবিক বেদনার নয়, আমাদের সমাজব্যবস্থার গভীর ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি।

পথশিশুদের জীবনে দিন আর রাতের পার্থক্য শীতে আরও নির্মম হয়ে ওঠে। দিনের বেলায় তারা হয়তো মানুষের ভিড়ে নিজেকে কিছুটা আড়াল করতে পারে, কিন্তু রাতে ঠান্ডা তাদের সব প্রতিরোধ ভেঙে দেয়। ফুটপাথের খোলা জায়গা, দোকানের বারান্দা কিংবা স্টেশনের মেঝে তাদের শয্যা। কোনো কম্বল নেই, নেই উষ্ণ কাপড়। ঠান্ডা বাতাস শরীরে ঢুকে তাদের অসুস্থ করে তোলে। অনেক শিশুই জ্বর, কাশি, নিউমোনিয়া কিংবা চর্মরোগে ভোগে, অথচ চিকিৎসা তাদের কাছে বিলাসিতা।

খাবারের অভাব পথশিশুদের কষ্টকে আরও বাড়িয়ে তোলে। শীতকালে শরীর উষ্ণ রাখতে বেশি খাবার প্রয়োজন হলেও তাদের ভাগ্যে জোটে না নিয়মিত আহার। অনেক সময় এক বেলা খেয়ে বা না খেয়েই রাত কাটে। ক্ষুধা আর ঠান্ডা একসঙ্গে তাদের শরীর ও মনকে দুর্বল করে দেয়। যখন শহরের বিত্তবান শ্রেণি শীতের উৎসবে ব্যস্ত থাকে, তখন এই শিশুরা অনাহারে, অবহেলায় দিন কাটায়। এই বৈষম্য আমাদের সামাজিক বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

বিভিন্ন সামাজিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশে পথশিশুর সংখ্যা কমেনি, বরং শহরমুখী দারিদ্র্য ও অভিবাসনের কারণে তা বেড়েছে। রাজধানী ঢাকাতেই লক্ষাধিক শিশু স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে রাস্তায় বসবাস করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শীতকালে এদের বড় একটি অংশ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত পথশিশুদের মৃত্যুঝুঁকি সাধারণ শিশুদের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।

শীতের রাতগুলো পথশিশুদের জন্য কেবল ঠান্ডার লড়াই নয়, বরং এক অজানা আতঙ্কের নাম। নগর পরিকল্পনায় অনেক বড় প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলেও পথশিশুদের জন্য নাইট শেল্টার বা রাত্রিকালীন আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। ফলে রেলস্টেশনের ওভারব্রিজ বা অন্ধকার গলির মোড়ই হয় তাদের শেষ ভরসা। খোলা জায়গায় ঘুমানোর ফলে তারা কেবল শীতের শিকার হয় না, বরং মাদকাসক্ত বা অপরাধী চক্রের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। একটি স্থায়ী ছাদ বা সামান্য উষ্ণতা তাদের জীবনে নিরাপত্তার যে নিশ্চয়তা দিতে পারত, তার অভাব আমাদের নগর উন্নয়নের কঙ্কালসার রূপটিই প্রকাশ করে।

এই পরিস্থিতি আমাদের মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অবক্ষয় স্পষ্ট করে। সমাজে বিত্তশালী মানুষের অভাব নেই, শীতের পোশাকের দোকানে ভিড় উপচে পড়ে, অথচ সেই পোশাকের একটি অংশও পথশিশুদের ভাগ্যে জোটে না। 

এটি কেবল দানের অভাব নয়, বরং মানসিক দূরত্বের প্রতিফলন। আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি এই দৃশ্যের সঙ্গে, যা সবচেয়ে বিপজ্জনক। পথশিশুদের দুরবস্থার পেছনে কেবল দারিদ্র্য নয়, রয়েছে কাঠামোগত ব্যর্থতা। গ্রাম থেকে শহরে কাজের আশায় আসা পরিবারগুলো যখন ভেঙে পড়ে, তখন শিশুরা রাস্তায় নেমে আসে। রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা এই সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। শীতকালে এই ব্যর্থতার ফল সবচেয়ে নির্মমভাবে প্রকাশ পায়।

তীব্র শীত মোকাবিলা করার জন্য শরীরের যে অভ্যন্তরীণ শক্তির প্রয়োজন, পুষ্টিহীনতার কারণে পথশিশুদের তা থাকে না। শহরের পথশিশুদের প্রায় ৭০ শতাংশই দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। পর্যাপ্ত ক্যালরি ও ভিটামিনের অভাবে তাদের শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমে যায় যা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধনাঢ্যরা যখন শীতের সকালে গরম পিঠা বা দামি খাবারে আপ্যায়িত হয়, তখন এই শিশুরা এক টুকরো শুকনো রুটির অপেক্ষায় থাকে। খাদ্যের এই তীব্র অভাব তাদের শরীরকে রোগের চারণভূমিতে পরিণত করে, যা শীতের প্রকোপকে আরও অসহনীয় করে তোলে।

২০২৫ সালের সমাজকল্যাণ বিষয়ক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, শীতকালীন সহায়তা কর্মসূচি প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কিছু বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও তা শহরের সব পথশিশুকে পৌঁছাতে পারে না। অধিকাংশ সহায়তা স্বল্পমেয়াদি এবং তাৎক্ষণিক, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দিকে তেমন দৃষ্টি নেই। ফলে প্রতি শীতেই একই চিত্র ফিরে আসে।

অসহ্য শীত ও একাকিত্ব থেকে বাঁচতে অনেক পথশিশু ড্যান্ডি বা সলিউশন আঠার মতো মরণঘাতী মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ে। শীতকালে পথশিশুদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। তারা মনে করে নেশার ঘোরে থাকলে শীতের কামড় বা ক্ষুধার জ্বালা অনুভূত হবে না। কিন্তু এই কৃত্রিম উষ্ণতা তাদের স্নায়ুতন্ত্র ও ফুসফুসকে চিরতরে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সমাজ যখন তাদের অবহেলা করে, তখন এই বিষাক্ত নেশাই হয়ে ওঠে তাদের তথাকথিত সঙ্গী। শীতের রাতে এই শিশুদের মাদকের নীল নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার চরম ব্যর্থতা।

এই শিশুদের মানসিক অবস্থাও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ঠান্ডা, ক্ষুধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুরা ধীরে ধীরে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা বিশ্বাস হারায় মানুষের ওপর। এই মানসিক ক্ষত ভবিষ্যতে তাদের অপরাধ বা শোষণের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা সমাজের জন্য আরও বড় সংকট তৈরি করবে।

শীতকালীন প্রতিকূলতা পথশিশুদের অনিয়মিত শিক্ষা প্রচেষ্টাকেও থামিয়ে দেয়। যেসব শিশু বিভিন্ন এনজিও বা স্বেচ্ছাসেবী স্কুলের সঙ্গে যুক্ত, শীতের প্রকোপে তারা ক্লাসে আসা বন্ধ করে দেয়। পর্যাপ্ত পোশাকের অভাবে ভোরে ঘুম থেকে উঠে শিক্ষাকেন্দ্রে যাওয়া তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার তাগিদে তারা শীতের ভোরে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে সাহায্যের জন্য বের হয়, যা তাদের বই-খাতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। শিক্ষানীতিতে সবার জন্য শিক্ষার কথা থাকলেও এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শীতকালীন বিশেষ কোনো শিক্ষা সহায়তা বা পোশাক বিতরণের স্থায়ী কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।

শীতের মৌসুমে অনেক পথশিশুকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হতে দেখা যায়। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে যখন শহর ঘুমিয়ে থাকে, তখন এই শিশুরা আবর্জনা পরিষ্কার বা ভারী মাল বহনের কাজ করে সামান্য অর্থের আশায়। শ্রমবাজারের চিত্র বলছে, নিয়োগকর্তারা সস্তায় শ্রম পাওয়ার জন্য এই অসহায় শিশুদের ব্যবহার করে। কনকনে ঠান্ডায় খালি পায়ে বা পাতলা জামা পরে কাজ করায় তারা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট ও হাড়ের সমস্যায় ভোগে। অভাবের তাড়নায় তারা নিজেদের শৈশবকে এই হাড় কাঁপানো শীতে সঁপে দেয়। আইনের কঠোর প্রয়োগ ও বিকল্প কর্মসংস্থান ছাড়া এই শিশুদের শ্রমের এই নির্মম শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়।

ধনী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির সামাজিক ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু উৎসবের খরচ নয়, শীতের একটি কম্বল, একটি সোয়েটার কিংবা একটি উষ্ণ খাবার পথশিশুর জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। অথচ এই সামান্য উদ্যোগের অভাব আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতাকেই তুলে ধরে।

বর্তমান যুগে সাহায্যের অনেক আবেদন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বা ফেসবুকের মাধ্যমে আসে। কিন্তু এই ডিজিটাল চ্যারিটি অনেক সময় লোকদেখানো বা সাময়িক প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকে। প্রচারমূলক সাহায্যের একটি বড় অংশই প্রকৃত ভুক্তভোগী শিশুদের কাছে পৌঁছায় না। যারা ক্যামেরার সামনে আসতে পারে না বা গহিন গলিতে পড়ে থাকে, তারা এই ডিজিটাল দয়া থেকে বঞ্চিত হয়। সাহায্যের এই অসম বণ্টন ও লোকদেখানো মানসিকতা দূর করা প্রয়োজন। শীতের ত্রাণ যেন কেবল ফটোসেশনের বস্তু না হয়ে প্রকৃত মানবিক সেবায় পরিণত হয়, সেই দায়বদ্ধতা আমাদের প্রত্যেকের।

রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক উদ্যোগও জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে আশ্রয়কেন্দ্র, শীতকালীন স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম বাড়ানো গেলে অনেক শিশুকে বাঁচানো সম্ভব। যেখানে স্থানীয় মানুষ এগিয়ে এসেছে, সেখানে পথশিশুদের কষ্ট কিছুটা হলেও কমেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গত কয়েক বছরে শীতের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। অসময়ের বৃষ্টি ও হিমেল হাওয়া পথশিশুদের কষ্টকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। হঠাৎ বৃষ্টিতে তাদের বিছানা ও পুরোনো কাপড় ভিজে গেলে তারা সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় পথশিশুদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট ক্লাইমেট শেল্টার নেই। প্রকৃতির এই রুদ্র রূপের সামনে সবচেয়ে অরক্ষিত এই শিশুদের রক্ষা করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ও সামাজিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বছর শীতের কামড়ে আমাদের মানবতা ক্ষতবিক্ষত হতে থাকবে।

শীতে পথশিশুদের এই হাড় কাঁপানো কাঁপুনি কেবল একটি ঋতুভিত্তিক কষ্ট নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীলতার চরম পরীক্ষা। আলোকোজ্জ্বল শহর আর বিলাসিতার ভিড়ে এই শিশুদের অবহেলা করা মানে আমাদের সম্মিলিত মানবতাকে বিসর্জন দেওয়া।

এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও যদি একটি শিশু কেবল উষ্ণ কাপড়ের অভাবে মৃত্যুর মুখে পড়ে, তবে সেই উন্নয়নের কোনো নৈতিক ভিত্তি থাকে না। তাই কেবল সাময়িক দান নয়, বরং তাদের জন্য স্থায়ী আশ্রয়, শিক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য। আমাদের ক্ষুদ্র একটি প্রচেষ্টা ও একটু উষ্ণ মমতা পারে একটি নিভে যাওয়া শৈশবকে আবার জাগিয়ে তুলতে।

পথশিশুদের প্রতি আমাদের এই দায়বদ্ধতা পালনই হোক একটি মানবিক সমাজ গঠনের প্রথম পদক্ষেপ।

এএডি/


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: