বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে একজন সংসদ সদস্যের ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের গভীর ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। আমরা সচরাচর মনে করি, একজন সংসদ সদস্যের প্রধান কাজ হলো নিজ নির্বাচনী এলাকায় রাস্তাঘাট, কালভার্ট কিংবা স্কুল-কলেজ নির্মাণ করা। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে নির্বাচনের সময় আমরা প্রার্থীর মেধা বা শিক্ষাগত যোগ্যতার চেয়ে তার বিত্তবৈভব, স্থানীয় প্রভাব বা দানশীলতাকে বেশি প্রাধান্য দিই। অথচ প্রকৃতপক্ষে জাতীয় সংসদ কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা নয়; এটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ও আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। একজন সংসদ সদস্যের প্রাথমিক ও প্রধান দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের জন্য যুগোপযোগী আইন তৈরি করা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সংবিধানের ৬৬ নম্বর অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত রাখা হয়নি। ২৫ বছর বয়স এবং ভোটার তালিকায় নাম থাকলেই যে কেউ এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য প্রার্থী হতে পারেন, যা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে একটি বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা। রাষ্ট্রের একজন সাধারণ কর্মচারীর চাকরির জন্যও যেখানে নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন হয়, সেখানে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য কোনো শিক্ষাগত শর্ত না থাকা একটি বড় প্রশাসনিক অসংগতি।
আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা এখন আর সাধারণ অভিজ্ঞতার বিষয় নয়; এটি অত্যন্ত জটিল ও কারিগরি একটি বিষয়। বর্তমান বিশ্বের কূটনীতি, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির যে ব্যাপক বিস্তার, তা অনুধাবন করতে হলে ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। একজন সংসদ সদস্যকে কেবল স্থানীয় প্রতিনিধি হলে চলে না, তাকে হতে হয় একজন দক্ষ নীতিনির্ধারক। সংসদে যখন কোনো নতুন বিল বা বাজেট উত্থাপিত হয়, তার প্রতিটি শব্দের সুদূরপ্রসারী আইনি ও অর্থনৈতিক প্রভাব থাকে। হাজার পৃষ্ঠার বাজেট দলিল, জটিল আইনি খসড়া বা রাষ্ট্রীয় চুক্তির খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করা একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন বা নামমাত্র শিক্ষিত প্রতিনিধির পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
এর ফলে তৈরি হয় এক বিপজ্জনক নির্ভরতা। আইনপ্রণেতারা যখন নিজেরাই আইনের ভাষা বা বাজেটের গাণিতিক হিসাব বোঝেন না, তখন তারা আমলাতন্ত্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। জনপ্রতিনিধিরা যখন আমলাদের তৈরি করা নথিপত্র না বুঝেই সম্মতি দেন, তখন রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা আর জনগণের হাতে থাকে না। এতে জনপ্রতিনিধিদের ওপর আমলাদের প্রাধান্য তৈরি হয়, যা গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে দুর্বল করে দেয়।
রাষ্ট্র পরিচালনা অনেকটা শল্যচিকিৎসার মতো একটি বিশেষায়িত কাজ। একজন দয়ালু মানুষ যেমন ডাক্তারি বিদ্যা ছাড়া কেবল ভালো মন দিয়ে অস্ত্রোপচার করতে পারেন না, ঠিক তেমনি কেবল ভালো মানুষ বা জনদরদি হয়ে রাষ্ট্রের জটিল নীতি প্রণয়ন করা সম্ভব নয়। শিক্ষা মানুষকে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠতে শেখায় এবং তাকে যুক্তিনির্ভর করে তোলে।
অনেকে যুক্তি দেন যে, গণতন্ত্রে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকা জরুরি, তাই শিক্ষার শর্ত আরোপ করা অনুচিত। এই যুক্তিটি আবেগী হলেও বাস্তবসম্মত নয়। একজন শ্রমিক বা কৃষকের প্রতিনিধি সংসদে থাকতেই পারেন, কিন্তু তাকে অবশ্যই শিক্ষিত হতে হবে। কারণ একজন শ্রমিক নেতা যদি শ্রম আইনের জটিলতা না বোঝেন, তবে তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে কেবল শ্রমিকের কষ্টের গল্পই বলবেন, কিন্তু সেই কষ্ট দূর করার জন্য আইনি কাঠামোটি কেমন হওয়া উচিত তা বুঝতে বা বোঝাতে পারবেন না। অধিকার আদায়ের জন্য প্রয়োজন আইনি যুক্তি ও তাত্ত্বিক জ্ঞান। শিক্ষার অভাব থাকলে তিনি তার নিজ সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে বলিষ্ঠ অবস্থান নিতে ব্যর্থ হবেন। তা ছাড়া আজকের বিশ্বব্যবস্থা অত্যন্ত আন্তঃসংযুক্ত।
ভূ-রাজনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয়গুলো এখন জাতীয় আইনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংসদে পাস হওয়া একটি সাধারণ শুল্ক আইন বা বিদেশি বিনিয়োগের শর্তাবলি যদি কোনো সংসদ সদস্য না বোঝেন, তবে তিনি নিজের অজান্তেই দেশের সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারেন। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে একজন আইনপ্রণেতাকে বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার মতো ন্যূনতম জ্ঞান রাখতেই হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে রাজনীতিতে মেধাবীদের অনীহা এবং দুর্বৃত্তায়নের যে চর্চা দেখা যাচ্ছে, তা নিরসনে সংসদ সদস্য হওয়ার ন্যূনতম যোগ্যতা স্নাতক নির্ধারণ করা সময়ের দাবি। শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা থাকলে রাজনীতিতে মেধাবী ও সৎ তরুণদের অংশগ্রহণের পথ সুগম হবে। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর একটি সুস্থ চাপ সৃষ্টি করবে, যাতে তারা শিক্ষিত ও যোগ্য প্রার্থী মনোনয়ন দিতে বাধ্য হয়। একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ সাধারণত যুক্তিনির্ভর হন, যা সংসদের বিতর্কের মানকে উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আইনপ্রণেতাদের অবশ্যই শিক্ষিত হতে হবে। কারণ অন্ধ যেমন পথ দেখাতে পারে না, তেমনি শিক্ষাহীন প্রতিনিধিও জাতিকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারেন না।
এএডি/