প্রতিদিনই কিছু রোগীর মুখোমুখি হতে হয়, যারা দীর্ঘদিন ধরে অকারণ ক্লান্তি, হাড় ও মাংসপেশির ব্যথা, মনমরা ভাব বা বারবার অসুস্থ হওয়ার সমস্যায় ভুগছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেখা যায়, এ ধরনের অসুস্থতার মূল কারণ ভিটামিন ‘ডি’-এর ঘাটতি। অধিকাংশ রোগীই বুঝতে পারেন না তাদের শরীরে ভিটামিন ডি-এর অভাব রয়েছে। এ কারণেই ভিটামিন ডি-কে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’।
ভিটামিন ডি শুধু একটি ভিটামিন নয়, এটি শরীরে অনেকটা হরমোনের মতো কাজ করে। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শোষণে সহায়তা করে হাড় ও দাঁত মজবুত রাখার পাশাপাশি এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, মাংসপেশির কার্যকারিতা ঠিক রাখে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি থাকলে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এমনকি বিষণ্নতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ভিটামিন ডি-এর ঘাটতির লক্ষণগুলো খুব সাধারণ হওয়ায় আমরা প্রায়ই সেগুলোকে গুরুত্ব দিই না। অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, জয়েন্টে ব্যথা, চুল পড়া, ঘন ঘন সর্দি-কাশি, ঘুমের সমস্যা বা মুড সুইং- এসব উপসর্গ অনেক সময় আলাদা রোগ মনে হলেও মূল কারণ কিন্তু ভিটামিন ডি-এর অভাব।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি বেশ সাধারণ একটি সমস্যা। যেসব মানুষ ভিটামিন ডি ঘাটতির বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, তারা হলেন- গৃহিণী ও কর্মজীবী নারী, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, শিশু-কিশোর এবং দীর্ঘদিন অসুস্থ বা স্থূলতায় ভোগা মানুষ। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি আরও বেশি দেখা যায়, যা দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এদের ক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতা বিশেষভাবে জরুরি।
শিশুদের ক্ষেত্রে এটি রিকেটস রোগ সৃষ্টি করতে পারে। আর প্রাপ্তবয়স্কদের অস্টিওপোরোসিস, অস্টিওম্যালাসিয়া, হৃদরোগের ঝুঁকি ও সংক্রমণ প্রতিরোধে দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার ক্ষেত্রেও কম ভিটামিন ডি সুস্থ হতে বেশি সময় লাগায়।
বাংলাদেশের মতো রোদপ্রধান দেশে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি শুনতে অবাক লাগলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বর্তমান জীবনযাত্রায় আমরা বেশিরভাগ সময় ঘরের ভেতরে থাকি- অফিস, বাসা, যানবাহন সবই বদ্ধ পরিবেশ। সকালের প্রয়োজনীয় রোদে নিয়মিত থাকা হয় না। অনেকেই সৌন্দর্য রক্ষার জন্য অতিরিক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন, যা ত্বকে ভিটামিন ডি তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
রোদে থাকার সময় পোশাক বেশি ঢেকে রাখলে বা সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে ভিটামিন ডি তৈরিতে বাধা সৃষ্টি হয়। তাই মাঝেমধ্যে সানস্ক্রিন ছাড়া রোদে বের হওয়া ভালো এবং হাত, পা ও শরীরের কিছু অংশ যেন খোলা থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। অনেকেই মনে করেন সপ্তাহে কয়েক দিন বেশি সময় রোদে থাকলে পুরো বছরের ভিটামিন ডি মজুদ হয়ে যাবে। বাস্তবে শরীর কিছু ভিটামিন ডি চর্বি কোষে সংরক্ষণ করলেও তা দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন মেটাতে পারে না। তাই নিয়মিত রোদে থাকা এবং খাবারের মাধ্যমে ভিটামিন ডি গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের খাদ্যাভ্যাসে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবারের ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিদিন সকালের রোদে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় কাটানো, খাদ্য তালিকায় ডিমের কুসুম, দুধ, দই ও সামুদ্রিক মাছ অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ এই অভ্যাসগুলো ভিটামিন ডি এর ঘাটতি কমাতে সহায়ক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক ৬০০-৮০০ ওট ভিটামিন ডি প্রয়োজন। তবে বয়স, জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। তাই নিজের ইচ্ছায় ওষুধ না খেয়ে রক্ত পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।
ভিটামিন ডি-এর মাত্রা জানার ক্ষেত্রে রক্ত পরীক্ষাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- নিজের ইচ্ছেমতো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা মোটেও নিরাপদ নয়। অনেকেই সামান্য উপসর্গ দেখলেই উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি গ্রহণ শুরু করেন, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ডোজ নির্ধারণ করাই নিরাপদ ও কার্যকর।
চিকিৎসক হিসেবে আমার পরামর্শ একটাই- ভিটামিন ডি-এর ঘাটতিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি নীরবে শরীরের ভেতরে ক্ষতি করে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার জন্ম দিতে পারে। তাই সময়মতো সচেতন হওয়া, পরীক্ষা করা এবং সঠিক চিকিৎসা নিলে সুস্থ জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে।
লেখক : মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
সময়ের আলো/কেএইচও