সংগৃহীত ছবিবর্তমান সময়ে মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি স্বাস্থ্য সচেতন। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো এই স্বাস্থ্য সচেতনতার বেশিরভাগটাই এখন ওজনকেন্দ্রিক। অনেকের কাছে ‘সুস্থ থাকা’ মানেই দ্রুত ওজন কমানো, আর ওজন কমানোর নামেই শুরু হয় কঠোর ডায়েট, না খেয়ে থাকা, প্রিয় খাবার একেবারে বাদ দেওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা নানা চটকদার ডায়েট ট্রেন্ড অনুসরণ করা। এসব ডায়েট অনেক সময় সাময়িকভাবে ওজন কমালেও দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।
একজন পুষ্টিবিদ ও ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান হিসেবে আমি বারবার একটি কথাই জোর দিয়ে বলতে চাই- ডায়েট মানে শরীরকে শাস্তি দেওয়া নয়। ডায়েট হওয়া উচিত শরীরের প্রয়োজন বুঝে, বৈজ্ঞানিক ও টেকসইভাবে খাবার গ্রহণের একটি সচেতন পদ্ধতি। এই জায়গায় ক্যালরি ব্যালেন্স ডায়েট একটি বাস্তবসম্মত ও স্বাস্থ্যকর ধারণা, যা শুধু ওজন নয়- পুরো শরীরের সুস্থতার দিকে নজর দেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দীর্ঘমেয়াদে শরীর সুস্থ রাখার মূল ভিত্তি হলো খাবার থেকে পাওয়া শক্তি এবং শরীরের কাজে ব্যয় হওয়া শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। এই ভারসাম্য ঠিক থাকলে শরীর তার স্বাভাবিক কাজগুলো ঠিকভাবে করতে পারে এবং রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
সহজভাবে বললে, ক্যালরি হলো শক্তির একক। আমরা প্রতিদিন যে খাবার খাই, সেখান থেকে শরীর ক্যালরি পায়। আবার এই ক্যালরিই আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, হাঁটা-চলা, চিন্তা করা, কাজ করা, এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার মতো মৌলিক কাজগুলো সম্পন্ন করতে ব্যয় হয়। শরীরে যে পরিমাণ ক্যালরি ঢোকে এবং যে পরিমাণ ক্যালরি খরচ হয়- এই দুইয়ের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় থাকাই হলো ক্যালরি ব্যালেন্স। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ভারসাম্য নষ্ট হলেই ওজন বাড়া বা কমার পাশাপাশি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, থাইরয়েড সমস্যা ও অন্যান্য হরমোনজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অনেক সময় রোগীরা আমার কাছে এসে বলেন, ‘আপা, আমি তো খুব কম খাই, তবু ওজন কমে না।’ গবেষণা বলছে, দীর্ঘদিন খুব কম খেলে শরীর নিজের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম ধীর করে দেয়। এতে শরীর শক্তি সাশ্রয়ী অবস্থায় চলে যায় এবং ভবিষ্যতের জন্য বেশি ক্যালরি জমিয়ে রাখার চেষ্টা করে। ফলে কম খেয়েও ওজন কমে না, বরং ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও হরমোনের সমস্যা দেখা দেয়। তাই সমস্যাটি অনেক সময় খাবারের পরিমাণ নয়, বরং খাবারের মান, সময় এবং নিজের শরীরের প্রকৃত ক্যালরি চাহিদা না বোঝার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
প্রত্যেক মানুষের দৈনিক ক্যালরির প্রয়োজন এক নয়। বয়স, লিঙ্গ, উচ্চতা, ওজন, দৈহিক গঠন, কাজের ধরন, শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রা এবং হরমোনজনিত অবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই চাহিদা নির্ধারিত হয়। গবেষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, একজন সারা দিন ডেস্কে বসে কাজ করা মানুষের ক্যালরি চাহিদা আর একজন নির্মাণ শ্রমিক বা মাঠ পর্যায়ে কাজ করা মানুষের চাহিদা কখনোই এক হতে পারে না। তাই অন্যের ডায়েট কপি করে অনুসরণ করা কখনোই স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
ক্যালরি ব্যালেন্স ডায়েটের মূল দর্শন খুব সহজ- প্রয়োজনের বেশি ক্যালরি নিয়ে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে না দেওয়া এবং প্রয়োজনের কম ক্যালরি নিয়ে শরীরকে দুর্বল না করা। গবেষণা অনুযায়ী ওজন কমানোর ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণ ক্যালরি ঘাটতি সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর। এতে শরীর ধীরে ধীরে জমে থাকা অতিরিক্ত চর্বি ব্যবহার করতে পারে। আবার যাদের ওজন কম, দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন বা অস্ত্রোপচারের পর দুর্বল হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য ক্যালরি সামান্য বাড়ানো প্রয়োজন হয়। এখানে লক্ষ্য কখনোই দ্রুত পরিবর্তন নয়, বরং ধীর ও স্থায়ী সুস্থতা।
একটি বড় ভুল ধারণা হলো কম ক্যালরি মানেই স্বাস্থ্যকর খাবার। গবেষণা বলছে, ১২০০ ক্যালরির মধ্যেও পুষ্টিহীন ফাস্টফুড বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া সম্ভব, আবার ২০০০ ক্যালরির খাবারও হতে পারে পুষ্টিগুণে ভরপুর। তাই শুধু ক্যালরি নয়, খাবারের উৎস ও গুণগত মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শর্করা, প্রোটিন, চর্বি, ভিটামিন ও খনিজÑ সব পুষ্টি উপাদানের সঠিক অনুপাত বজায় না থাকলে শরীর তার উপকার পায় না। ভাত বা রুটি পুরোপুরি বাদ না দিয়ে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা, সঙ্গে শাকসবজি, ডাল, মাছ, ডিম বা মাংস রাখা এটাই বাস্তবসম্মত পথ।
ডায়েট মানে শুধু কী খাবেন তা নয়- কখন খাবেন এবং কীভাবে খাবেন সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা শরীরে স্ট্রেস হরমোন বাড়ায়, যা ওজন বৃদ্ধি ও পেটের চর্বি জমার সঙ্গে জড়িত। নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং পর্যাপ্ত ঘুম ক্যালরি ব্যালেন্স বজায় রাখতে সহায়তা করে। অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, চুল পড়া বা মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেলে বুঝতে হবে ডায়েট পদ্ধতিতে পরিবর্তন দরকার।
ক্যালরি ব্যালেন্স ডায়েট এমন একটি পদ্ধতি, যা শরীরকে দুর্বল না করে দীর্ঘদিন মেনে চলা যায়। এর সঙ্গে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম যুক্ত হলে ফল আরও ভালো হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম শুধু ক্যালরি খরচ বাড়ায় না, বরং মানসিক চাপ কমিয়ে সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করে। মানসিক চাপ কম থাকাও ওজন ও হরমোনের ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, ব্যালেন্স ডায়েট কোনো সাময়িক ট্রেন্ড নয়- এটি একটি জীবনধারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা চটকদার ডায়েট অনুসরণ করার আগে নিজের শরীর, স্বাস্থ্য অবস্থা ও জীবনযাত্রা বোঝা জরুরি। প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। কারণ গবেষণা বলছে দ্রুত পরিবর্তন নয়, অল্প অল্প সচেতন পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে সত্যিকারের সুস্থতা এনে দেয়।
লেখক : কনসালট্যান্ট সিনিয়র ডায়েটিশিয়ান
ওজন ব্যবস্থাপনা ও শিশুপুষ্টি বিশেষজ্ঞ
সময়ের আলো/এনএ