ব্যস্ত জীবনে ঘুম যেন দিন দিন বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে। কাজের চাপ, মোবাইল স্ক্রিনে দীর্ঘ সময় কাটানো, দেরি করে শুতে যাওয়া কিংবা রাত জেগে অনলাইনে থাকা- সব মিলিয়ে অনেকেই প্রতিদিন প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমাচ্ছেন। অনেকে মনে করেন, ‘একটু কম ঘুম হলেই বা কী?’ অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ঘুম কম হওয়া শরীরের জন্য এক ধরনের ঝুঁকি, যার প্রভাব ধীরে ধীরে হলেও গভীরভাবে পড়ে।
প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন গড়ে ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। এর কম হলে শরীর ও মস্তিষ্ক স্বাভাবিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায় না। প্রথম ধাক্কা আসে মস্তিষ্কে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মনোযোগ কমে যায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে কাজের ভুল বাড়ে, প্রতিক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং মানসিক চাপ আরও বেড়ে ওঠে।
ঘুমের ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলে মেজাজে। অল্পতেই রাগ, অস্থিরতা, উদ্বেগ কিংবা মন খারাপ- এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ঘুম কম হলে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক সময় মানুষ নিজের অজান্তেই মানসিকভাবে ক্লান্ত ও উদাসীন হয়ে পড়ে, যার প্রভাব পড়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সামাজিক জীবনে।
শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য ঘুম অত্যন্ত জরুরি। গভীর ঘুমের সময় শরীর বিভিন্ন সাইটোকাইন ও প্রতিরক্ষামূলক উপাদান তৈরি করে, যা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করে। ঘুম কম হলে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে ঘন ঘন সর্দি-কাশি, জ্বর বা সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং অসুখ সেরে উঠতেও বেশি সময় লাগে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন কম ঘুমালে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যায়, যা হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও ঘুমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কম ঘুমালে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে এবং ওজন বৃদ্ধি, স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ঘুমের ঘাটতি হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটায়। বিশেষ করে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে গিয়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ত্বকেও এর প্রভাব পড়ে- চোখের নিচে কালো দাগ, নিস্তেজ ত্বক ও অকাল বার্ধক্যের লক্ষণ দেখা দেয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঘুম কম থাকার অভ্যাস যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তা হলে তা শরীরের সামগ্রিক কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়। কাজের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং জীবনের মান নেমে আসে।
তাই সুস্থ থাকতে হলে ঘুমকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, শোয়ার আগে মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহার কমানো, ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা এবং ঘুমের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, ভালো ঘুম কোনো অলসতা নয়; এটি সুস্থ শরীর ও মন গঠনের অন্যতম শর্ত।
সময়ের আলো/এনএ