ত্বকের অসুখে অসচেতনতা, বাড়ছে চর্মরোগ

নিবেদিতা দাস

মানুষের শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ ত্বক। শরীরকে বাইরের আঘাত, জীবাণু ও দূষণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ত্বক অনেক সময় ভেতরের

2026-01-19T15:35:14+00:00
2026-01-19T15:35:14+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
ত্বকের অসুখে অসচেতনতা, বাড়ছে চর্মরোগ
নিবেদিতা দাস
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৩৫ পিএম 
ত্বকের অসুখে অসচেতনতা, বাড়ছে চর্মরোগ
মানুষের শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ ত্বক। শরীরকে বাইরের আঘাত, জীবাণু ও দূষণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ত্বক অনেক সময় ভেতরের অসুখের প্রথম সতর্কবার্তা দেয়। অথচ সামান্য চুলকানি, ফুসকুড়ি কিংবা র‌্যাশকে অবহেলা করতে করতেই অনেক চর্মরোগ জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি আকার ধারণ করে।

বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে আবহাওয়া, পরিবেশদূষণ, জনবসতির চাপ, জীবনযাপনের ধরন ও ভুল চিকিৎসার কারণে চর্মরোগীর সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চর্মরোগ কেবল সৌন্দর্যজনিত সমস্যা নয়, এটি শারীরিক ও মানসিক, দুই ধরনের জটিলতারই কারণ হতে পারে।

কেন বাড়ছে চর্মরোগ

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রোকসানা হক বলেন, ‘আমাদের দেশে অতিরিক্ত গরম, ঘাম, ধুলাবালি, দূষণ ও অপরিচ্ছন্নতা চর্মরোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত কসমেটিক ব্যবহার ও নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ খাওয়ার প্রবণতা।’
তিনি জানান, বর্তমানে ফাঙ্গাল সংক্রমণ, একজিমা, খোসপাঁচড়া (স্ক্যাবিস), ব্রণ, অ্যালার্জি ও সোরিয়াসিস সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। পুষ্টির ঘাটতি, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং হাতুড়ে চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীলতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

সাধারণ চর্মরোগ ও লক্ষণ

চর্মরোগের ধরন অনেক হলেও কিছু সমস্যা প্রায় সবার মধ্যেই দেখা যায়। যেমনÑ
ফাঙ্গাল সংক্রমণ : দাদ, চুলকানি, লালচে বা গোল দাগ।
একজিমা : ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, চুলকানি, ফেটে যাওয়া।
ব্রণ : মুখ, পিঠ ও বুকে ফুসকুড়ি।
এলার্জি : হঠাৎ চুলকানি, র‌্যাশ, ত্বক ফুলে যাওয়া।
সোরিয়াসিস : ত্বকে সাদা খোসা পড়া, দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা।

ডা. রোকসানা হক বলেন, ‘অনেকেই এসব সমস্যাকে তুচ্ছ ভেবে ফার্মেসি থেকে ক্রিম কিনে ব্যবহার করেন, যা সাময়িক আরাম দিলেও শেষ পর্যন্ত রোগকে আরও জটিল করে তোলে।’

স্টেরয়েড ক্রিম : নীরব বিপদ

চর্মরোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো স্টেরয়েডযুক্ত ক্রিমের অপব্যবহার। দোকান থেকে সহজে পাওয়া এসব ক্রিম অনেক সময় ‘ম্যাজিক’ সমাধান মনে হলেও বাস্তবে এটি টাইম বোমার মতো ক্ষতিকর।

ডা. রোকসানা হক সতর্ক করে বলেন, ‘স্টেরয়েড ক্রিম সাময়িকভাবে চুলকানি বা লালভাব কমালেও দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে ত্বক পাতলা হয়ে যায়, রং বদলে যায় এবং রোগ আরও জটিল হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশু ও নারীদের ক্ষেত্রে এর ক্ষতি ভয়াবহ হতে পারে।’

সংক্রমণশীল চর্মরোগ ও ওষুধ-প্রতিরোধ

বর্তমানে চর্মরোগ বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে দুটি সংক্রামক রোগ, খোসপাঁচড়া ও ছত্রাকজনিত সংক্রমণ। এসব রোগের ক্ষেত্রে সাধারণ অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ আগের মতো কার্যকর না হওয়ায় চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ, ভারত ও জার্মানির যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে একটি নতুন ছত্রাকজাত সংক্রমণের তথ্য, ট্রাইকোফাইটন মেন্টাগ্রোফাইটস আইটিএস জেনোটাইপ ৮, যা বর্তমানে ট্রাইকোফাইটন ইন্দোতিনি নামে পরিচিত। এই ছত্রাক সাধারণ অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের প্রচলিত ডোজে ভালো সাড়া দেয় না। স্টেরয়েড ও স্টেরয়েড-অ্যান্টিফাঙ্গাল মিশ্রিত ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলেই এমন প্রতিরোধক্ষম ছত্রাক তৈরি হচ্ছে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

চর্মরোগের প্রভাব শুধু শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের মনে গভীর ছাপ ফেলে। মুখে ব্রণ, হাতে দাগ বা শরীরে খোসা পড়ার কারণে অনেকেই আত্মবিশ্বাস হারান, সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেন।

ডা. রোকসানা হক বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগে ভোগা অনেক রোগীর মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ এমনকি বিষণ্নতাও দেখা যায়। তাই চর্মরোগের চিকিৎসাকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি :

চুলকানি বা ব্যথা বেড়ে গেলে।
ত্বকের রং অস্বাভাবিকভাবে বদলে গেলে।
শিশু বা বয়স্কদের ত্বকে সমস্যা দেখা দিলে।
৭-১০ দিনের মধ্যে সমস্যা না কমলে।

প্রতিরোধ ও করণীয়

চর্মরোগ প্রতিরোধে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললেই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব : 
প্রতিদিন পরিষ্কার পানি দিয়ে শরীর ধোয়া।
ঘাম হলে দ্রুত পরিষ্কার হওয়া।
তোয়ালে, কাপড় ও ব্যক্তিগত জিনিস আলাদা ব্যবহার করা।
অপ্রয়োজনীয় কসমেটিক এড়িয়ে চলা।
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ক্রিম বা ওষুধ ব্যবহার না করা।
পরিবারের কেউ খোসপাঁচড়ায় আক্রান্ত হলে সবাইকে একসঙ্গে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে, নইলে সংক্রমণ বারবার ফিরে আসতে পারে।

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা

চর্মরোগ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও সচেতন থাকলে এর জটিলতা রোধ করা যায়।

ডা. রোকসানা হক বলেন, ‘সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিলে বেশিরভাগ চর্মরোগই ভালো হয়ে যায়। সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নিজে ডাক্তার না হওয়া।’
ত্বক আমাদের শরীরের আয়না। এর যত্ন নেওয়া মানে নিজের সুস্থতার দিকেই একধাপ এগিয়ে যাওয়া। জাতীয় পর্যায়ে ওষুধ ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, প্রেসক্রিপশন ছাড়া স্টেরয়েড ও অ্যান্টিফাঙ্গাল বিক্রি বন্ধ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই পারে এই ক্রমবর্ধমান চর্মরোগ সংকট মোকাবিলা করতে।

সময়ের আলো/জেডআই




Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: