যাদের জীবনযুদ্ধের ছায়ায় ঘেরা

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

যুদ্ধ কখনোই কেবল দুই পক্ষের সামরিক সংঘর্ষ নয়। যুদ্ধ মানেই মানুষের জীবনে নেমে আসা এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়। এই বিপর্যয়ের

2026-01-06T05:13:08+00:00
2026-01-06T05:13:08+00:00
 
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
যাদের জীবনযুদ্ধের ছায়ায় ঘেরা
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:১৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
যুদ্ধ কখনোই কেবল দুই পক্ষের সামরিক সংঘর্ষ নয়। যুদ্ধ মানেই মানুষের জীবনে নেমে আসা এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয়। এই বিপর্যয়ের সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে গভীর শিকার হলো শিশুরা— বিশেষ করে তারা, যারা যুদ্ধের কারণে বাবা-মা হারিয়ে অনাথ হয়ে পড়ে। প্রতি বছর ৬ জানুয়ারি পালিত বিশ্বযুদ্ধ অনাথ দিবস আমাদের সেই বাস্তবতার দিকেই চোখ ফেরাতে বলে, যেটি আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যেতে চাই। এই দিবস কোনো উৎসব নয়, এটি এক ধরনের আত্মজিজ্ঞাসা। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত যারা নেয় না, যুদ্ধের অর্থ যারা বোঝে না, তারাই কেন যুদ্ধের সবচেয়ে ভারী মূল্য চুকায়— এই প্রশ্নই বিশ্বযুদ্ধ অনাথ দিবসের কেন্দ্রে। যুদ্ধ শেষ হলে রাষ্ট্রগুলো পুনর্গঠনের কথা বলে, কিন্তু যুদ্ধের পর যে শিশুরা একা হয়ে যায়, তাদের পুনর্গঠনের দায়িত্ব কে নেয়— এই প্রশ্নের উত্তর আজও অস্পষ্ট।

যুদ্ধ অনাথতা : নীরব এক মানবিক ট্র্যাজেডি : যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের নিচে শুধু ঘরবাড়ি চাপা পড়ে না, চাপা পড়ে অসংখ্য শিশুর শৈশব, স্বপ্ন আর নিরাপত্তাবোধ। গোলাগুলির শব্দ, বোমার বিস্ফোরণ, আতঙ্কে দৌড়ে পালানো আরেক দিন হঠাৎ করে বাবা-মায়ের অনুপস্থিতি— এই অভিজ্ঞতা একটি শিশুর মানসিক জগৎ চিরতরে বদলে দেয়। অনাথ হওয়া মানে শুধু পরিবার হারানো নয়, এর অর্থ হলো পরিচিত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। যারা গতকাল পর্যন্ত স্কুলে যেত, খেলত, স্বপ্ন দেখত— তারা হঠাৎ করেই পড়ে যায় নিরাপত্তাহীনতা, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার এক নিষ্ঠুর চক্রে। যুদ্ধ তাদের কাছ থেকে সময়ের আগেই শৈশব কেড়ে নেয়।

অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধ অনাথ শিশুরা শরণার্থী শিবিরে বড় হয়, যেখানে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুযোগ সীমিত। এসব শিশুর জীবনে ‘স্বাভাবিক’ বলে কিছু থাকে না। প্রতিটি দিনই তাদের জন্য টিকে থাকার সংগ্রাম।

২০২৪-২০২৫ : যুদ্ধের নতুন মানচিত্র : ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বৈশ্বিক বাস্তবতা এই সংকটকে আরও স্পষ্ট ও গভীর করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের গৃহযুদ্ধ এবং এশিয়ার সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে হাজার হাজার শিশু বাবা-মা হারিয়েছে। যুদ্ধের চরিত্র বদলালেও ভুক্তভোগীর তালিকা বদলায়নি— সেখানে শিশুরাই সবচেয়ে সামনে। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার যুদ্ধকে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত করেছে, কিন্তু মানবিক দিক থেকে তা আরও নিষ্ঠুর হয়েছে। একটি বোমা বিস্ফোরণ মুহূর্তের মধ্যে একটি শিশুর পুরো পৃথিবী ধ্বংস করে দেয়। প্রযুক্তির অগ্রগতি যেখানে মানুষের জীবন সহজ করার কথা, সেখানে যুদ্ধ প্রযুক্তি শিশুদের জীবন আরও অনিরাপদ করে তুলছে।

পরিসংখ্যানের আড়ালে থাকা মানুষগুলো : পরিসংখ্যান আমাদের সমস্যা বুঝতে সাহায্য করে, কিন্তু অনুভব করাতে পারে না। প্রতিটি যুদ্ধ অনাথ শিশু আসলে একটি আলাদা গল্প, একটি থেমে যাওয়া শৈশব, একটি ভাঙা পরিবার, একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। বাবা-মায়ের স্নেহহীন এই শিশুরা অনেক সময় শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ে, শিশুশ্রমে জড়িয়ে যায় কিংবা অপরাধ ও সহিংসতার ঝুঁকিতে পড়ে। কিছু অঞ্চলে যুদ্ধ অনাথ শিশুরা মানব পাচার, জোরপূর্বক শ্রম কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যুক্ত হওয়ার শিকার হয়। তখন তারা কেবল ভুক্তভোগী নয়, বরং যুদ্ধেরই একটি অংশে পরিণত হয়, যা মানবসভ্যতার জন্য চরম লজ্জার।

আন্তর্জাতিক উদ্যোগ : যুদ্ধ অনাথ শিশুদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সংগঠনগুলো কাজ করছে— এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিক্ষা, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক পুনর্বাসনে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, আন্তর্জাতিক দাতা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।

তবে বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ চলমান থাকলে এসব উদ্যোগ অনেক সময়ই পর্যাপ্ত হয় না। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে অনেক শিশু সহায়তার বাইরে থেকে যায়। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোই অনেক ক্ষেত্রে যুদ্ধের আরেকটি কঠিন লড়াই হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে প্রশ্ন উঠতেই পারে— বিশ্ব কি সত্যিই শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, নাকি তা কেবল আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আর সম্মেলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?

যুদ্ধ, রাষ্ট্র এবং নৈতিক দায়িত্ব : একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার সামরিক সক্ষমতায় নয়, বরং সে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারে, তার মধ্যেই নিহিত। যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শিশুদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মৌলিক দাবি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, যুদ্ধের সময় শিশু সুরক্ষা প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। সামরিক কৌশল, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও ক্ষমতার রাজনীতির ভিড়ে শিশুদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে যায়।

বাংলাদেশ ও আমাদের দায়িত্ব : বাংলাদেশ সরাসরি কোনো আন্তর্জাতিক যুদ্ধে জড়িত না হলেও বিশ্বযুদ্ধ অনাথ দিবস আমাদের জন্যও গভীর তাৎপর্য বহন করে। আমরা একদিকে শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণকারী দেশ, অন্যদিকে মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সমাজ। এই অবস্থান থেকে আমাদের দায়িত্ব শুধু আন্তর্জাতিক মঞ্চে শান্তির কথা বলা নয়, বাস্তব মানবিক উদ্যোগে অংশ নেওয়াও। একই সঙ্গে আমাদের দেশেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য ও সামাজিক সহিংসতায় অনাথ হওয়া শিশুর সংখ্যা কম নয়।

দিবসের তাৎপর্য : অনুভূতি থেকে দায়িত্বে : বিশ্বযুদ্ধ অনাথ দিবস আমাদের সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে। আমরা কি যুদ্ধকে শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক প্রেক্ষাপটে দেখি, নাকি মানবিক পরিণতির কথাও গুরুত্ব দিয়ে ভাবি? শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় আমাদের ভূমিকা কি কেবল সহানুভূতিতে সীমাবদ্ধ, নাকি তা কার্যকর দায়িত্বে রূপ নিচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে যুদ্ধবিরোধী শান্তি উদ্যোগ জোরদার করতে হবে, যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের শিক্ষা ও মানসিক পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াতে হবে, গণমাধ্যমকে শিশুদের মানবিক গল্প আরও দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, শিশুদের আর কখনো যুদ্ধের ‘পার্শ্বক্ষতি’ হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না।

বিশ্বযুদ্ধ অনাথ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধ শেষ হলেও তার ক্ষত বহন করে শিশুরা। তারা কোনো যুদ্ধ শুরু করেনি, কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি, তবু তারাই সবচেয়ে বেশি হারায়। একটি সভ্য বিশ্বের পরিচয় এখানেই— আমরা কতটা আন্তরিকভাবে এই শিশুদের পাশে দাঁড়াতে পারি। যুদ্ধের ছায়ায় বড় হওয়া প্রতিটি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ, মানবিক ও আশাবাদী ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই হোক বিশ্বযুদ্ধ অনাথ দিবসের প্রকৃত অঙ্গীকার।

লেখক ও প্রবন্ধকার

এফআর


  বিষয়:   সম্পাদকীয়  যাদের জীবনযুদ্ধ  ছায়ায় ঘেরা 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: