ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ। দুদেশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে বন্ধুত্বপূর্ণ। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক দিন ধরে এই সম্পর্কের ফাটল ধরেছে। এর অন্যতম কারণ ভারতের আধিপত্যবাদ। আর এই আধিপত্যবাদের সুবাদে সীমান্তে ভারতীয় আগ্রাসন চলছে। যা দুদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। তাতে ভারত সরকার সামান্যতম কর্ণপাত করেনি। এটা যে দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভালো ফল বয়ে আনছে না, তা তাদের অনুধাবন করতে হবে। প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে আশপাশের দেশগুলোর সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না।
মূলত এ সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যাওয়ার জন্য ভারতের প্রতিবেশীসুলভ বৈরী আচরণ দায়ী বলে অধিকাংশ দেশ মনে করে।
২০২৫ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও ভারতের নাগরিকদের হাতে বাংলাদেশিদের হত্যার সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে, যদিও সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ভারত। যা উদ্বেগের বিষয়।
মানবাধিকার সংস্থা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি আমাদের দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ন্যায্যবিচার দাবি করছে। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ভূমিকা রয়েছে; তা ভারতের অস্বীকার করার জো নেই।
২০২৫ সালে এই বাহিনীর হাতে কমপক্ষে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে গুলিতে ২৪ জন এবং নির্যাতনে ১০ জন মারা গেছে। এই সংখ্যা পূর্বের বছরের তুলনায় বেশিই। এর সঙ্গে আরও অন্তত ৩৮ জন আহত ও ১৪ জন অপহরণ হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুধু একটি মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর এক ধরনের আঘাত।
দৈনিক সময়ের আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়— পাঁচ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে সীমান্তে সর্বোচ্চ হত্যাকাণ্ড। ২০২০ সালে ৫১ জন, ২০১৫ সালে ৪৩ জন, ২০১৯ সালে ৪২ জন নিহত হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে নির্বিচার গুলি, নির্যাতন, অপহরণ ও হত্যা। এতে বোঝা যায়, বিএসএফের অমানবিকতা সীমান্তে ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু করতে হবে এবং জড়িতদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতেও যেতে হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পরিস্থিতি শুধু একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, এটি আমাদের দেশের স্বাধিকার ও সার্বভৌমত্বের জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। ভারতের সীমান্তে নির্বিচার গুলির ঘটনা বন্ধ করতে হলে আন্তর্জাতিক আইন মানতে
বাধ্য করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের নেতৃত্বকে কঠোর হতে হবে। সীমান্তে হত্যা বন্ধে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিষয়টি তুলে ধরতে হবে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি সীমান্তের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই বৈরী সম্পর্কের অবসান না হলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। ভারতের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু। সে প্রেক্ষিতে সীমান্তে বিনা উসকাানিতে নির্বিচারে সাধারণ বাংলাদেশিকে হত্যা বন্ধ করতে হবে। প্রায় সময় বিজিবি আর বিএসএফ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করে। আবার কখনো কখনো পতাকা বৈঠকও হয়। কিন্তু এর ফলাফল কী তা জানার আগ্রহ সবার।
যেহেতু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যথেষ্ট টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; যখন আলোচনা হবে তখন প্রতিটি বিষয়ে চুলচেরা আলোচনা করা হবে। সেখান থেকে ভালো কোনো সমাধান আসতে পারে। সীমান্তের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার একসঙ্গে সমাধান করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন আন্তঃদেশীয় শান্তিপূর্ণ সমঝোতা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার প্রয়োজন। না হলে এই হত্যাকাণ্ডের দুঃখজনক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে, আর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক আরও অবনতি হবে। আমাদের প্রত্যাশা, দ্রুতই এই অন্ধকার থেকে আলো আসবে, আর সীমান্তে শান্তি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
এফআর