কথায় আছে ক্রিকেট ভদ্রলোকদের খেলা কিন্তু সেই ভদ্রলোকদের খেলায় যখন রাজনীতি, বিদ্বেষ আর পরিচয়ের প্রশ্ন ঢুকে পড়ে, তখন ক্রিকেট আর কেবল খেলাই থাকে না। ক্রিকেট বহুদিন ধরেই কূটনীতি, সীমান্ত আর রাজনৈতিক উত্তেজনার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষে মানুষে সেতুবন্ধ তৈরি করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই ঐতিহ্য প্রশ্নের মুখে পড়ছে। খেলাধুলার মাঠে জাতীয়তা, ধর্ম কিংবা রাজনৈতিক চাপ যখন সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে, তখন খেলাটির আত্মাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগ থেকে বাংলাদেশি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে হঠাৎ করে বাদ দেওয়ার ঘটনা এই বাস্তবতারই উদাহরণ।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের এই সিদ্ধান্ত খেলাধুলার বিবেচনায় নয়, বরং উগ্র রাজনৈতিক চাপের প্রতিফলন বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা প্রশমনের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। অথচ এবার সেই খেলাকেই রাজনৈতিক বার্তার বাহন বানানো হলো। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিক। কারণ এই সিদ্ধান্ত কেবল একজন খেলোয়াড়কে নয়, একটি দেশকেই অপমান করার শামিল। খেলাধুলার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হলে তার প্রতিক্রিয়া মাঠের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে। বিশেষ করে আসন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোর প্রেক্ষাপটে এই শঙ্কা আরও গভীর হয়েছে। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু আয়োজক দেশের দায়িত্ব নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার নৈতিক অঙ্গীকার। এ বাস্তবতায় আসন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য জাতীয় দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্তকে অনেকেই যৌক্তিক বলেই মনে করছেন। এটি আবেগের নয়, বরং ও সম্মানের প্রশ্ন।
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে মোস্তাফিজুর রহমান বিশ্বের সেরা বোলারদের তালিকায় শীর্ষস্থানীয়দের একজন। এই মৌসুমে তিনি একমাত্র বাংলাদেশি খেলোয়াড় হিসেবে সম্পূর্ণ যোগ্যতার ভিত্তিতেই নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার অপসারণ তাই কেবল একটি ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি বার্তা বহন করে। সেই বার্তাটি হলো, এখানে যোগ্যতা নয়, পরিচয়ই মুখ্য হয়ে উঠছে। এই বার্তা ক্রীড়াঙ্গনের জন্য ভয়াবহ।
একজন পেশাদার খেলোয়াড়ের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক ন্যায্যতা লঙ্ঘিত হলে তা শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে ক্ষতি করে না, বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক এমনিতেই নানা সংবেদনশীলতায় ঘেরা। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সীমান্ত পরিস্থিতির মধ্যে এ ঘটনা নতুন করে অবিশ্বাসের দেয়াল উঁচু করতে পারে। খেলাধুলার মাধ্যমে যেখানে সম্পর্ক সহজ হওয়ার কথা, সেখানে উল্টো বিভাজন তৈরি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে ভারতের কিছু গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচার। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে অতিরঞ্জিত ও একপক্ষীয় চিত্র তুলে ধরে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে একজন বাংলাদেশি খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জনমনে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যে স্বাভাবিক সৌহার্দ ছিল, তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেও ক্রিকেট বরাবরই দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যে এই লিগের জনপ্রিয়তা ব্যাপক। বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষ নিয়মিত এই টুর্নামেন্ট অনুসরণ করে। রাজনৈতিক বিবেচনায় খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করলে সেই ভালোবাসা ও বিশ্বাস ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে।
বাংলাদেশ এখন ক্রিকেটে আর কোনো দুর্বল দেশ নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে অন্যতম পরাশক্তি। ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশ যখন বাংলাদেশের সেরা পারফর্মারকে রাজনৈতিক কারণে সরিয়ে দেয়, তখন তা আইসিসির অন্য উদীয়মান সদস্য দেশগুলোর কাছে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা পাঠায়। এটি পরোক্ষভাবে এই ধারণাই প্রতিষ্ঠিত করে যে, বড় বোর্ডগুলো চাইলেই ছোট বা মাঝারি মানের বোর্ডগুলোর খেলোয়াড়দের ওপর যখন-তখন খড়গহস্ত হতে পারে। এই ‘বিগ ব্রাদার’ সুলভ আচরণ ক্রিকেটের বিশ্বায়নের পথে একটি বড় অন্তরায়। বৈশ্বিক ক্রিকেটে সমমর্যাদা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় না থাকলে ক্রিকেট কেবল গুটিকয়েক প্রভাবশালী দেশের সম্পত্তিতে পরিণত হবে। বিশ্বব্যাপী ক্রীড়া প্ল্যাটফর্ম হিসেবে এই লিগের যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবমূর্তি ছিল, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। খেলাধুলা তখন আর সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে না, বরং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর খেলোয়াড়রাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারেন। ক্রীড়ার এই রাজনীতিকরণ আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার নৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে।
বর্তমান যুগে খেলার মাঠের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় লড়াই অনেক সময় বেশি ভয়াবহ রূপ নেয়। মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর দুই দেশের নেটিজেনদের মধ্যে যে বাকযুদ্ধ ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উগ্র জাতীয়তাবাদ এবং ফেক নিউজের মাধ্যমে যে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে, তা সরাসরি দুই দেশের সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলছে। এই বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়াটা কেবল ক্রিকেটের জন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। খেলাধুলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল মানুষকে এক করা, অথচ ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এখন বিভাজনের কারখানায় পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) মূলনীতি হলো ক্রিকেটে কোনো ধরনের বৈষম্য বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাশত না করা। তবে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে যখন এমন ঘটনা ঘটে, তখন আইসিসির নীরবতা তাদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। যদিও লিগগুলো ঘরোয়া বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়, তবু আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ এখানে আইসিসির নিয়ম-কানুনকেই প্রতিফলিত করে। যদি কোনো লিগ নির্দিষ্ট জাতীয়তা বা রাজনৈতিক কারণে খেলোয়াড়দের বঞ্চিত করে, তবে বৈশ্বিক অভিভাবক হিসেবে আইসিসির উচিত সেখানে হস্তক্ষেপ করা। নচেৎ ফুটবল বা অন্যান্য বৈশ্বিক খেলার মতো ক্রিকেটে কখনোই একটি সর্বজনীন এবং বৈষম্যহীন পেশাদার কাঠামো গড়ে উঠবে না।
এই কারণেই ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের উচিত ছিল বিষয়টি আরও সংবেদনশীলভাবে বিবেচনা করা। একটি সিদ্ধান্ত শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, বরং কোটি দর্শকের আবেগ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ক্রীড়ার মর্যাদার সঙ্গে জড়িত। ভুল সিদ্ধান্ত কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনে, যা পরে সংশোধন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভারতের ভেতর থেকেই এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা উঠেছে। বর্তমান ও সাবেক ক্রিকেটার, এমনকি সংসদ সদস্যরাও এই পদক্ষেপকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন। তারা খেলাধুলার অযৌক্তিক রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। এই অভ্যন্তরীণ সমালোচনা প্রমাণ করে যে বিষয়টি কেবল বাংলাদেশি দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, ক্রীড়ার সর্বজনীন মূল্যবোধের প্রশ্ন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা ও লিগ পরিচালনা কমিটির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার
সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ন্যায্যতা ও সমতার প্রশ্নে নীরব থাকা যায় না। এসব সংস্থার দায়িত্ব শুধু টুর্নামেন্ট আয়োজন নয়, বরং খেলোয়াড়দের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করাও।
আজকের শিশুরা যখন দেখে তাদের প্রিয় আইকনরা কেবল মাঠের বাইরে থাকা শক্তির কারণে অপদস্থ হচ্ছেন, তখন তারা খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। আমরা নতুন প্রজন্মকে শেখাতে চাই যে পরিশ্রম এবং মেধা থাকলে যে কেউ সফল হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত তাদের শেখায় যে, যোগ্যতার চেয়েও বড় হলো ক্ষমতা আর পরিচয়। এই শিক্ষাটি একটি সুস্থ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের পরিপন্থী। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি পরিষ্কার এবং স্বচ্ছ ক্রীড়া জগৎ রেখে যাওয়া নৈতিক দায়িত্ব। মুস্তাফিজের ঘটনাটি যদি সংশোধন না করা হয়, তবে তরুণরা খেলার মাঠের চেয়ে নোংরা রাজনীতির মারপ্যাঁচকেই বড় করে দেখতে শিখবে।
দুই দেশ যখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, তখন ক্রিকেট হতে পারে একটি সাধারণ ক্ষেত্র, যেখানে উত্তেজনার বদলে সংলাপ তৈরি হয়। খেলাধুলা প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেখায়, শত্রুতা নয়। এই সত্য ভুলে গেলে ক্রীড়া তার মানবিক শক্তি হারায়। ক্রিকেট যদি বিভাজনের হাতিয়ার হয়, তা হলে তার ঐতিহাসিক ভূমিকা ব্যর্থ হয়ে যাবে।
মোস্তাফিজুর রহমানের বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা কেবল একজন খেলোয়াড়ের প্রতি ন্যায়বিচারই হবে না, বরং একটি বড় বার্তা দেবে। সেই বার্তা হবে এই যে, খেলাধুলা এখনও রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে। ক্রিকেট ভদ্রলোকদের খেলা হিসেবেই টিকে থাকুক, ক্ষমতার প্রদর্শনী নয়। নচেৎ আমরা এমন এক সময়ে পৌঁছাব, যেখানে মাঠে খেলা হবে বল আর ব্যাটে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ থাকবে রাজনীতির হাতে।
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
সময়ের আলো/এনএ