শান্তি শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সংঘাতহীন এক পৃথিবী, যেখানে মানুষের অধিকার আর নিরাপত্তা থাকবে অটুট। কিন্তু বিংশ শতাব্দী পেরিয়ে একবিংশ শতাব্দীর এই ২০২৬ সালে এসে ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার’ শব্দটি অনেক ক্ষেত্রেই আশার বদলে এক অজানা আতঙ্ক আর অশান্তির অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখনই তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে হঠাৎ করে কোনো ব্যক্তিকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয় তখনই সে দেশের সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে- তবে কি এবার আমাদের শান্তিতে অশান্তির আগুন জ্বলতে যাচ্ছে? ভেনেজুয়েলার মারিয়া করিনা মাচাদোকে যখন নোবেল দেওয়া হলো বিশ্ববাসী তখনই আন্দাজ করেছিল যে ভেনেজুয়েলার আকাশে দুর্যোগের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। মার্কিন অভিযান এবং প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সস্ত্রীক বন্দি করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা সেই আশঙ্কারই চূড়ান্ত রূপ। যখন একজন নোবেলজয়ী নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হতে দেখে প্রতিবাদ না করে উল্টো অপহরণকারীকে তার নোবেল পুরস্কারের ভাগিদার করতে চান বলে উল্লাসে মেতে ওঠেন।
ইতিহাসে এমন বেশ কিছু নোবেল শান্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পুরস্কার বিজয়ী আছেন, যাদের কর্মকাণ্ড বা সিদ্ধান্ত পরবর্তীকালে যুদ্ধ, সহিংসতা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে চরমভাবে বিতর্কিত হয়েছে। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিতর্কিতদের সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত বিতর্কিত অসংখ্য ব্যক্তির মধ্যেকার দেশভিত্তিক এমন কয়েকজন ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো-
মোট শান্তি পুরস্কারের প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ কোনো না কোনো সময় সমালোচনা বা বিতর্কের মুখে পড়েছে। অনেকে আবার এমন হাস্যকর বিষয়ে নোবেল পেয়েছেন যে, ওই কাজ দিয়ে অশান্তি ব্যতীত অন্য কিছু আনা যায় না। এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করলে বিতর্কের সংখ্যাটি ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।
আবি আহমেদ (ইথিওপিয়া) : আবি আহমেদ ২০১৯ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী। পুরস্কার পাওয়ার মাত্র এক বছরের মাথায় ২০২০ সালে তিনি টাইগ্রে অঞ্চলে সামরিক অভিযান শুরু করেন। এই যুদ্ধের ফলে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এবং চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক মহল তার এই ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে।
মেনাখেম বেগিন ও আইজ্যাক রবিন (ইসরাইল) : বেগিন ১৯৭৮ সালের এবং রবিন ১৯৯৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী। মেনাখেম ও বেগিন শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পরও লেবাননে আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হেনরি কিসিঞ্জার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) : হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী। ভিয়েতনাম যুদ্ধ অবসানে ভূমিকার জন্য তাকে পুরস্কৃত করা হলেও তিনি কম্বোডিয়ায় গোপন বোমা হামলা এবং চিলিতে অভ্যুত্থানে মদদ দেওয়ার মতো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত।
এলেন জনসন সারলিফ (লাইবেরিয়া) : ২০১১ সালের শান্তি পুরস্কার বিজয়ী, যিনি ‘নারীদের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য অহিংস সংগ্রামে’ অবদানের জন্য পুরস্কৃত হলেও তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী চার্লস টেইলরের সঙ্গে সম্পর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগ ছিল।
বারাক ওবামা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) : ২০০৯ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই পুরস্কার পাওয়ায় অনেকেই অবাক হয়েছিলেন এবং তার সময় আফগানিস্তানে যুদ্ধ বেড়েছিল।
তৃতীয় বিশ্বে নোবেলজয়ীদের মাধ্যমে অশান্তি সৃষ্টির সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে আছেন মিয়ানমারের অং সান সু চি। শান্তিতে নোবেল পাওয়া এই নেত্রী যখন ক্ষমতায় এলেন, তখন বিশ্ব আশা করেছিল সেখানে শান্তির সুবাতাস বইবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। তার আমলেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য গণহত্যা ও নির্যাতন চালানো হলো। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সু চি এই নির্মম নির্যাতনের নিন্দা তো জানাননি, বরং আন্তর্জাতিক আদালতে সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। বাংলাদেশ যখন ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তখন সু চি একজন ‘শান্তিজয়ী’ হয়েও একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নেননি।
একজন নোবেলজয়ী যখন ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে জাতিগত নিধনকে মৌন সমর্থন দেন, তখন সেই নোবেল পুরস্কারই কলঙ্কিত হয়। নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে সু চির এই ভূমিকা একটি বড় বিতর্ক ও কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
অনেক ক্ষেত্রে আঞ্চলিক রাজনীতিতে নোবেল বিজয়ীদের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফলে পূর্ব আফ্রিকায় অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। শান্তি নোবেল পুরস্কারের বিড়ম্বনা ও বিশ্বব্যাপী এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে আমার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো- সাদা পায়রাগুলো আজ রক্তাক্ত ডানা জাপটে কাঁদছে, কারণ শান্তির নামে দেওয়া পদকগুলো এখন বারুদের গন্ধ ছড়ায়।
বিচারকের মঞ্চ থেকে ঘোষিত ‘শান্তি’ শব্দটা যখন সীমান্তে বুলেটে বিদ্ধ হয়, তখন মানবতা মুখ লুকিয়ে অন্ধকারে ডুকরে কাঁদে। পুরস্কারের মঞ্চে যখন মিথ্যে হাসির ঝিলিক ওঠে, ওদিকে কামানের গোলার আঘাতে এক মায়ের কোল খালি হয়ে যায় চিরতরে। অহিংসার মুখোশ পরে যারা এই সম্মান কুড়িয়ে নেন, তাদের কূটনীতির বিষবাষ্পে আজ বিশ্বের আকাশ কালো হয়ে গেছে।
ডিনামাইট আবিষ্কারকের রেখে যাওয়া সম্পদ দিয়ে আজ মানুষের রক্ত বেচাকেনার উৎসব চলছে বিশ্বজুড়ে। পৃথিবীটা আজ এক বিশাল শ্মশান, যেখানে শান্তির সাদা পতাকাগুলো মিথ্যে সম্মানের বিষাক্ত ধোঁয়ায় প্রতিনিয়ত পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্তরা কেন প্রায়শই ‘অশান্তির বরপুত্র’ হিসেবে পরিচিত হন, তার পেছনে গভীর ভূরাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করে। বিশ্লেষকদের মতে, নোবেল কমিটি অনেক সময় নিরপেক্ষতার পরিবর্তে পশ্চিমা বিশেষ রাজনৈতিক এজেন্ডাকে প্রাধান্য দেয়। যখন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা কোনো পরাশক্তির স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তখন সেখানে একজন ‘আইকন’ তৈরি করা হয়। সেই আইকনকে নোবেল দিয়ে এমন এক উচ্চতায় নেওয়া হয় যে, তিনি আন্তর্জাতিকভাবে এক ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হন। পরবর্তীতে সেই ব্যক্তির মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট দেশে বিশৃঙ্খলা বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে মাচাদোর ভূমিকা ঠিক তেমনি এক স্ক্রিপ্টের অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। একটি দেশের সরকারপ্রধান অপরাধী হলে তার বিচার সেই দেশের মাটিতে হওয়াটাই সার্বভৌমত্বের পরিচায়ক। কিন্তু ভিনদেশি সামরিক বাহিনী এসে প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাবে আর একজন নোবেলজয়ী তাকে ‘স্বাধীনতা’ বলে আখ্যা দেবেন- এটি দেশপ্রেমের চরম অবমাননা।
নোবেলজয়ীরা কেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে পশ্চিমের অনুগত বা ‘দালাল’ হিসেবে পরিচিত হন, তার কারণ লুকিয়ে আছে তাদের রাজনৈতিক উত্থানে। বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, অধিকাংশ শান্তিজয়ী তাদের দেশপ্রেমের চেয়ে পশ্চিমা দর্শন এবং তাদের দেওয়া প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নে বেশি আগ্রহী থাকেন। মাচাদো যখন ভেনেজুয়েলার এই চরম অপমানকে অভিনন্দন জানান, তখন প্রমাণিত হয় যে তার কাছে ক্ষমতার গদি দেশের সার্বভৌমত্বের চেয়ে বড়। এ ধরনের দেশপ্রেমহীনতা নোবেল পুরস্কারের মহিমাকেই ধূলিসাৎ করে দেয়। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক কখনোই বিদেশি হস্তক্ষেপকে সমর্থন করতে পারেন না, এমনকি তা যদি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পতনের কারণও।
কেন নোবেলজয়ীরা পরবর্তীতে রাজনীতিতে জড়িয়ে নিজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করেন? বিশ্লেষকরা মনে করেন, নোবেল পুরস্কার তাদের জন্য এক ধরনের ‘রাজনৈতিক লাইসেন্স’ হিসেবে কাজ করে। এই পদক ব্যবহারের মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং অর্থায়ন নিশ্চিত করেন। পশ্চিমা বিশ্ব অত্যন্ত সুকৌশলে এই ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
সব নোবেলজয়ীই যে বিতর্কিত, তা হয়তো নয়। তবে গত কয়েক দশকে শান্তি পুরস্কারের রাজনৈতিক ব্যবহার এতই বেড়েছে যে, এর মূল উদ্দেশ্য আজ প্রশ্নবিদ্ধ। লিবিয়া, সিরিয়া বা ইউক্রেনের দিকে তাকালে দেখা যায়, যেখানেই পশ্চিমা সমর্থিত ‘শান্তির আন্দোলন’ হয়েছে, সেখানেই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ আর ধ্বংস নেমে এসেছে। ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি সেই একই পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছে কি না তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
শান্তি কোনো পুরস্কারের চাকচিক্যে আসে না, শান্তি আসে মানুষের অধিকার রক্ষা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অটুট রাখার মাধ্যমে। ভেনেজুয়েলার আকাশে আজ যে কালো মেঘ জমেছে, তা কেবল একটি দেশের সংকট নয়, বরং তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য এক অশনিসংকেত। মাচাদোর মতো ‘শান্তিদূত’রা যখন বিদেশি শক্তির সহায়তায় নিজের দেশে ক্ষমতার স্বপ্ন দেখেন, তখন বুঝতে হবে শান্তি এখনও অনেক দূরে। নোবেল শান্তি পুরস্কার যদি রক্তপাত আর বিদেশি হস্তক্ষেপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে বিশ্ববাসীর কাছে এই পদকের গুরুত্ব মøান হয়ে যাবে। আমাদের প্রত্যাশা- শান্তি পুরস্কার যেন অশান্তির বীজ বপন না করে, বরং মানুষের প্রকৃত মুক্তি ও দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে ওঠে। অন্যথায় ইতিহাসের পাতায় এই শান্তিজয়ীরা ‘অশান্তির নায়ক’ হিসেবেই ঘৃণিত হবেন। মানবতার চেয়ে ক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং একটি জাতির অস্তিত্ব অস্বীকার করা যেকোনো নোবেলজয়ীর জন্য চরম নৈতিক পরাজয়।
সময়ের আলো/এনএ