বাংলাদেশের
আর্থসামাজিক বাস্তবতায় রেমিট্যান্স কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, এটি লাখ
লাখ পরিবারের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার অবলম্বন। গ্রামের ঘরে আলো জ্বলে,
সন্তানের পড়াশোনা চলে, অসুস্থ বাবা-মা চিকিৎসা পান- সবকিছুর নেপথ্যে এই
অর্থপ্রবাহ কাজ করে। রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ও অনেকাংশে এই আয়ের ওপর
নির্ভরশীল। অথচ রেমিট্যান্স নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি জটিল
সামাজিক বৈপরীত্য উপেক্ষা করি। কে নিয়মিত অর্থ পাঠায়, আর কে পাঠায় না এই
প্রশ্নের উত্তর শুধু আয়ের পরিমাণে নয়, লুকিয়ে আছে জীবনদর্শন, দায়বদ্ধতা ও
শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্কের ভেতরে। এই বৈপরীত্য বোঝা না গেলে নীতিনির্ধারণের
আলোচনাও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
দেশের ভেতরের শ্রম অভিবাসন এই
বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে কাজ করা
রিকশাচালক, দিনমজুর, হোটেলকর্মী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের সামান্য
আয়ের মধ্য থেকেও গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠান। শহর তাদের কাছে কাজের জায়গা,
কিন্তু গ্রামই পরিচয় ও আশ্রয়। তারা জানেন, গ্রামের ঘরে খাবার জুটলে তবেই
তাদের শ্রমের অর্থ সার্থক। মাসে দুই হাজার বা তিন হাজার টাকা বড় অঙ্ক নয়,
কিন্তু এই অর্থ নিয়মিত পৌঁছায়। এই ধারাবাহিকতা গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে
রাখে এবং প্রমাণ করে, রেমিট্যান্সের শক্তি শুধু অঙ্কে নয়, নির্ভরযোগ্যতায়।
এই
অভ্যন্তরীণ রেমিট্যান্সপ্রবাহ গ্রাম ও শহরের মধ্যে এক নীরব সেতুবন্ধ তৈরি
করেছে। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ পরিবারগুলো এই অর্থ দিয়ে খাদ্য কেনে, চিকিৎসা
করায়, ঋণ শোধ করে। শহরের নিম্ন আয়ের শ্রমিকরা নিজেরা কষ্টে থাকলেও পরিবারকে
অনাহারে রাখতে চায় না। তাদের কাছে পাঠানো টাকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে
আত্মসম্মান ও দায়িত্ববোধ। এই শ্রেণির মানুষ রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে খুব কম
আলোচনায় আসে, অথচ বাস্তবে তারাই অর্থনীতির নীরব চালিকাশক্তি। তারা কোনো
প্রণোদনার অপেক্ষায় থাকে না, তাদের একমাত্র প্রণোদনা পরিবারের টিকে থাকা।
অন্যদিকে
শহরের মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ব্যাংক,
করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত অনেক বেতনভুক্ত কর্মচারী
নিয়মিতভাবে গ্রামে অর্থ পাঠায় না। তাদের জীবন শহরকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে।
সন্তানের শিক্ষা, বাসস্থান, যানবাহন ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে তারা গ্রামে
জমি বিক্রি বা পৈতৃক সম্পদ নগদায়নের দিকে ঝোঁকে। ফলে অর্থের প্রবাহ গ্রাম
থেকে শহরের দিকে যায়। গ্রাম তাদের জন্য আর আশ্রয় নয়, বরং সম্পদের উৎস। এই
প্রবণতা গ্রামীণ অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে তোলে।
এই
বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের আচরণে। মধ্যপ্রাচ্য ও
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কর্মরত অদক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রমিকরা সীমিত আয় সত্ত্বেও
নিয়মিত অর্থ পাঠান। বিদেশের কঠিন শ্রম, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তা তারা মেনে নেন
শুধু পরিবারের জন্য। দুই হাজার পঁচিশ সালে প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, মোট
রেমিট্যান্সপ্রবাহের বড় অংশ এখনও এই শ্রেণির শ্রমিকের কাছ থেকেই আসে। তাদের
পাঠানো অর্থ ছোট ছোট অঙ্কে হলেও ধারাবাহিক এবং নির্ভরযোগ্য, যা বৈদেশিক
মুদ্রা সঞ্চয়ের ভিত্তি শক্ত করে।
অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ
প্রবাসীদের মধ্যে ভিন্ন প্রবণতা দেখা যায়। অনেকেই পরিবার নিয়ে বিদেশে
স্থায়ী জীবন গড়ে তোলেন। দেশে নিয়মিত অর্থ পাঠানোর বদলে তারা পৈতৃক সম্পদ
বিক্রি করে বা সঞ্চয় তুলে নিয়ে যান। এই অর্থ অনেক সময় অনানুষ্ঠানিক পথে
লেনদেন হয়। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়। অনেক
ক্ষেত্রে যাদের আয় বেশি তাদের অবদান অনিয়মিত, আর যাদের আয় কম তারাই মূল
ভরসা।
এই দ্বৈত আচরণ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে এক অদ্ভুত
ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করেছে। নিম্ন আয়ের শ্রমিকরা বৈদেশিক মুদ্রার জোগান
ধরে রাখছেন, আর তুলনামূলক উচ্চ আয়ের একটি অংশ সেই ব্যবস্থার ওপর পরোক্ষ চাপ
তৈরি করছে। দুই হাজার পঁচিশ সালে ছায়া বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের চাহিদা
বাড়ার পেছনে এই আচরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার প্রতি আস্থার ঘাটতি মানুষকে বিকল্প পথে ঠেলে দিচ্ছে।
রেমিট্যান্সপ্রবাহের
একটি অনুচ্চারিত দিক হলো এর গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব। যারা নিয়মিত
বাড়িতে টাকা পাঠান, তাদের অবচেতনে একটি অস্তিত্বের সার্থকতা কাজ করে। একজন
প্রবাসী বা শহরের শ্রমিক যখন নিজের ভোগের চেয়ে পরিবারের প্রয়োজনকে
প্রাধান্য দেন, তখন তার মধ্যে এক ধরনের আত্মিক প্রশান্তি তৈরি হয়। এটি তাকে
কঠিন শ্রমের মধ্যেও ধৈর্য ধরার শক্তি দেয়। পক্ষান্তরে যারা সচ্ছল হয়েও
শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তাদের জীবনে এক ধরনের আত্মপরিচয়হীনতা বা
আইডেন্টিটি ক্রাইসিস তৈরি হয়। এই মানসিক সংযোগই আসলে বাংলাদেশের অর্থনীতির
অদৃশ্য প্রাণশক্তি, যা কোনো গাণিতিক ফর্মুলা দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।
প্রযুক্তির
বিবর্তন রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়াকে সহজ করলেও এর পেছনে এক ধরনের
যান্ত্রিকতা নিয়ে এসেছে। আগে মানিঅর্ডারের জন্য অপেক্ষার যে আবেগ ছিল, এখন
ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং বা অ্যাপের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর ফলে তা কিছুটা ফিকে
হয়ে গেছে। তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রসারের ফলে অনানুষ্ঠানিক বা হুন্ডি
ব্যবসার ঝুঁকি বেড়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষ অনেক সময় প্রযুক্তির জটিলতায় পড়ে
দালালের শরণাপন্ন হয়, যা তাদের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে।
রাষ্ট্রকে যদি রেমিট্যান্সপ্রবাহ স্থিতিশীল রাখতে হয়, তবে প্রযুক্তির এই
সহজলভ্যতাকে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে এবং তাদের ডিজিটাল
সাক্ষরতা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে এই পার্থক্যগুলোকে
গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কেবল দক্ষক্ষ জনশক্তি তৈরি করলেই রেমিট্যান্স বাড়বে
এই ধারণা অসম্পূর্ণ। বরং অর্থ পাঠানোর প্রণোদনা, নিরাপদ চ্যানেল ও সামাজিক
স্বীকৃতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেসব দেশে প্রবাসীদের
জন্য স্বচ্ছ ও আস্থাভাজন ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেশি
স্থিতিশীল।
রেমিট্যান্সের ব্যবহারের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর
একটি বিশাল অংশ ব্যয় হয় অনুৎপাদনশীল খাতে, যেমন : বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ
বা ভোগবাদী জীবনযাপনে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই অর্থের প্রবাহ যদি ক্ষুদ্র
শিল্প বা কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে বিনিয়োগ হিসেবে আসত, তবে গ্রামগুলো
একেকটি ছোট অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হতো। বর্তমানে রেমিট্যান্সের ওপর
নির্ভরশীল পরিবারগুলোর মধ্যে এক ধরনের কর্মবিমুখতা তৈরি হচ্ছে, যা
দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উৎপাদনশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই অলস অর্থকে ক্ষুদ্র ও
মাঝারি ব্যবসায় রূপান্তর করার জন্য বিশেষায়িত ঋণ প্রকল্প এবং প্রশিক্ষণ
প্রদান করা প্রয়োজন।
গ্রামের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পুনর্গঠন না করা
গেলে এই বৈপরীত্য আরও গভীর হবে। শহর ও বিদেশে থাকা উচ্চ আয়ের শ্রেণিকে যদি
গ্রামীণ উন্নয়নের অংশীদার করা যায়, তবে অর্থের প্রবাহের দিক বদলাতে পারে।
শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকেও এটি জরুরি। গ্রামকে কেবল
সম্পদ বিক্রির জায়গা হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে।
নারী
প্রবাসীদের অবদান বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়।
গৃহকর্মী বা গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কর্মরত নারীরা তাদের আয়ের
প্রায় পুরোটাই দেশে পাঠান। তাদের এই ত্যাগ কেবল পরিবারের সচ্ছলতা আনে না,
বরং গ্রামীণ সমাজে নারীর ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করে। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ
কর্মীদের তুলনায় নারীকর্মীরা অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি নিয়মিত এবং
দায়িত্বশীল। অথচ এই নারীরা ফিরে আসার পর প্রায়ই সামাজিক নিগ্রহ বা অবজ্ঞার
শিকার হন। তাদের সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্জিত অর্থের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা
নিশ্চিত করা গেলে রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ আরও শক্তিশালী ও টেকসই হতে পারে।
অন্যদিকে
অশিক্ষিত শ্রমিকরা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সমৃদ্ধ করছেন।
উচ্চশিক্ষিতদের এই নির্লিপ্ততা কাটাতে হলে তাদের জন্য দেশে বিনিয়োগের
পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং দেশের উন্নয়নের সঙ্গে তাদের সংযুক্ত করার বিশেষ
প্রোগ্রাম গ্রহণ করতে হবে। মেধা পাচার ঠেকিয়ে সেই মেধাকে দেশের অর্থনৈতিক
কাঠামোতে যুক্ত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। রেমিট্যান্সের প্রকৃত অবদানকারীদের
স্বীকৃতি দেওয়াও জরুরি। যেসব শ্রমিক নীরবে বছরের পর বছর অর্থ পাঠিয়ে
যাচ্ছেন, তাদের ভূমিকা রাষ্ট্রের ভাষ্যে আরও জোরালোভাবে আসা উচিত। এতে
সামাজিক বার্তা যাবে যে, নিয়মিত অবদান সম্মানের বিষয়। এই স্বীকৃতি ভবিষ্যৎ
প্রজন্মের আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা
ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ভবিষ্যতে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে যদি এই
আচরণগত বৈপরীত্য অব্যাহত থাকে। কম আয়কারীরা দিতে থাকবে, আর বেশি আয়কারীরা
নেবে এই চক্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ। ভারসাম্য
ফেরাতে হলে নীতিনির্ধারণে বাস্তব আচরণকে কেন্দ্রে আনতে হবে।
বিশ্ব
অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কেবল শ্রম রফতানির সংখ্যায় নির্ধারিত হবে
না, নির্ধারিত হবে আস্থা ও ন্যায়বোধের মাধ্যমে। রেমিট্যান্সের ভবিষ্যৎ
নির্ভর করছে সেই মানুষগুলোর ওপর, যারা কম আয়েও দায়িত্ব ভুলে যায় না।
রাষ্ট্র যদি তাদের পাশে দাঁড়ায় এবং ব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত করে, তবে এই
জীবনরেখা আরও শক্তিশালী হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
সময়ের আলো/এসকে/