পাকিস্তান কেন বাংলাদেশসহ অন্য দেশে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রি করছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

পাকিস্তান সম্প্রতি দেশীয়ভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিদেশে বিক্রির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিমানটি প্রদর্শনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান আরও

2026-01-09T21:53:01+00:00
2026-01-09T21:58:05+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
আন্তর্জাতিক
পাকিস্তান কেন বাংলাদেশসহ অন্য দেশে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রি করছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:৫৩ পিএম  আপডেট: ০৯.০১.২০২৬ ৯:৫৮ পিএম
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই এয়ারশোতে প্রদর্শনীতে রাখা পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একটি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান। সংগৃহীত ছবি
পাকিস্তান সম্প্রতি দেশীয়ভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান বিদেশে বিক্রির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিমানটি প্রদর্শনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করছে। পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধান জহির আহমেদ বাবর সিধু বাংলাদেশের বিমান বাহিনী প্রধান মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকের পর পাকিস্তান নিশ্চিত করেছে যে জেএফ-১৭ থান্ডারের সম্ভাব্য ক্রয়ের বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হলো নৌবহর আধুনিকীকরণ এবং বিমান নজরদারি বাড়ানোর জন্য এয়ার ডিফেন্স রাডার সিস্টেম উন্নত করা।

জেএফ-১৭ বিমানটি প্রথমবার আন্তর্জাতিকভাবে প্রদর্শিত হয় দুবাই এয়ার শোতে ১৯ নভেম্বর, ২০২৫-এ। পাকিস্তান ছাড়াও আজারবাইজান, তুর্কি, ইরান, ইরাকসহ ১০টিরও বেশি দেশ ইতোমধ্যেই এই বিমান ব্যবহার করছে, মূলত পাইলট প্রশিক্ষণের জন্য। এছাড়াও, পাকিস্তান লিবিয়ার স্বঘোষিত লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ)-এর সঙ্গে ৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে পৌঁছেছে, যার মধ্যে এক ডজনেরও বেশি জেএফ-১৭ বিক্রির প্রস্তাব রয়েছে। পাকিস্তান এবং সৌদি আরবও প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণকে জেএফ-১৭ চুক্তিতে রূপান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। 

জেএফ-১৭ থান্ডার হলো হালকা ওজনের, একক ইঞ্জিনযুক্ত, দুই থেকে তিন আসনের যুদ্ধবিমান। এটি মূলত প্রশিক্ষণ এবং হালকা আক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হয়। বিমানটির তুলনামূলকভাবে কম দাম-প্রায় ২৫–৩০ মিলিয়ন ডলার-এবং উচ্চ কার্যক্ষমতা অনেক দেশের আগ্রহের মূল কারণ। পাকিস্তানের বিমান বাহিনীর সাবেক এয়ার কমোডোর আদিল সুলতান বলেছেন, জেএফ-১৭  থান্ডার পশ্চিমা ও রাশিয়ার ব্যয়বহুল বিমানগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে উচ্চ পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেছে, এখন এটি যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক দেশের জন্য আকর্ষণীয় বিকল্প। 

২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে চারদিনের সাংঘর্ষিক বিমানযুদ্ধের পর জেএফ-১৭ থান্ডারের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। পাকিস্তান দাবি করেছে যে এই যুদ্ধে তাদের বিমান বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। এই সংঘাত পাকিস্তান-ভারতের আকাশসীমায় সামরিক সক্ষমতার নজির প্রদর্শন করেছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জেএফ-১৭-এর চাহিদা বাড়িয়েছে। 

অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত কারণে পাকিস্তান বিদেশে জেএফ-১৭ বিক্রি করতে আগ্রহী। এটি শুধু অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, একই সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে সাহায্য করছে। এর ফলে বাংলাদেশ, সৌদি আরব, লিবিয়া এবং অন্যান্য দেশ এই বিমানটি ক্রয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। 

জেএফ‑১৭ থান্ডার কী?

জেএফ‑১৭ থান্ডার একটি হালকা ওজনের, সব আবহাওয়ায় যুদ্ধ করতে সক্ষম, মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান। এটি যৌথভাবে নির্মাণ করেছে পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (পিএসি) এবং চীনের চেংডু এয়ারক্রাফ্ট কর্পোরেশন (সিএসি)। মূলত পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পুরনো যুদ্ধবিমান বহর প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যেই এই বিমানটির নকশা ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। 

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে পাকিস্তান ও চীন জেএফ‑১৭ উন্নতকরণের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এরপর ২০০০-এর দশকের শুরুতে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের কামরায়, রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত পিএসিতে বিমানটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডরের ভাষ্য অনুযায়ী, জেএফ‑১৭ উৎপাদনের কাজ দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ কাজ পাকিস্তানে এবং ৪২ শতাংশ চীনে সম্পন্ন হয়। পাকিস্তান সামনের ফিউজলেজ ও উল্লম্ব লেজ তৈরি করে, আর চীন বিমানের মাঝের ও পেছনের অংশ নির্মাণ করে। বিমানটিতে রাশিয়ার তৈরি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে এবং ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান মার্টিন বেকারের ইজেকশন সিট সংযোজন করা হয়েছে। তবে পুরো বিমানের চূড়ান্ত অ্যাসেম্বলি সম্পন্ন হয় পাকিস্তানেই।

জেএফ‑১৭ প্রথমবারের মতো মার্চ ২০০৭ সালে জনসমক্ষে আনা হয়। ২০০৯ সালে এর প্রথম সংস্করণ ব্লক‑১ পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীতে উন্নত সংস্করণগুলো আসতে থাকে এবং সবচেয়ে আধুনিক ব্লক‑৩ ভেরিয়েন্ট ২০২০ সালে বিমানবাহিনীতে প্রবেশ করে।

এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের পুরোনো যুদ্ধবিমান-বিশেষ করে ফরাসি নির্মাতা ডাসল্টের মিরাজ‑৩ ও মিরাজ‑৫ এবং চীনা জে‑৭ বিমানের পরিবর্তে একটি আধুনিক ও তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী বিকল্প তৈরি করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে জেএফ‑১৭ পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান যুদ্ধবিমান বহরের ভিত্তি গড়ে তুলবে, যেখানে ১৫০টিরও বেশি বিমান অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রযুক্তিগতভাবে, জেএফ‑১৭ ব্লক‑৩ ভেরিয়েন্টকে ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে রয়েছে আধুনিক এয়ার‑টু‑এয়ার এবং এয়ার‑টু‑সারফেস যুদ্ধ সক্ষমতা, উন্নত এভিওনিক্স, অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (এইএসএ) রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম এবং দৃশ্যসীমার বাইরে (বিভিআর) লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ক্ষমতা।

এই এভিওনিক ও ইলেকট্রনিক সক্ষমতাগুলো মার্কিন এফ‑১৬ বা রুশ এসইউ‑২৭–এর মতো চতুর্থ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের তুলনায় উন্নত, এ বিমানগুলো মূলত কাছের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করতে সক্ষম।  ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে রাডারের কারণে জেএফ‑১৭ একই সঙ্গে একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও ট্র্যাক করতে পারে এবং দীর্ঘ দূরত্বে নজরদারির সুবিধা দেয়। তবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের মতো এতে পূর্ণাঙ্গ স্টিলথ প্রযুক্তি নেই। 

পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মতে, জেএফ‑১৭ মাঝারি ও নিম্ন উচ্চতায় অত্যন্ত ভালো যোগ্যতা প্রদর্শন করে। আগ্নেয়াস্ত্র বহনের ক্ষমতা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া, আধুনিক সেন্সর ও আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থার সমন্বয়ে এটি যে কোনো বিমান বাহিনীর জন্য একটি শক্তিশালী ও কার্যকর যুদ্ধ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

৬ জানুয়ারি ইসলামাবাদে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান (বামে) পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; এ সময় জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সম্ভাবনাও আলোচনা হয়। সংগৃহীত ছবি

৬ জানুয়ারি ইসলামাবাদে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান (বামে) পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জহির আহমেদ বাবর সিধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; এ সময় জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সম্ভাবনাও আলোচনা হয়। সংগৃহীত ছবি


কে কে জেএফ‑১৭ থান্ডার কিনেছে?

এ পর্যন্ত সীমিত সংখ্যক দেশই জেএফ‑১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কিনেছে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রতি আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। মিয়ানমার ছিল জেএফ‑১৭ ক্রয়কারী প্রথম দেশ। ২০১৫ সালে দেশটি কমপক্ষে ১৬টি ব্লক‑২ ভেরিয়েন্টের জেএফ‑১৭ অর্ডার দেয়। এখন পর্যন্ত এর মধ্যে সাতটি বিমান মিয়ানমারকে সরবরাহ করা হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে জেএফ‑১৭ প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের বাইরে বিদেশি বিমান বাহিনীর বহরে যুক্ত হয়।

এরপর নাইজেরিয়া জেএফ‑১৭-এর দ্বিতীয় ক্রেতা হয়। ২০২১ সালে নাইজেরিয়ার বিমান বাহিনী তাদের বহরে তিনটি জেএফ‑১৭ যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত করে। আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে নাইজেরিয়া এই বিমানের প্রথম ব্যবহারকারী।

আজারবাইজান সর্বশেষ এবং তৃতীয় বিদেশি ক্রেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। দেশটি ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে ১৬টি জেএফ‑১৭ জেটের একটি প্রাথমিক অর্ডার দেয়, যার মোট মূল্য ছিল ১.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। পরবর্তীতে, নভেম্বর ২০২৫‑এ আজারবাইজান তাদের বিজয় দিবসের সামরিক কুচকাওয়াজে পাঁচটি জেএফ‑১৭ উন্মোচন করে, যা দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জেএফ‑১৭-এর তৃতীয় বিদেশি অপারেটর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

নভেম্বর ২০২৫‑এই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঘোষণা দেয় যে তারা জেএফ‑১৭ সংগ্রহের জন্য বন্ধু দেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে। তবে সেই বন্ধু দেশের নাম প্রকাশ করেনি। পাকিস্তান এই চুক্তিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে।

এছাড়া, ইরাক, শ্রীলঙ্কা এবং সৌদি আরবসহ আরও কয়েকটি দেশ গত এক দশকে জেএফ‑১৭ কেনার সম্ভাবনা বিবেচনা করেছে। তবে এসব আলোচনা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নেয়নি।

যদিও জেএফ‑১৭ পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ফাইটিং স্কোয়াড্রনের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে, চীনা বিমান বাহিনী এই বিমানটি ব্যবহার করে না। চীন মূলত নিজেদের তৈরি উন্নত যুদ্ধবিমান—যেমন জে‑১০, জে‑২০ এবং সর্বশেষ জে‑৩৫এর ওপরই বেশি নির্ভর করছে।

জেএফ‑১৭ যুদ্ধবিমানের সম্পূর্ণ অ্যাসেম্বলি পাকিস্তানের কামরায় সম্পন্ন হওয়ায়, এর রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং বিক্রয়োত্তর সেবার প্রধান দায়িত্বও পাকিস্তানের হাতেই রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জেএফ‑১৭-এর মূল বিক্রেতা ও সরবরাহকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানই কাজ করছে। 

জেএফ‑১৭ অন্যান্য যুদ্ধবিমানের সঙ্গে কীভাবে তুলনীয়?

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমানগুলো হলো পঞ্চম প্রজন্মের ফাইটার জেট। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এফ‑২২ র‍্যাপ্টর ও এফ‑৩৫, চীনের জে‑২০ ও জে‑৩৫, এবং রাশিয়ার এসইউ‑৫৭। এই বিমানগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো স্টিলথ প্রযুক্তি, যা তাদের শত্রু রাডারের কাছে কার্যত অদৃশ্য করে তোলে। এ ধরনের বিমানগুলো অস্ত্র বহন করে অভ্যন্তরীণ অস্ত্রকক্ষে এবং বিশেষ নকশা ও উপকরণের কারণে রাডার তরঙ্গ প্রতিফলিত হয় না বা খুব কম হয়।

এর বিপরীতে, জেএফ‑১৭ থান্ডারের ব্লক‑৩ ভ্যারিয়েন্টটি ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের শ্রেণিভুক্ত। এই একই শ্রেণিতে রয়েছে সুইডেনের গ্রিপেন, ফ্রান্সের রাফাল, ইউরোপের ইউরোফাইটার টাইফুন, ভারতের তেজস, এবং চীনের জে‑১০।

যদিও ৪.৫ প্রজন্মের বিমানগুলোর পূর্ণাঙ্গ স্টিলথ ক্ষমতা নেই, তবে এগুলোতে রাডার স্বাক্ষর কমানোর জন্য বিশেষ আবরণ ও নকশা ব্যবহার করা হয়। এর ফলে এগুলো শত্রু রাডারে ধরা পড়া কিছুটা কঠিন হয়, যদিও পুরোপুরি অদৃশ্য থাকে না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যখন একটি ৪.৫ প্রজন্মের জেট শত্রুপক্ষের রাডার অঞ্চলে প্রবেশ করে, তখন সেটি শনাক্ত হতে পারে। তবে বিমানটি তার ইলেকট্রনিক জ্যামিং ক্ষমতা ব্যবহার করে শত্রু রাডারের সংকেত ব্যাহত করতে পারে, অথবা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে দীর্ঘ-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (বিভিআর মিসাইল) নিক্ষেপ করে আঘাত হানতে পারে এবং দ্রুত সরে যেতে পারে।

অন্যদিকে, একটি পঞ্চম প্রজন্মের বিমান তার নকশা ও অস্ত্র সংরক্ষণের পদ্ধতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই রাডারের কাছে কার্যত অদৃশ্য থাকে, যা তাকে বড় কৌশলগত সুবিধা দেয়। 

মূল্য বিবেচনায় জেএফ‑১৭ স্পষ্টভাবেই প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী। যদিও আনুষ্ঠানিক দাম প্রকাশ করা হয়নি, বিভিন্ন বিশ্লেষণে জেএফ‑১৭-এর প্রতি ইউনিট মূল্য ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার হিসেবে ধরা হয়। তুলনামূলকভাবে, ফরাসি রাফাল বিমানের দাম ৯০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি, আর সুইডিশ গ্রিপেনের দাম ১০০ মিলিয়ন ডলারের ওপরে।

ইসলামাবাদভিত্তিক এক আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, জেএফ‑১৭-এর মূল আকর্ষণ এর ব্যয়-কার্যকারিতা, কম রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন এবং বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, জেএফ‑১৭-এর শক্তি শুধুমাত্র সর্বোচ্চ পারফরম্যান্সে নয়, বরং পুরো প্যাকেজে-যার মধ্যে রয়েছে কম দাম, বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র সংহত করার সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা এবং তুলনামূলকভাবে কম পশ্চিমা রাজনৈতিক শর্ত।

তার মতে, জেএফ‑১৭ ‘যথেষ্ট ভালো’ মাল্টি-রোল যুদ্ধবিমান, যা সীমিত বাজেটে থাকা বিমান বাহিনীগুলোর আধুনিকায়নের জন্য উপযোগী। তবে এটি চীনের জে‑১০সি বা মার্কিন এফ‑১৬ভি–এর মতো উচ্চমানের যুদ্ধবিমানের সরাসরি বিকল্প নয়। পেলোড বহন ক্ষমতা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থার পরিপক্বতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আপগ্রেডের সুযোগের ক্ষেত্রে জেএফ‑১৭ কিছুটা পিছিয়ে।

এয়ার ইউনিভার্সিটি, ইসলামাবাদের অ্যারোস্পেস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ অনুষদের ডিন সুলতান বলেন, ২০২৫ সালে ভারতীয় যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে জেএফ‑১৭-এর পারফরম্যান্স এই বিমানের সক্ষমতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আধুনিক বিমানযুদ্ধে সাফল্য শুধু বিমানের ওপর নির্ভর করে না। 

তার ভাষায়, যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বিমানের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ব্যবস্থা-যেমন স্থল ও আকাশভিত্তিক রাডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি পাইলটদের প্রশিক্ষণ ও মানব দক্ষতা।

জেএফ‑১৭ থান্ডারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কেন?

২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে চার দিনের তীব্র সংঘর্ষে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর (পিএএফ) ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় আসে। বিশেষ করে ৭ মে রাতে, যখন ভারতীয় যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়, তখন পিএএফের প্রতিক্রিয়া ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করে। 

পিএএফ দাবি করে, চীনা তৈরি জে‑১০সি যুদ্ধবিমান পরিচালনাকারী পাকিস্তানি স্কোয়াড্রনগুলো অন্তত ছয়টি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করেছে। যদিও ভারত শুরুতে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা অস্বীকার করে, পরে দেশটির কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে কয়েকটি বিমান ভূপাতিত হয়েছে। এই সংঘর্ষের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একাধিকবার পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের পারফরম্যান্সের কথা উল্লেখ করেন, যদিও ভারত এসব মন্তব্য জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে।  

যদিও সরাসরি বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় জেএফ‑১৭ থান্ডারের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, পাকিস্তান বিমান বাহিনী জানিয়েছে যে জেএফ‑১৭ ভারতীয় বিমানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অপারেশনাল ফরমেশনের অংশ ছিল। অর্থাৎ, বিমানটি সক্রিয়ভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।

এরপর ১০ মে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মিডিয়া উইং আইএসপিআর দাবি করে যে একটি জেএফ‑১৭ ব্যবহার করে ভারতের রাশিয়ান তৈরি এস‑৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। ভারত এই দাবি অস্বীকার করে এবং জানায় যে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কোনো ক্ষতি হয়নি। তবুও, এই দাবি জেএফ‑১৭কে ঘিরে আন্তর্জাতিক কৌতূহল আরও বাড়িয়ে তোলে।

ইসলামাবাদভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এই সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে জেএফ‑১৭কে যুদ্ধ-প্রমাণিত, সাশ্রয়ী ও কার্যকর যুদ্ধবিমান হিসেবে বাজারজাত করছে, বিশেষ করে যেসব দেশের প্রতিরক্ষা বাজেট সীমিত। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, বিভিন্ন দেশের আগ্রহ প্রকাশ মানেই যে দ্রুত চুক্তি হবে, তা নয়।

একজন বিশ্লেষক বলেন, যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত সাধারণত বহু বছর ধরে চলা আলোচনার ফল। আগ্রহ প্রকাশ থেকে শুরু করে চুক্তি স্বাক্ষর এবং শেষ পর্যন্ত বিমান সরবরাহ-এই পুরো প্রক্রিয়াতেই দীর্ঘ সময় লাগে। তিনি আরও যোগ করেন, জেএফ‑১৭ বিক্রিকে ঋণ পরিশোধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা পাকিস্তান বিমান বাহিনীর মূল কৌশল নয়, যদিও এমন আলোচনা সামনে আসছে।

অন্যান্য পর্যবেক্ষকরাও মনে করেন, ইসলামাবাদ এখন নিজেকে একটি উদীয়মান মধ্যম শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে এবং প্রতিরক্ষা রফতানি বাড়াতে তার বিমান বাহিনীর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে। 

জেএফ‑১৭ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত একজন অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডোর বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় মানদণ্ড। তার ভাষায়, বিশ্বে খুব কম দেশই যুদ্ধবিমান তৈরি করে। বাজারের বড় অংশ পশ্চিমা নির্মাতাদের দখলে, যারা প্রায়ই বিক্রির সঙ্গে রাজনৈতিক ও কৌশলগত শর্ত জুড়ে দেয়। অনেক দেশই এখন বৈচিত্র্য আনতে চায়, একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়-আর সেখানেই পাকিস্তানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেছে। তার মতে, জেএফ‑১৭ থান্ডারের মতো চুক্তি কেবল বিমান কেনা নয়, বরং এটি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার প্রতিফলন।

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিমান হলো ৩০ থেকে ৪০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশ যদি জেএফ‑১৭ বা সুপার মুশশাক প্রশিক্ষণ বিমান সংগ্রহ করে, তবে তা প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিক্রয়োত্তর সেবাসহ দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের সূচনা হবে। একই সঙ্গে চীনা জে‑১০‑এর প্রতিও বাংলাদেশের আগ্রহ দেখায় যে ভবিষ্যতে তারা কোন কৌশলগত অংশীদারদের সঙ্গে এগোতে চায়, সে বিষয়ে একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। 


/ইউএমএইচ


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: