গ্রামীণ অর্থনীতি বদলাচ্ছে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প

এসএম আলমগীর

দেশে অনেক শিল্পায়ন হয়েছে, তবু এখনও দেশের অর্থনীতির প্রাণ কৃষি। প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের ৪৫

2026-01-10T03:05:41+00:00
2026-01-10T03:05:41+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
গ্রামীণ অর্থনীতি বদলাচ্ছে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:০৫ এএম 
সংগৃহীত ছবি
দেশে অনেক শিল্পায়ন হয়েছে, তবু এখনও দেশের অর্থনীতির প্রাণ কৃষি। প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের ৪৫ শতাংশের বেশি কৃষি খাতে। দিনে দিনে জিডিপিতে সেবা ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান বাড়ার কারণে কৃষির অবদানের হার কমলেও জিডিপিতে মোট অবদান এখনও বাড়ছে। স্বাধীনতার পর সাড়ে ৭ কোটি জনগণের খাদ্য জোগানে ঘাটতি ছিল ২৫-৩০ লাখ টন। অথচ বর্তমানে ১৮ কোটি জনগণের খাদ্য জোগানে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি বাংলাদেশ। কৃষিতে এখন আধুনিকায়নের ছোঁয়া লেগেছে, একই সঙ্গে কৃষিপণ্যেরও বহুমুখী ব্যবহার বেড়েছে। বিশেষ করে কৃষিকে ঘিরে দেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে বিগত কয়েক বছরে। এই কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প একদিকে যেমন বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিকেও বদলে দিচ্ছে।

বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হিসেবেও কৃষি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ১১.৩৮ শতাংশ অবদান রাখছে। শ্রমশক্তি জরিপ (২০২২) অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মরত জনসংখ্যার প্রায় ৪৫.৪ শতাংশ কৃষি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। এই প্রেক্ষাপটে কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশের ফলে কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন হচ্ছে এবং একটি বিস্তৃত সাপ্লাই চেইন গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হচ্ছে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, গ্রামীণ এলাকায় শিল্প ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটছে। এই শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষ কর্মসংস্থানে যুক্ত। খাত সংশ্লিষ্ট এবং অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সংকটগুলো যদি দূর করা যায় এবং সরকার যদি এ খাতকে আরও গুরুত্ব দেয় তা হলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রফতানি বাণিজ্যেও অনেক বড় অবদান রাখতে পারবে শিল্পটি।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশের কৃষি প্রক্রিয়াকরণ খাত জিডিপি, রফতানি এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানে অবদান রাখে। এর কৌশলগত গুরুত্বের পরও এটি সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে মূল্য সংযোজনসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে। এ খাতের রফতানি বাড়ছে। দেশে বর্তমানে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেটজাত খাবারের বাজার রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাত ছয় বিলিয়নে উন্নীত হতে পারে। তবে রফতানির প্রায় ৬০ শতাংশের গন্তব্য বিশ্বের মাত্র পাঁচটি দেশে। পাশাপাশি মোট রফতানির অর্ধেকই পাঁচ ধরনের পণ্য। রফতানির নতুন বাজার অনুসন্ধান ও বিশ্বে দেশি পণ্যের ব্র্যান্ডিং করা দরকার। তা হলে এই খাত অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রফতানি বাণিজ্যে অনেক বড় অবদান রাখতে পারবে।

কৃষি প্রক্রিয়াকরণ খাত ও গ্রামীণ অর্থনীতি : বাংলাদেশের কৃষির অগ্রগতির ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, দেশের দারিদ্র্য নিরসনে কৃষি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এফএওর বার্ষিক খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৫৪ বছরে দেশের প্রধান শস্য উৎপাদন চার থেকে পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০২১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে সম্প্রতি বিশ্বের কৃষিপণ্য উৎপাদনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ ২২টি কৃষিপণ্য উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে চাল, মসুর ডাল, আলু, পেঁয়াজ, চায়ের মতো পণ্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফল। গত এক দশকে কুমড়া, ফুলকপি ও সমজাতীয় সবজির মতো কিছু পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষ তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে। এসব ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পেরও বিকাশ ঘটছে।

তবে খাদ্যনিরাপত্তার জন্য শুধু উৎপাদন বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। উৎপাদিত খাদ্যকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত না করলে তার একটি বড় অংশ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এখানে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফসল কাটার পর থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর উৎপাদিত ফসলের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ অপচয় হয়, যার আর্থিক মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা। সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং এই অপচয়কে অনেকাংশে হ্রাস করতে সক্ষম। শাকসবজি ও ফলমূল থেকে জ্যাম, জেলি, জুস তৈরি, অথবা মাছ-মাংসের শুঁটকি ও প্যাকেটজাতকরণ এসব পদ্ধতি খাদ্যের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয়।

গ্রামীণ কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে 
কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান : যে কয়েকটি কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে তার মধ্যে অন্যতম শীর্ষ একটি হচ্ছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। মূলত গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রাণ গ্রুপ ২০০১ সালে বাংলাদেশে প্রথম চুক্তিভিত্তিক চাষ চালু করে। বর্তমানে রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, মেহেরপুর ও হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। চুক্তিভিত্তিক চাষের আওতায় প্রাণ গ্রুপ যে পণ্যগুলো সংগ্রহ করে তার মধ্যে রয়েছে আম, দুধ, টমেটো, সরিষা, ডাল, বাদাম, আনারস, কাসাভা, ভুট্টা, আলু, চিনিগুঁড়া চালসহ আরও বিভিন্ন ফসল। বর্তমানে প্রাণ গ্রুপের সঙ্গে এক লক্ষাধিক কৃষক সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন এবং তাদের জীবনমানের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটছে। কৃষি খাতের সহ-খাত হিসেবে মৎস্য ও ডেইরি খাত গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আধুনিক ডেইরি খামারের মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তারা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন।

এ বিষয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল সময়ের আলোকে বলেন, প্রাণ গ্রুপ শুরু থেকেই দেশের কৃষির উন্নয়নে কাজ করছে। বর্তমানে আমাদের প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বেশিরভাগ কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় এবং ১৪৮টি দেশে রফতানি হয়। প্রাণ গ্রুপের অধীনে বর্তমানে প্রায় ১৬ হাজার দুগ্ধ খামারি যুক্ত রয়েছেন, যারা স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন এবং নতুন প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ তৈরি করছেন।

তিনি বলেন, প্রাণ গ্রুপের অন্যতম কৌশল হলো গ্রামীণ জনপদে উৎপাদন কারখানা স্থাপন। বর্তমানে সারা দেশে ৪০টির বেশি স্থানে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের স্থাপনা রয়েছে। এসব স্থাপনায় লক্ষাধিক কর্মীর প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। পরিবহন, সরবরাহ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাতের বিকাশ ঘটেছে এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের ওলিপুরে অবস্থিত প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গ্রামীণ শিল্পায়নের একটি সফল উদাহরণ। ২০১৩ সালে যেখানে জমি ছিল নিচু ও অনুর্বর এবং কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ বিদেশমুখী ছিল, সেখানে প্রাণ গ্রুপের গ্রুপের বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে আধুনিক শিল্পনগরী, ৩০ হাজারের অধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আবাসন, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার ঘটেছে এবং পুরো এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তর হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশ গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণ গ্রুপ কনট্রাক্ট ফার্মিং, ডেইরি ও মৎস্য খাতের উন্নয়ন এবং গ্রামীণ এলাকায় শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে। প্রাণের মতো কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগ দেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জাগরণকে আরও বেগবান করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

এএডি/


  বিষয়:   গ্রামীণ  অর্থনীতি  কৃষি  শিল্প 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: