দীর্ঘস্থায়ী সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয় বলে মত দিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) নেতারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি ঘোষণার পর গতকাল সোমবার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এ অভিমত জানান সংগঠনটির নেতারা।
ডিসিসিআইর নেতারা গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখার সিদ্ধান্তে দেশের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা অত্যন্ত হতাশ হয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়কালে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করা হলেও, বাস্তব পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর মুদ্রানীতির প্রয়োগ সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ডিসিসিআইর পক্ষ থেকে বলা হয়, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহ ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসে ডিসেম্বর ২০২৫ এ ৬ দশমিক ১ শতাশ হয়েছে। অস্বাভাবিক উচ্চ সুদের হার এবং ঋণের অতিরিক্ত ব্যয় শিল্প সম্প্র্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে কার্যত স্থূল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ব্রড-মানির প্রবৃদ্ধি জুন ২০২৫-এ ৭ শতাংশ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫-এ ৯ দশমিক ৬ শতাংশ উন্নীত হওয়া স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে অর্থনীতিতে মুদ্রা সম্প্র্রসারণ ঘটছে, যা চলমান কঠোর মুদ্রানীতির কার্যকারিতা ও নীতিগত সামঞ্জস্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়। এ ছাড়া, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি নেমে ২০২৫ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ এসেছে যা ২০২৩ অর্থবছরে ছিল ২৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। এ ধরনের অকার্যকর মুদ্রানীতির মাধ্যমে যেকোনো দেশের পক্ষে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন বাস্তবসম্মত নয়।
ডিসিসিআইর নেতারা বলেন, রফতানি খাতেও এই নীতির নেতিবাচক প্রভাব বেশ স্পষ্ট। গত ৬ মাসে আমরা দেখতে পাচ্ছি, রফতানি ধারাবাহিকভাবে কমে ডিসেম্বর ২০২৫-এ (-১৪.২৫ শতাংশে) এসে দাঁড়িয়েছে, যা বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দুর্বল করে তুলছে, যা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগজনক।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অতিমাত্রায় কঠোর ও দীর্ঘায়িত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। আমরা আগামীতে নির্বাচিত সরকারের কাছে নীতিহার কমানোসহ একটি বাস্তবভিত্তিক ও প্রবৃদ্ধিবান্ধব মুদ্রানীতি প্রত্যাশা করি, যেখানে রাজস্ব ও মুদ্রা ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ, নমনীয় তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি সুস্পষ্ট ভারসাম্য নিশ্চিত করা হবে।
গতকাল সোমবার নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি থেকে জুন) জন্য নতুন এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে তৃতীয় ও শেষ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ধসের ঝুঁকি থেকে সরে এসে এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকে এগোচ্ছে এবং নতুন প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমলেও তা এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ। এ অবস্থায় নীতি সুদহার আগেভাগে কমিয়ে আনা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।
বাংলাদেশ ব্যাংক যে সুদহারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়, সেটিই নীতি সুদহার। এই হার অপরিবর্তিত রাখার মূল কারণ হলো, আগের মুদ্রানীতিতে ২০২৬ অর্থবছরের জন্য যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা এখনও অর্জিত হয়নি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে টানা তৃতীয় মাসের মতো মূল্যস্ফীতি বেড়ে আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) গত রোববার প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে, যা এর আগে ডিসেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, নভেম্বরে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে ৮ দশমিক ১৭ শতাংশ।