আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে বেশি বেশি রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে এসেছে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ ৩৮ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। একক মাস হিসেবে এ অঙ্ক দেশে তৃতীয় সর্বোচ্চ। গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নির্বাচন ও রমজানকে কেন্দ্র করে পরিবারের বাড়তি খরচ মেটানো এবং দেশে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়ে প্রবাসীদের মধ্যে। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে চাঙ্গাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, ডিসেম্বর মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩২২ কোটি ডলার, যা একক মাস হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয় ৩২৯ কোটি ডলার ছিল গত বছরের মার্চে। তখন ঈদুল ফিতরের সময় প্রবাসীরা বেশি অর্থ পাঠিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫ সালে দেশের মোট প্রবাসী আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের প্রায় সমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে মাসভিত্তিক রেমিট্যান্স এসেছে জুলাইয়ে ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, আগস্টে ২৪২ কোটি ১৯ লাখ ডলার, সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ডলার, অক্টোবরে ২৫৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার, নভেম্বরে ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ডলার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে। ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থ পাচার কমে যাওয়ায় অবৈধ হুন্ডি ব্যবসাও কমেছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিনিময় হার কয়েক মাস ধরে স্থিতিশীল থাকার কারণে বৈধ পথে প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতিতে প্রবাহিত হচ্ছে।
এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত প্রবাসীরা মোট ১ হাজার ৯৪৪ কোটি ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। আগের অর্থবছরে একই সময় রেমিট্যান্স এসেছিল ১ হাজার ৫৯৬ কোটি মার্কিন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী রিজার্ভ এখন ২৮ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে জানুয়ারির এই রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজার, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ হাজার ১৭০ মিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই অঙ্ক ছিল ২ হাজার ১৮৫ মিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৪৫.১ শতাংশ।
বিশেষ করে মাসের শেষদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল উল্লেখযোগ্য। ২৯ থেকে ৩১ জানুয়ারি এই তিন দিনেই এসেছে ২২৯ মিলিয়ন ডলার, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ৭৬ মিলিয়ন ডলার। মাসের শেষ ভাগে এই উচ্চ প্রবাহ ব্যাংকিং চ্যানেলে আস্থার প্রতিফলন বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
অর্থবছরজুড়েই ঊর্ধ্বমুখী রেমিট্যান্স : শুধু মাসভিত্তিক নয়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও (জুলাই থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত) রেমিট্যান্স প্রবাহে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। এই সময়ে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১৯ বিলিয়ন ৪৩৬ মিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে (জুলাই ২০২৪-৩১ জানুয়ারি ২০২৫) এই অঙ্ক ছিল ১৫ বিলিয়ন ৯৬২ মিলিয়ন ডলার। ফলে অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১.৮ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি একটি উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক ধারা।
কেন বাড়ছে রেমিট্যান্স : বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কয়েকটি কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছেÑ ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলার দর তুলনামূলক বাস্তবসম্মত হওয়া, হুন্ডির ঝুঁকি ও ব্যয় বেড়ে যাওয়া, নগদ প্রণোদনা অব্যাহত থাকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে শ্রমবাজার স্থিতিশীল থাকা ও একই সঙ্গে নির্বাচনের প্রাক্কালে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কমাতে প্রবাসীরাও আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ছে : রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ কিছুটা কমছে, ব্যাংকগুলোর আমদানি দায় পরিশোধে স্বস্তি মিলছে এবং টাকার বিনিময় হারে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও চলতি হিসাবের ঘাটতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রেও রেমিট্যান্স বড় সহায়তা করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি যদি আগামী মাসগুলোতেও বজায় থাকে তা হলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড গড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই সঙ্গে প্রবাসী শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, দক্ষ কর্মী পাঠানো এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপর আস্থা আরও জোরদার করার দিকেও নজর দিতে হবে।
সময়ের আলো/এআর