কৃষিপ্রধান অর্থনীতির দেশ হলেও বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক সমাজ অনেক পিছিয়ে। অর্থনৈতিকভাবে অধিকাংশ কৃষকের মেরুদণ্ডই বেশ দুর্বল। অধিক জনসংখ্যার কারণে মাথাপিছু জমির পরিমাণও স্বল্প। আবার এক বিশাল অংশ কৃষিজীবী হলেও অনেকেই আবাদি জমিবঞ্চিত, অন্যের জমি বর্গা চাষ করেন।
বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটিরও বেশি। আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ১ লাখ ৯৮ হাজার একর। দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮০ ভাগ এবং শ্রমশক্তির ৬০ ভাগ কৃষিকাজে নিয়োজিত। মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ মাত্র ০.২৫ হেক্টর। দেশের দরিদ্র ও হতদরিদ্র দুই শ্রেণির মানুষের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় দেশে ভূমিহীনদের সংখ্যা ৯০ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪ জন। অর্থাৎ দেশের প্রায় ৯১ লাখ মানুষের নিজের কোনো জমি নেই। ২০১০ সালে ভূমিহীনদের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে এক যুগের ব্যবধানে ভূমিহীনদের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে। সরকারের নেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ফলে অনেক ভূমিহীন ভূমির মালিকানা লাভ করেছে। তারপরও বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী ৩ কোটি ১৭ লাখ ৫৮ হাজার ৬ জন মানুষের মধ্যে ২৫.৮ শতাংশের কোনো জমি নেই। সে হিসাবে ভূমিহীনদের সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ।
সেই পাকিস্তান আমলেও দেশের কৃষিজীবীদের এক ব্যাপক অংশ ঋণের ভারে জর্জরিত ছিল। ফলে অধিকাংশ কৃষককেই ফসল উৎপাদনে ব্যয় সংকুলানে অন্যের কাছ থেকে ঋণ করতে হতো। অতীতে কৃষিঋণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আর্থিক তেমন কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ব্যবসায়ী, গ্রাম্য মহাজন, গ্রাম্য ব্যবসায়ী, দোকানদার ও ধনী কৃষক বিশেষ করে অর্থলগ্নিকারী মহাজনদের কাছ থেকে অভাবী চাষিরা ঋণগ্রহণ করতেন। আর অর্থলগ্নিকারী মহাজনদের চড়া সুদ ঋণগ্রহীতা কৃষককে সর্বস্বান্ত করে দিত। মহাজনি ঋণের করালগ্রাসে দেশের অসংখ্য কৃষককে ভিটেমাটিহীন হতে হতো।
স্বাধীনতার পর প্রেসিডেন্ট অর্ডার নং ১৯৭৩-এর ২৭-এর মাধ্যমে ১৯৭৩ সালের ৩১ মার্চ বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হলেও এর অনেক আগে বিশ্বকবি ও জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলার প্রজাদের মহাজনি শোষণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ ও নওগাঁর পাতিসরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষিঋণ বিতরণ করেছেন। এ জন্য তিনি উনিশ শতকের শেষভাগে সর্বপ্রথম ১৮৮৪ সালে শিলাইদহে ‘কৃষি ব্যাংক’ স্থাপন করেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ সৃষ্টি করা। ১৯০৫ সালে তিনি পাতিসরেও অনুরূপ কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন যার নাম অনেক জায়গায় কালীগ্রাম কৃষি ব্যাংক বা সমবায় কৃষি ব্যাংক নামে উল্লেখ রয়েছে। ব্রিটিশ ভারতে বাংলাদেশ অঞ্চলে গৃহীত এই উদ্যোগ স্থায়িত্ব লাভ করেনি।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর অবাঙালি আইসিএস অফিসার ড. আখতার হামিদ খান সমবায়ভিত্তিক গ্রাম উন্নয়নের ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তার সেই মডেলকে কাজে লাগিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কুমিল্লায় চধশরংঃধহ অপধফবসু ভড়ৎ জঁৎধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ (চঅজউ) প্রতিষ্ঠা করেন যা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ইধহমষধফবংয অপধফবসু ভড়ৎ জঁৎধষ উবাবষড়ঢ়সবহঃ (ইঅজউ) নামে রূপান্তরিত হয়। কুমিল্লা মডেলের এই সমবায়ী ঋণব্যবস্থা জাতীয় পর্যায়ে কৃষি ও কৃষকদের উন্নতি সাধনে বেশ ভূমিকা রাখে। এক পর্যায়ে এই মডেল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি জেলাতেই গড়ে উঠতে থাকে। স্বাধীনতার পর এই সমিতি প্রতি থানা পরে উপজেলায় কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সমিতির মাধ্যমে বিভিন্ন আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন সেচ যন্ত্র, ট্রাক্টর ইত্যাদি প্রদান করা হয়। এসব সমবায় সমিতি সরকারের সমবায় মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধিত। এক পর্যায়ে এসব সমবায় সমিতিতে রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সমিতিগুলো মূল কার্যক্রম হারাতে থাকে।
স্বাধীনতা পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়। এই সংকটে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে কয়েক লাখ মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। এই সংকট কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে ৭৫-পরবর্তী শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের ১০০ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করার ব্যবস্থা নেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এই কৃষিঋণ প্রদানে কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতি হলেও দেশে খাদ্য উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি সরকারই দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং বৈশ্বিক কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহের উদ্যোগ গ্রহণ অব্যাহত রাখে। দেশ ও জাতির স্বার্থে কৃষিঋণের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি অর্থবছরেই কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়।
বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে যাদের গ্রামীণ শাখা অপ্রতুল, তারা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) কর্তৃক অনুমোদিত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের (এমএফআই) সঙ্গে পার্টনারশিপের (ব্যাংক-এমএফআই/এনজিও লিংকেজ) ভিত্তিতে কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে। এ পর্যায়ে দেশের প্রতিটি বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকই এনজিও/এমএফআই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ করছে। এই ব্যবস্থায় কৃষিঋণ আদায়ের হার শতাংশেরও বেশি। যা ব্যাংক কর্তৃক সরাসরি কৃষিঋণ বিতরণের চেয়ে অন্তত ৩০ শতাংশের বেশি।
উল্লেখ্য, এনজিও/এমএফআইরা স্বচ্ছতার সঙ্গে কৃষিঋণ বিতরণ করতে সক্ষমতার পরিচয় দিয়ে আসছে। কারণ এনজিও/এমএফআইদের কার্যক্রম যেহেতু প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে এসব কৃষি পরিবার ঘিরে সে ক্ষেত্রে এনজিও/এমএফআই কর্মীরা প্রকৃত কৃষককে শনাক্ত এবং তার চাহিদা নিরূপণ করেই ঋণ বিতরণ করে থাকে। একই সঙ্গে ঋণ প্রদানের পর যথাসময়ে তা আদায়ের লক্ষ্যেও নিবিড়ভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে যা ব্যাংক কর্মীদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
২০২২-২৩ অর্থবছরে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংক, ২টি বিশেষায়িত ব্যাংক, ৪০টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ৮টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক মোট ৩২৮২৯.৮৯ কোটি টাকা কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ করেছে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১০৬.৫৫ শতাংশ।
২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ৩৬,১৮৫৪৫ জন কৃষক কৃষি ও পল্লীঋণ পেয়েছেন যার মধ্যে ব্যাংকের নিজস্ব নেটওয়ার্ক ও এমএফআই লিংকেজের মাধ্যমে ১৮,৮১৯৩৩ জন নারী বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১২৭৫২.৪৬ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছেন। তবে ঋণ বিতরণ ও আদায়ের ক্ষেত্রে এমএফআই সেক্টরের ভূমিকা ব্যাপক। বিআরডিবি কর্তৃক ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৫৩৬.১৬ কোটি টাকা কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্র্যাক, আশা, ব্যুরো বাংলাদেশ, এসএসএস, টিএমএসএসসহ অনেক এমএফআই/এনজিও কৃষি খাতে নিজস্ব অর্থায়নও করছে।
বাংলাদেশ যেহেতু কৃষি অর্থনীতির দেশ সে ক্ষেত্রে কৃষির উন্নয়ন ছাড়া টেকসই অর্থনীতির চিন্তাই করা যায় না। তদুপরি দেশের আয়তনের তুলনায় অতিরিক্ত জনসংখ্যাও খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে মারাত্মক চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষ্যেই কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন এবং কৃষকদের ফসল উৎপাদনে সার্বিক সহায়তা প্রদানে প্রতিটি সরকারই বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করে আসছে। ১৯৭৪ সালে দেশে লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। সে সময়গুলোতে দেশে প্রচুর খাদ্য আমদানি করতে হতো এবং এই খাদ্য আমদানি ব্যয়েই দেশের বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হতো। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাদ্য আমদানি ব্যয় হ্রাস করার লক্ষ্যেই কৃষকদের পর্যাপ্ত কৃষিঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেন।
এতদসত্ত্বেও সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যখন ব্যাংকগুলোকে নির্ধারিত পরিমাণ কৃষিঋণ প্রদান বাধ্যতামূলক করে দিল তখন ব্যাংকগুলো বেশ বিপদের মধ্যেই পড়ে গিয়েছিল। তাদের চিন্তা ছিল গ্রাম পর্যায়ে এই ঋণ কীভাবে বিতরণ করবে এবং আদায়ই বা কীভাবে সম্ভব হবে? দেশের এনজিও/এমএফআই খাত তাদের সেই আশঙ্কা থেকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে চলেছে। তাদের নির্ধারিত কৃষি ও পল্লীঋণ এনজিও/এমএফআইগুলো সরাসরি প্রকৃত কৃষকদের কাছে বিতরণ করছে এবং যথাসময়ে প্রায় শতভাগ ঋণ আদায় করে ব্যাংকগুলোকে আশঙ্কামুক্ত রাখছে। ঋণ পেতে কৃষককে বিড়ম্বনা কিংবা দুর্নীতি, অনিয়মের সম্মুখীন হতে হচ্ছে না এবং অনেকটা ঘরে বসেই ঋণ পাচ্ছে। এ জন্য এমএফআই/এনজিওরা এখন কৃষকের বড় বন্ধু, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও কোনো ধরনের ব্যয় ও জনবল না খাটিয়েই কৃষিঋণ বিতরণ ও তা লাভসহ শতভাগ ফেরত পাচ্ছে এই এনজিও/এমএফআইদের কারণে। সুতরাং তাদের কাছেও এই খাত এখন বন্ধু। এভাবেই এনজিও/এমএফআইরা দেশের কৃষি খাতের বড় বন্ধু হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।
সার্বিক মূল্যায়নে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায়, প্রতিটি গ্রাম বাঁচলে যেমন দেশ বাঁচবে তেমনি প্রতিটি পরিবার ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত হলেই ক্ষুধার অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ। আর এভাবেই ধারাবাহিক উন্নয়নের ফলে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ কাক্সিক্ষত স্বনির্ভর বাংলাদেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। দেশের এনজিও/এমএফআই সেক্টর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
এএডি/