বাংলাদেশে নীতিনির্ধারণের একটি পুরোনো সমস্যা আছে; নীতির উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু বাস্তবায়নের সময় বাস্তবতাকে অবহেলা করা হয়। ফলে যে উদ্যোগটি শৃঙ্খলা আনার কথা, সেটিই অস্থিরতার জন্ম দেয়। ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার বা এনইআইআরকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্ক ঠিক সেই জায়গাটিতেই এসে ঠেকেছে। তাই এটি এখন আর কেবল প্রযুক্তিগত কোনো ব্যবস্থা নয়। এটি হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণচিন্তা, বাজারের বাস্তবতা এবং নাগরিক আস্থার মুখোমুখি সংঘর্ষ।
এনইআইআর মূলত কী? সরকার কেন এর পক্ষে?
এনইআইআর মূলত একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ। যেখানে দেশে ব্যবহৃত প্রতিটি মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বর সংরক্ষিত থাকবে। সহজ ভাষায় বললে, কোন ফোন বৈধভাবে আমদানি হয়েছে, কোনটি হয়নি- তা এই সিস্টেমের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে। অবৈধ বা নকল আইএমইআই যুক্ত ফোন ধাপে ধাপে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনাই এর মূল লক্ষ্য। সরকারের ভাষায়, এটি রাজস্ব ফাঁকি রোধ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি আধুনিক উদ্যোগ।
কাগজে-কলমে এই যুক্তিগুলো অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। একটি রাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবেই চাইবে তার বাজারে অবৈধ পণ্যের দৌরাত্ম্য কমুক, কর ব্যবস্থার বাইরে কেউ লাভ না করুক এবং অপরাধমূলক কাজে প্রযুক্তির অপব্যবহার বন্ধ হোক। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়- বাংলাদেশের মতো একটি দেশে, যেখানে
মোবাইল ফোন বিলাস নয় বরং দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ, সেখানে এমন একটি ব্যবস্থা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
বাংলাদেশের মোবাইল ফোন বাজার একটি অদ্ভুত বৈপরীত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে আছে ব্র্যান্ডেড, বৈধভাবে আমদানি করা ফোন; অন্যদিকে আছে কম দামের, অনানুষ্ঠানিক পথে আসা ডিভাইস। এই দ্বিতীয় ধারাটিই বাস্তবে বাজারের বড় অংশ জুড়ে আছে। কারণ খুব সাধারণ- আইনগত পথে ফোন আনলে শুল্ক ও করের চাপে তার দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যা দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর নাগালের বাইরে। এই ব্যবধানই বছরের পর বছর একটি সমান্তরাল বাজার তৈরি করেছে।
এনইআইআর নিয়ে ব্যবসায়ীরা কী বলছে?
এনইআইআর এই সমান্তরাল বাজারকে সরাসরি আঘাত করছে। সরকার বলছে, এতে শৃঙ্খলা আসবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছে, এতে বাজারে ধস নামবে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা হঠাৎ করেই নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। বহু দোকানে এমন ফোন মজুদ আছে, যেগুলো এই ব্যবস্থার আওতায় অচল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে। সেই ক্ষতির দায় কে নেবে- এই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর এখনও নেই। এই জায়গা থেকেই ক্ষোভ জমতে শুরু করে। যখন নীতির বোঝা সরাসরি গিয়ে পড়ে সবচেয়ে দুর্বল অংশের ওপর, তখন প্রতিক্রিয়া আসাটাই স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক সময়ে ভবনে হামলা, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ- এসবকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো মূলত একটি নীতিগত বিচ্ছিন্নতার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ওপরে, আর তার ধাক্কা লেগেছে নিচে।
এনইআইআরর নিরাপত্তা ও উদ্বেগ
তবে এই বিতর্কের আরেকটি দিক আছে, যেটি ধীরে ধীরে সামনে আসছে এবং বিষয়টিকে আরও গভীর করছে। এনইআইআর যেখানে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে, সেখানে সাধারণ নাগরিক হঠাৎ করে নিজের পরিচয় নিয়েই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। অনেকেই দেখতে পাচ্ছেন, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এমন সব মোবাইল সংযোগ বা ডিভাইস নিবন্ধিত, যেগুলোর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কই নেই।
এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত আতঙ্কজনক। কারণ মোবাইল নম্বর এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়- এটি ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্স, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নিজের নামে অজানাসংখ্যক সংযোগ থাকার অর্থ, নাগরিক জানে না তার পরিচয় কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে, কী উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আস্থার সংকট কীভাবে তৈরি হলো, তথ্য ব্যবস্থাপনায় কোথায় দুর্বলতা রয়ে গেছে এবং এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী- এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে এনইআইআর কার্যকর করা সম্ভব নয়। কারণ রাষ্ট্র যখন নাগরিকের হাতে প্রযুক্তিগত শৃঙ্খলার কথা তোলে, তখন নাগরিক প্রথমেই জানতে চায়, এই শৃঙ্খলা কি
তাকে সুরক্ষা দেবে, নাকি তাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলবে?
সাম্প্রতিক সময়ে বহু মানুষ খেয়াল করছে, নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে মোবাইল সংযোগ বা ডিভাইস যাচাই করতে গেলে অস্বাভাবিক তথ্য ভেসে উঠছে। কেউ হয়তো জীবনে তিন-চারটির বেশি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেনি, অথচ রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে তার নামে ২০, ৩০ এমনকি ৪০টিরও বেশি সংযোগ বা ডিভাইস নিবন্ধিত। এই অভিজ্ঞতা একক কোনো ব্যক্তির নয়। এটি ক্রমেই একটি সমষ্টিগত উদ্বেগে পরিণত হচ্ছে।
এই বাস্তবতা সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়, যখন একটি জাতীয় পত্রিকা এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, অনেকেই অবাক হয়ে জানতে পারছেন- অজান্তেই তাদের পরিচয় ব্যবহার করে একাধিক সংযোগ চালু আছে। কেউ জানেন না, এসব নম্বর কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে, কার হাতে আছে বা ভবিষ্যতে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলে তার দায় কার ঘাড়ে পড়বে। এখানেই এনইআইআরের নিরাপত্তা-বয়ান ভেঙে পড়ে।
কারণ একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রথম শর্ত হলো তথ্যের নির্ভুলতা। যদি ভিত্তিটাই দুর্বল হয়, তবে তার ওপর দাঁড়ানো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও দুর্বল হবে। নাগরিক যদি নিজের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যই বিশ্বাস করতে না পারে, তা হলে রাষ্ট্রের ডাটাবেজের ওপর আস্থা আসবে কীভাবে? এই প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর এখন সামনে আসেনি।
এনইআইআর কীভাবে কাজ করবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ করা দরকার। এনইআইআরের মাধ্যমে রাষ্ট্র মূলত দুটি কাজ একসঙ্গে করতে চাইছে- একদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণ অন্যদিকে নাগরিক নজরদারি। কিন্তু এই দুটি কাজের জন্য যে প্রশাসনিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রয়োজন, তা এখনও পরিপক্ব নয়। ফলে নিয়ন্ত্রণের আগ্রাসন যতটা দৃশ্যমান, সুরক্ষার নিশ্চয়তা ততটাই অস্পষ্ট।
নজরদারি ও গোপনীয়তার প্রশ্ন তাই স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে কোটি কোটি ডিভাইস ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য জমা হওয়া মানেই একটি বিশাল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। সেই ক্ষমতাকে ব্যবহার করবে, কীভাবে ব্যবহার করবে এবং ভুল হলে বা অপব্যবহার হলে নাগরিক কোথায় যাবে- এই প্রশ্নগুলো নীতিনির্ধারণের সময়ই স্পষ্ট করা দরকার ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এনইআইআর কার্যকরের গতি যত দ্রুত, ব্যাখ্যা ও আশ্বস্তকরণ ততটাই ধীর।
এই আস্থাহীনতার প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা যখন দেখছেন, নিজেরাই জানেন না কোন ফোন বৈধ, কোনটি অবৈধ, কিংবা ভবিষ্যতে কোন ডিভাইস হঠাৎ করে অচল হয়ে যাবে- তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা আতঙ্কিত হন। সেই আতঙ্ক যখন দীর্ঘদিন জমতে থাকে, তখন তা প্রতিবাদে, এমনকি সহিংস প্রতিক্রিয়ায় রূপ নেয়। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখতে পেলাম বিটিআরসি ভবনে হামলা, ভাঙচুরের ঘটনা।
এনইআইআর কী অযৌক্তিক
এখানে রাষ্ট্রের অবস্থানও একরৈখিক নয়। সরকার এনইআইআর বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে, কারণ তারা মনে করে, এখনই না করলে ভবিষ্যতে অবৈধ বাজার আরও শক্তিশালী হবে, রাজস্ব ক্ষতি বাড়বে এবং অপরাধ দমন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু নীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন তা ধাপে ধাপে, বাস্তবসম্মত সংস্কারের মাধ্যমে এগোয়।
কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা ছাড়া অবৈধ ফোন বন্ধ করার উদ্যোগ কার্যত বাজারে শক তৈরি করে। একই ভাবে, নাগরিকদের নামে ভুয়া বা অতিরিক্ত নিবন্ধনের সমস্যা সমাধান না করে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ মানে দায়ভার নিচের দিকে ঠেলে দেওয়া। এতে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না; বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের দূরত্ব বাড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি গিয়ে দাঁড়ায় একটি মৌলিক জায়গায়- রাষ্ট্র কি শৃঙ্খলা চায়, নাকি কেবল নিয়ন্ত্রণ? শৃঙ্খলা মানে কেবল বন্ধ করে দেওয়া নয়; শৃঙ্খলা মানে বিশ্বাসযোগ্য নিয়ম, স্বচ্ছ তথ্য এবং ন্যায্য রূপান্তর। এনইআইআর যদি সেই পথে এগোয়, তবে এটি টেলিযোগাযোগ খাতে একটি প্রয়োজনীয় সংস্কার হতে পারে। আর যদি আস্থার সংকট উপেক্ষা করেই এগোয়, তবে এটি বিতর্কিত রাষ্ট্রীয় প্রকল্প হিসেবে আখ্যায়িত হবে।
এএডি/