সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘বিদেশি এজেন্ট’ ও ‘মার্কিন স্বার্থের রক্ষক’ হিসেবে অভিহিত করে চলমান অস্থিরতার মধ্যেও জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান বর্তমানে ‘বড় সংকটে’ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে-এমন দৃশ্য ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে বিক্ষোভকারীরা কয়েকটি শহরের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে-যা কয়েক সপ্তাহ আগেও অকল্পনীয় ছিল।
এর আগে জুন মাসে ইরানে বোমা হামলার নির্দেশ দেওয়া ট্রাম্প গত সপ্তাহে তেহরানকে সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়াতে পারে। এর পরপরই সর্বশেষ হুঁশিয়ারিতে তিনি বলেন, গুলি না চালানোই ভালো, কারণ যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গত প্রায় দুই সপ্তাহে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের দৃশ্য প্রচার করা হয়েছে। একই সময়ে আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, রাতভর সহিংসতায় বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করেন ইরানের বিক্ষোভকারীরা নিরাপদ থাকবেন, কারণ দেশটিতে বর্তমানে পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
শুক্রবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের’ মুখে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব বিক্ষোভ বিদেশি শক্তির-বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের-ষড়যন্ত্রের ফল। একই সঙ্গে অস্থিরতা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
খামেনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বার্থে কাজ করছে এবং সরকারি সম্পত্তিতে হামলা চালাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তেহরান কখনোই বিদেশিদের জন্য ভাড়াটে সৈনিক হিসেবে কাজ করা মেনে নেবে না। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, ট্রাম্পের হাত ইরানি জনগণের রক্তে রঞ্জিত।
বিদেশভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৪৮ জন বিক্ষোভকারী।
রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাষ্ট্রকে জনগণের যৌক্তিক অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে। তবে অন্য পক্ষের বক্তব্য, কর্তৃপক্ষ কোনো ছাড় দেবে না, কারণ এই বিক্ষোভ বিদেশি শত্রুদের সমর্থনে পরিচালিত হচ্ছে।
তেহরান থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক তোহিদ আসাদি জানান, রাজধানীর বহু বাসিন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা পেয়েছেন যাতে তারা সহিংসতাপূর্ণ এলাকায় না যান।
তার ভাষায়, কর্তৃপক্ষ পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে সরকার দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে।
ইরানি মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও জানিয়েছে, বেলুচ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জাহেদানে শুক্রবার নামাজের পর অনুষ্ঠিত এক বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায়, এতে বেশ কয়েকজন আহত হন।
রিয়ালের ব্যাপক মূল্যপতনের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুরবস্থাই মূলত তেহরানের দোকানদারদের এই বিক্ষোভে নামতে বাধ্য করেছে।
বিক্ষোভ দমনের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার থেকে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। শুক্রবারও এই ব্ল্যাকআউট অব্যাহত থাকে। একই সঙ্গে ফোন নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা হয় এবং অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়।
ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ব্ল্যাকআউট ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলেছে এবং সংযোগ স্বাভাবিক মাত্রার মাত্র ১ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও অ্যাক্টিভিস্টরা ভিডিও অনলাইনে প্রকাশ করতে সক্ষম হন। এসব ভিডিওতে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভকারীদের সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে দেখা যায়।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘সন্ত্রাসী এজেন্টরা’ অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতা উসকে দিচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ইন্ধন জোগানোর অভিযোগ তুললেও সরাসরি বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নাকচ করেন।
লেবানন সফরের সময় তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংস ও বিভাজনমূলক রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তার মতে, সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা কম, কারণ অতীতের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র এসব বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলে মন্তব্য করেন।
এদিকে ইরানের স্বঘোষিত ক্রাউন প্রিন্স এবং নির্বাসিত শাহের পুত্র রেজা পাহলভি সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।
তিনি লেখেন, জনগণকে স্বাধীনতার জন্য রাস্তায় নামার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং তারা সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। তার মতে, এখন সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ট্রাম্প পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। ইরানের ভেতরে পাহলভির প্রকৃত সমর্থন কতটা, তা স্পষ্ট নয়। তবে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো হলি ডাগ্রেস বলেন, পাহলভির আহ্বান বিক্ষোভের গতিপথে প্রভাব ফেলেছে।
তার ভাষায়, বিশ্ববাসীকে বিক্ষোভের চিত্র দেখা থেকে বিরত রাখতেই ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে, যা নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর সুযোগ দিয়েছে।
ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে খামেনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট করতে নিজেদের রাস্তাঘাট ধ্বংস করছে।
খামেনির ভাষণের সময় উপস্থিত জনতাকে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ স্লোগান দিতে শোনা যায়।
/ইউএমএইচ