ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যখন তেহরানে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির কফিনের পাশে হাঁটছিলেন, তখন শোকাহত কালো পোশাকধারী জনতার একাংশ তার উদ্দেশে চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছিল ‘মৃত্যু আপসকারী’ বলে। আর সেখান থেকে অনেক দূরে, মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ও কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আলোচনায় সফল ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাগচি একপ্রকার পালাতে বাধ্য হন একদল উগ্রপন্থি পাথর ছুড়ে তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে অভিহিত করতে থাকায়।
এই সহিংস প্রতিক্রিয়া শুধু শোকের বহিঃপ্রকাশ ছিল না। বরং এটি ইরানের কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর একটি ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রতিফলন। কট্টরপন্থীরা মনে করছে যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরকারী ইরানি নেতারা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও এর বিপ্লবী আদর্শের বিরুদ্ধে এক ‘নমনীয় অভ্যুত্থান’ বা ‘সফট ক্যু’ চালাচ্ছেন।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী কট্টরপন্থীদের মতে, খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার বদলে ইরানি কর্মকর্তারা একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে আত্মসমর্পণ করেছেন। যা নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নির্দেশের পরিপন্থী। কিন্তু মোজতবা খামেনি এখনও জনসমক্ষে আসেননি, সরাসরি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেননি, এমনকি তার কর্তৃত্বও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতেও পারেননি। আহত হওয়ার পর থেকে তার নামে কর্মকর্তারা দেশ পরিচালনা ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে কট্টরপন্থীরা অভিযোগ তুলেছেন যে, দৃশ্যমান নেতৃত্ব যারা মোজতবার অনুপস্থিতিতে দেশ চালাচ্ছেন তারা সংসদ স্থগিত করে, সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ অমান্য করে এবং রাতের বেলায় রাস্তায় হতে থাকা জনসভাগুলো পণ্ড করার মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করছেন।
কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা মাহমুদ নাবাভিয়ান খামেনির জানাজার আগে সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘ইরানিদের জন্য সতর্কবার্তা : অভ্যুত্থান কি আসছে?’ এবং পরে তিনি লিখেছেন, ‘শহিদ ইমামের বিদায়ের এই মুহূর্তে আমরা তার রক্তের প্রতিশোধের পতাকা তুলে ধরছি এবং অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানে থাকছি।’
মোজতবার অনুপস্থিতিতে প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও আরাগচিই এখন যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ।
মার্কিন ইরান বিশেষজ্ঞ আরাশ আজিজির মতে, নতুন সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না থাকায়, কট্টরপন্থীরা গালিবাফ ও তার সহকর্মীদের অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিযুক্ত করছে। যদিও ইরানে যুদ্ধকালীন ঐক্য ব্যাপক ও বিস্তৃত, তবে প্রয়াত খামেনির এক সপ্তাহব্যাপী জানাজা কট্টরপন্থীদের জন্য এক শক্তিশালী মঞ্চ হয়ে ওঠে।
তারা এই অনুষ্ঠানকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন যুদ্ধের দাবি এবং ট্রাম্পের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেয়। তাদের এই আকাক্সক্ষা আপাতত পূর্ণ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, কারণ ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এই সপ্তাহে প্রায় ভেঙে পড়েছে। রেভল্যুশনারি গার্ড হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে। আর ইরানি কট্টরপন্থীরা যুদ্ধবিরতি বাতিলের দাবি তুলছে।
কট্টরপন্থীরা প্রথমে তাদের রোষানল নিক্ষেপ করে সেসব ইরানি নেতার ওপর যারা মার্কিন চুক্তিতে সই করেছিলেন। একটি অনুষ্ঠানে প্রভাবশালী ধর্মীয় গায়ক মোহাম্মদ আলি বাখশি প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে স্পষ্ট হুমকি দিয়ে বলেন, ‘মহাশয়, যদি সর্বোচ্চ নেতার শর্ত পূরণ না হয়, তবে আমরা (হবো) তলোয়ার এবং (নিচে থাকবে) আপনার গলা। আপনার ওপর জাহান্নাম নেমে আসবে।’ এই হুমকি ব্যাপক সমালোচিত হলেও বাখশির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কট্টরপন্থীদের নজরদারিতে থাকা আরেকজন কর্মকর্তা হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের প্রধান আলোচক গালিবাফ, যিনি প্রাক্তন আইআরজিসি কমান্ডার এবং বিজ্ঞ রাজনীতিক। যুদ্ধের সময় তিনি শীর্ষে উঠে আসেন এবং কার্যত শাসনতন্ত্রের প্রধান পরিচালকে পরিণত হন, যা কট্টরপন্থীদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা কামরান গাজানফারি জুলাই মাসের শুরুর দিকে অভিযোগ করেন, গালিবাফ ও তার সহযোগীরা সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ নেতা ও সংসদের ভূমিকা ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছেন। এটিকে তারা ‘ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত রাজনৈতিক অভ্যুত্থান’ বলে অভিহিত করেছেন।
এই অভ্যুত্থান তত্ত্বের বিরোধিতায় গত মঙ্গলবার বর্তমান চুক্তির তীব্র বিরোধী এবং ‘ক্যু’ সংক্রান্ত সতর্কবার্তার অন্যতম মুখ নাবাভিয়ানকে সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই সময়ে আরেকজন সমালোচক আইনপ্রণেতাকেও পদচ্যুত করা হয়। নাবাভিয়ান শুরুতে ইরানের আলোচনা দলের সদস্য ছিলেন কিন্তু পরে আলোচনার বিরোধিতা করেন। গত মাসে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এর খসড়া ফাঁস করে দেওয়ার চেষ্টাও করেন তিনি।
নাভাবিয়ানের দাবি, আলোচক দল সর্বোচ্চ নেতার রেড লাইন অমান্য করছে। তিনি এবং তার মতো অন্যান্যরা ‘জেবহে-য়ে পায়দারি’ (অটল ফ্রন্ট) নামক কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর মুখপাত্র হয়ে কাজ করছেন। এই ফ্রন্টের সদস্যরা নিজেদের ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মূল্যবোধের রক্ষক বলে মনে করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, দৃশ্যমান নেতারা সক্রিয়ভাবে এই কট্টরপন্থীদের প্রান্তিকীকরণের চেষ্টা করছেন। জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজি মনে করেন, গালিবাফ তাদের পাশ কাটানোর চেষ্টা করছেন। কারণ ইরানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এই কট্টরপন্থীরা শাসনতন্ত্রের জন্য ‘অতি ব্যয়বহুল’ এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
এই কট্টর গোষ্ঠীর সমর্থক সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তবু তারা সংসদ ও রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আইআরআইবিসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা প্রভাবশালী পদে অধিষ্ঠিত। তাদের সমর্থকে সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও এর অন্যতম বিশিষ্ট মুখ হলেন সাঈদ জালিলি। তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন (ইরানের জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ)। যুদ্ধ ও কূটনীতির মাসগুলোতে ট্রাম্প বারবার ইরানকে ‘গভীরভাবে বিভক্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং দাবি করেছেন যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই চুক্তিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
সিএনএন লিখেছে, এমন দৃশ্যমান বিভাজন সত্ত্বেও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন ইরানি শাসনতন্ত্র মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে যুদ্ধ শেষ করার মূল লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ। তবু মোজতবা খামেনির অব্যাহত অনুপস্থিতি, যুদ্ধবিরতির প্রতি তার শর্তসাপেক্ষ সমর্থন, রেভল্যুশনারি গার্ডের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা এবং জানাজায় বিপুল জনসমাগম কট্টরপন্থীদের আরও উৎসাহিত করেছে। তারা এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার নিজস্ব আক্রমণাত্মক এজেন্ডা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে।
এমনকি প্রাক্তন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনুচেহর মোত্তাকি সম্প্রতি টেলিভিশনে পরামর্শ দেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর যেকোনো একটিতে আক্রমণ করে শতাধিক মার্কিন সৈন্যকে বন্দি করে ইরানে নিয়ে আসা উচিত।’ এটি ইঙ্গিত দেয়, কট্টরপন্থীরা এখনও ইরানের ভেতরে শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে টিকে আছে এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তেজনাময় পথের দিকে এগোচ্ছে।
সময়ের আলো/এসএকে