ভঙ্গুর অর্থনীতি জোড়া লেগেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্যাংকিং অ্যালমানাক গ্রন্থের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অনেকে জানতে চায় বাংলাদেশের অর্থনীতি কেমন

2026-01-11T03:44:17+00:00
2026-01-11T03:44:17+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ভঙ্গুর অর্থনীতি জোড়া লেগেছে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৪৪ এএম 
ব্যাংকিং অ্যালমানাক গ্রন্থের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। ছবি : সংগৃহীত
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্যাংকিং অ্যালমানাক গ্রন্থের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অনেকে জানতে চায় বাংলাদেশের অর্থনীতি কেমন চলছে। আমরা বলি, অর্থনীতি ভঙ্গুর থেকে জোড়া লাগানো ও শক্তিশালীর দিকে গেছে। তবে এখন মোটামুটি চলছে, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিতে নিতে হবে। দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির মাধ্যমে অনেক দেশ এগিয়ে গেছে। এ জন্য পরবর্তী সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন তথ্য নিয়ে গবেষণা গ্রন্থ ‘ব্যাংকিং অ্যালমানাক’-এর সপ্তম সংস্করণ প্রকাশনা উৎসবে এসব কথা বলেন হোসেন জিল্লুর রহমান। 

তিনি আরও বলেন, অর্থনীতির চাকা ঘোরায় উদ্যোক্তারা। শুধু বড় উদ্যোক্তা নয়, গ্রামের কৃষকরা এতে বড় ভূমিকা রাখে। তাদের আস্থা বড় একটা বিষয়। এই বিষয়ে পরবর্তী সরকারকে কাজ করতে হবে। মানুষের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বাড়াতে কাজ করতে হবে। এতে বড় বিষয় মূল্যস্ফীতি। এতে নীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা কী হবে, এটা গুরুত্বপূর্ণ।

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অর্থনীতির পাশাপাশি সব খাতে তথ্যের সত্যতা বড় বিষয়। অর্থনীতি ব্যবস্থাপনা করতে আমাদের সঠিক তথ্য ও পেশাদারি থাকতে হবে। কী নীতি নেওয়া হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পর মানুষ অনেক সচেতন হয়ে গেছে। সবাই সবকিছুতে নজর রাখছে। এ জন্য তদারকি জোরদারের পাশাপাশি পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শুধু নীতি সুদহার দিয়ে মূল্যস্ফীতি কমবে না। মূল্যস্ফীতি কমাতে বড় ভূমিকা রাখে সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা। আমরা নানা চেষ্টার পর মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে এসেছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সুদহার কমানো সহজ নয়। ট্রেজারি বিলের সুদহার কমেছে। এর প্রভাব সুদহারে পড়বে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়ে এসেছে। দেশের উন্নয়ন কারও একক কৃতিত্ব নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন সবসময় পুঞ্জীভূত। এটা ধারাবাহিক উদ্যোগের ফলাফল।

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশকে হুবহু সিঙ্গাপুরে রূপান্তরের স্বপ্ন দেখানো নয় বরং ধৈর্য, চেষ্টা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। সময় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করলে বাংলাদেশ আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে।’

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জনপ্রিয়তার চাপে পড়ে নয় বরং দেশের সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই নীতি নির্ধারণ করতে হয়। নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয় এবং এখানে ভুল থাকার সম্ভাবনাও থাকে। নীতি নেওয়া খুব সহজ কাজ না। অনেক সময় জনপ্রিয় বা পপুলিস্ট ডিমান্ড আসে কেউ বলে সুদের হার কমান, কেউ বলে কর কমান। সবাই বলে ‘আমি, আমি’, কিন্তু ‘আমরা’ বলে না। অথচ নীতি তো একজনের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্য।’ তিনি বলেন, ‘খুব সহজ কাজ না-রেট অব ইন্টারেস্ট (সুদের হার) কমিয়ে দেওয়া। এখানে আপনার ব্যাংক রেটের সঙ্গে ট্রেজারি বিলের রেট আছে। এগুলো চট করে একদিকে কমিয়ে দিলে, অন্যদিকে বেলুনের মতো ফুলবে। আপনি চাপ দিলেন (এক দিকে) আরেক দিকে ফুলে যাবে, আলটিমেটলি ফেটেই যাবে। অতএব, একটু কনসিস্টেন্সি লাগে।’

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘তবে ইন্টারেস্ট যে কমে নাই তা না। ট্রেজারি বিলের সুদহার তো কমে গেছে, বোধহয় ১২ ছিল এখন ১০ না? যারা ট্রেজারি বিল কেনেন তারা দেখছেন। সুদের হার কমছে তো, এটার রিফ্লেকশন মার্কেটে (নীতির প্রভাবে সুদহার কমে যাচ্ছে)। হয়তো তথ্যটা (এখনও) আসেনি।  তবে যদি ট্রেজারি বিল বা সঞ্চয়পত্রের সুদ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তা হলে ব্যাংকে আমানত রাখা কমে যাবে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’

ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় ব্যাংক খাতের অবস্থা ছিল সংকটপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কিছু ব্যাংকের প্রভিশনিং ও ঋণ কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এসব পরিবর্তনের প্রতিফলন ব্যাংকিং অ্যালমানাকে উঠে এসেছে। গবেষণা গ্রন্থ ব্যাংকিং অ্যালমানাক প্রসঙ্গে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এটি বিনিয়োগের সরাসরি নির্দেশনা না দিলেও ব্যাংক খাত বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ডেটা সোর্স। এতে পেইড-আপ ক্যাপিটাল, অথরাইজড ক্যাপিটাল, ক্যাপিটাল রেশিও, প্রভিশনিং, রিটেইন্ড আর্নিংস এবং ক্রেডিট-ডিপোজিট রেশিওসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সংযোজন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, সুদহার কেন বাড়ছে তা বুঝতে পারছি না। ভালো ব্যাংকগুলোতে অনেক অতিরিক্ত তহবিল আছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেশে ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে ৬-৭টা ব্যাংকের টাকা বাইরে পাচার হয়ে গেছে। এ জন্য সুদহার কমছে না। আমরা তহবিল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুদহার কমিয়ে আনার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, আমাদের অর্থনীতি পুরোটাই ব্যাংকনির্ভর, এ জন্য ব্যাংকের ওপর চাপ বেশি। এই প্রকাশনায় সুপারিশ বা করণীয় থাকলে সবার জন্য ভালো হতো।

অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ব্যাংক খাতে অনেক সমস্যা হয়েছে। কিছু ব্যাংক ঘুরে দাঁড়িয়েছে। যারা পারেনি তাদের একীভূত করা হচ্ছে। কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আর্থিক খাত ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব-উর রহমান, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন, ব্যাংকিং অ্যালমানাকের প্রকল্প পরিচালক ও সাপ্তাহিক শিক্ষা বিচিত্রার সম্পাদক আবদার রহমান প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ও প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সবশেষে ব্যাংকিং অ্যালমানাক সপ্তম সংস্করণের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় শিক্ষাবিষয়ক সাপ্তাহিক পত্রিকা শিক্ষাবিচিত্রার উদ্যোগে ২০১৬ সাল থেকে ‘ব্যাংকিং অ্যালমানা’ গবেষণা গ্রন্থটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর একটি মোড়কে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলি, সেবা এবং কর্মদক্ষতা সূচকের সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত সর্বসাধারণের সম্মুখে তুলে ধরা হয়।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত যে বিস্তর তথ্য-উপাত্তের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে অবদান রেখে যাচ্ছে ব্যাংকিং অ্যালমানাক তারই সুসংগঠিত বার্ষিক হালনাগাদ তথ্য-ভান্ডার। গবেষক, পেশাজীবী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ব্যাংকিং অ্যালমানাক’ একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা গ্রন্থ।
Advertisement
Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: