‘হক-কথা’ সম্পাদক সৈয়দ ইরফানুল বারী

শেখ সায়মন পারভেজ হিমেল

কাজী নজরুল ইসলাম অভিনীত ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে দেবর্ষি নারদকে গুরু মেনে বালক ধ্রুব মন্ত্র শিখে মধুবনে যেভাবে পদ্ম পলাশ লোচন হরির

2026-01-11T03:54:43+00:00
2026-01-11T03:54:43+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
‘হক-কথা’ সম্পাদক সৈয়দ ইরফানুল বারী
চিরবিদায় ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর
শেখ সায়মন পারভেজ হিমেল
প্রকাশ: রোববার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৫৪ এএম   (ভিজিট : ২০৯)
‘হক-কথা’ সম্পাদক সৈয়দ ইরফানুল বারী
কাজী নজরুল ইসলাম অভিনীত ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে দেবর্ষি নারদকে গুরু মেনে বালক ধ্রুব মন্ত্র শিখে মধুবনে যেভাবে পদ্ম পলাশ লোচন হরির দেখা পেয়েছিল, ঠিক একই রূপকতায় আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকে বিদ্যা অর্জন করে সভ্য ও সুখী জীবনের স্বাদ পাই। আর তাদের নাম রচিত হয় আমাদের হৃদ মানমন্দিরে।
এমনি একজন শিক্ষাগুরু আমাদের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) শ্রদ্ধেয়  সৈয়দ ইরফানুল বারী স্যার। তিনি মওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। আর আমাদের একজন শিক্ষাগুরু। একজন আদর্শ শিক্ষকের ভূমিকায় তিনি অনন্য।

আমাদের শ্রদ্ধেয় সৈয়দ ইরফানুল বারী স্যার ৯ জানুয়ারি (শুক্রবার) দুপুরে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার বিয়োগে আজ স্মৃতির পাতায় বিভিন্ন ঘটনা উঁকি দিচ্ছে। তার মহান আদর্শিকতা বোঝাতে কয়েকটি ঘটনার কথা বলি।

এক দিন সকাল ৯টা থেকে স্যার আমাদের ‘ভাসানী স্টাডিজ’ ক্লাস নেবেন। ক্লাস প্রতিনিধির মাধ্যমে আমাদেরকে জানিয়ে দিলেন সকাল ৯টায় ক্লাস হবে বলে। একটু সামান্য দেরি করেই ক্লাসে এলো সবাই। কিন্তু ৯টা বাজার ২-৩ মিনিট আগে ক্লাসে উপস্থিত হয়ে ঠিক ৯টায়ই ক্লাস শুরু করলেন স্যার। আর এটাই একজন আদর্শ শিক্ষকের সৌন্দর্য নয় কি? 

আরেকটি ঘটনার কথা না বললেই নয়। গত রোজার সময় স্যারের দুই ঘণ্টাব্যাপী ক্লাস। এত বয়স হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রতিটি লেকচার দাঁড়িয়ে দিলেও ভাবছিলাম রোজা থাকায় হয়তো স্যার অন্তত বসে লেকচার দেবেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো পুরো ক্লাস দাঁড়িয়ে লেকচার দিলেন।

আর এদিকে আমি বসে ক্লাস করার পরও যুবক বয়সেও ক্লান্ত পাখির ন্যায় লেকচার শুনছি। আমার অবস্থা ‘পালামৌ’ গল্পের বৃদ্ধের ন্যায় ‘চক্ষু মাছি উড়িতেছে, মুখে হাসি নাই।’ কিন্তু এ বয়সে এসেও স্যার যেন সুকান্ত ভট্টাচার্যের আঠারো বছর বয়সের তরুণ। 

স্যার কিন্তু লেখক হিসেবে কম নন। ব্যক্তিগত জীবনে রবুবিয়াত দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তার বহু লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখার ও গবেষণার বিষয় : নৈতিকতা ও মনোবিজ্ঞান, রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন, পানি ও পরিবেশ আন্দোলন, ঐশী জীবন ইত্যাদি। তার প্রকাশিত গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে মওলানা ভাসানীর ভূমিকা (১৯৭৪), ‘পশ্চিম পাকিস্তানে’ মওলানা ভাসানীর শেষ সফর (১৯৭৪), ভাসানীর অনশন (১৯৭৪), হুকুমতে রব্বানিয়া : পূর্বশর্ত (১৯৭৪), ত্রিরাত্রির বিতর্ক (১৯৭৫), মওলানা ভাসানীর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭৬), মওলানা ভাসানী হুজুরের সর্বশেষ ভাষণ (১৯৭৮), ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় : কেন এই ধূম্রজাল (১৯৮০), মওলানা মহান (১৯৮৪), রুবাব (কাব্য-১৯৮৮), ধ্রুবতারা (কাব্যনাট্য-১৯৮৮), সূফীর জীবন (১৯৯২), আমার ভালোবাসা মওলানা ভাসানী (১৯৯২), মজলুম (১৯৯৫), মওলানা ভাসানীর সাক্ষাৎকার (২০০৩), মওলানা ভাসানী বলেছেন (২০০৩), নানান মাত্রায় মওলানা ভাসানী (২০১৪), কানপচা কুকুর (কাব্য- ২০১৪) ইত্যাদি বিভিন্ন মহলে সমাদৃত।

তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর একেবারে ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। ভাসানীর আদর্শকে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেন। আমরা তখন এক নবতারুণ্য শক্তিতে উদ্বুদ্ধ হই। খুঁজে পাই আপন অস্তিত্ব কতটুকু সমৃদ্ধ ছিলাম। সেই আদর্শিক চেতনাকে বইয়ে লিপিবদ্ধ করে বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন সমগ্র বিশ্বে। এটিও খুব অনুপ্রেরণা যে আমাদের ইরফানুল বারী স্যার একজন সমৃদ্ধ লেখক।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ভাসানী গবেষণার জ্ঞান তৃষ্ণা মেটাতে স্যারের সান্নিধ্যে যেতাম। একবার বিশ্ব শিক্ষক দিবসে  স্যারকে নিয়ে ডেইলি ক্যাম্পাসে একটি লেখা লিখলাম। স্যারকে লেখাটি দিলাম। খুব মনোযোগ সহকারে আমার লেখাটি পড়লেন। একটা মুচকি হেসে বললেন, ভালো লিখেছো। স্যারের তৃপ্তি মাখা মুচকি হাসিটা আমার স্মৃতিপটে আজ ভীষণ নাড়া দিচ্ছে ।

শ্রদ্ধেয় স্যারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছু বলি। তিনি কিশোরগঞ্জের হয়বৎনগরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১ মার্চ ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সৈয়দ ফজলুল বারী (১৯০৬-১৯৬৩) আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ ৩৭ বছর কর্মরত ছিলেন। তার মায়ের নাম সৈয়দা সেলিমা খাতুন। সৈয়দ ইরফানুল বারী স্যার গুরুদয়াল কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে ইন্টারমিডিয়েট, ১৯৬৫ সালে ডিগ্রি এবং ১৯৬৭ সালে সাইকোলজিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাকে প্রেরণা দান করেন ভাষাসৈনিক আবু তাহের খান পাঠান।

শিক্ষাজীবন শেষে বৈচিত্র্যময় কর্মজীবন অতিবাহিত করেন তিনি। ১৯৬৫ সালে দৈনিক পয়গাম পত্রিকার সহ-সম্পাদক হিসেবে তার কর্মজীবনের শুরু। ১৯৬৭ সালে তিনি এ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক পদে উন্নীত হন। সাংবাদিকতার সুবাদেই মহান নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সঙ্গে তার পরিচয় এবং ১৯৬৯-এর মাঝামাঝিতে সার্বক্ষণিক কর্মীতে পরিণত হন। ১৯৭২ থেকে মওলানার প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক ‘হক-কথা’ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি জেল-জুলুমের শিকার হন। ‘হক-কথা’র সম্পাদক হিসেবেই দেশ-বিদেশে তার নাম ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে। সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে তিনি বহুবিধ দায়িত্বের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। 

এসব দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে রৌমারির রণাঙ্গনে কলমসৈনিক (১৯৭১), সাপ্তাহিক ‘হক-কথা’ সম্পাদক (১৯৭২-১৯৮১), মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রতিষ্ঠিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (১৯৭৪-১৯৭৬), ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় টেকনিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষক্ষ (১৯৭৫-১৯৭৬), মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত হুকুমতে রব্বানিয়া আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক (১৯৭৪ থেকে), মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত সমবায় আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি/সম্পাদক (১৯৭৪ থেকে), মওলানা ভাসানী প্রতিষ্ঠিত খোদায়ী খিদমতগার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (১৯৭৬), সরকার কর্তৃক গঠিত সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের সেক্রেটারি ও সদস্য (১৯৮৪-২০০৫), আন্তর্জাতিক ফারাক্কা কমিটি বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক (২০০৩ থেকে), কাগমারী সম্মেলন ৫০ বর্ষপূর্তি পালন জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক (২০০৬ থেকে), সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড কর্তৃক স্থাপিত ‘মওলানা ভাসানী রিসার্চ সেন্টার’-এর রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর (২০০৬ থেকে), পীর শাহজামান-মওলানা ভাসানী মিশন-এর সভাপতি (২০০৬ থেকে), মওলানা ভাসানী মুসাফিরখানার সভাপতি (২০১২ থেকে)। টাঙ্গাইলের সন্তোষে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সৈয়দ ইরফানুল বারীর ভূমিকা ও অবদান অনন্য। 

২০১৩ সাল থেকে তিনি মাওলানা ভাসানী স্টাডিজ কোর্সের কোর্স টিচার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। মওলানা ভাসানীর ওসিয়ত মোতাবেক তিনি টাঙ্গাইলের সন্তোষে অবস্থান করেছেন। তিনি মওলানা ভাসানীর জীবদ্দশায় তার সঙ্গে ছিলেন, আমৃত্য তিনি সন্তোষেই বসবাস করেন। যা ভাসানী  প্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই তো ভাসানীর মাজারের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন আমাদের সৈয়দ ইরফানুল বারী স্যার। 

আমরা বহির্বিশ্বের কত মহান শিক্ষককে নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু আমাদের স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে লুকায়িত থাকা সৈয়দ ইরফানুল বারী স্যারদের মতো আদর্শ শিক্ষকের পরিচয় কেন উন্মোচন করি না? এমন মহান আদর্শ শিক্ষকদের আবেশে নেতিবাচকতার স্তূপ শ্রদ্ধার পিরামিডে রূপান্তরিত হোক।
একজন আদর্শ শিক্ষকের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাই আন্তরিক সমবেদনা। আল্লাহ তায়ালা মরহুমের আত্মার মাগফেরাত দান করুন।

Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: