গ্রাফিক : সময়ের আলো স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব ড. সেলিম আল দীনের ১৮তম প্রয়াণ দিবস আজ। ঔপনিবেশিক সাহিত্যধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলা নাটককে আবহমান বাংলার গতিধারায় ফিরিয়ে এনেছিলেন নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। বাংলা নাটকে বিষয়, আঙ্গিক আর ভাষা নিয়ে গবেষণা ও নাটকে তার প্রতিফলন তুলে ধরেন তিনি। স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে বাংলা নাটকের যে আন্দোলন, তার পেছনেও রয়েছে সেলিম আল দীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তিনি প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের শেকড়ের সন্ধানে মগ্ন ছিলেন। রবীন্দ্রপরবর্তী যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী নাট্যব্যক্তিত্ব সেলিম আল দীন।
তিনি ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখীল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মফিজউদ্দিন আহমেদ ও মাতা ফিরোজা খাতুন। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ফেনী, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রংপুরের বিভিন্ন স্থানে। বাবার চাকরির সূত্রে এসব জায়গার বিভিন্ন স্কুলে পড়াশোনা করেছেন তিনি।
১৯৬৪ সালে ফেনীর সেনেরখীলের মঙ্গলকান্দি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন। ১৯৬৬ সালে ফেনী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে গিয়ে ভর্তি হন টাঙ্গাইলের করটিয়ার সা’দত কলেজে। সেখান থেকে স্নাতক পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মধ্যযুগের ‘বাঙলা নাট্য’-এর ওপর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন সেলিম আল দীন।
১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর লেখক হওয়ার বিষয়ে পাকাপোক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তিনি। লেখক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৮ সালে, কবি আহসান হাবীব সম্পাদিত দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার মাধ্যমে। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ নিয়ে লেখা তার বাংলা প্রবন্ধ ‘নিগ্রো সাহিত্য‘ ছাপা হয় ওই পত্রিকায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন সেলিম আল দীন, যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটারে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষে যোগ দেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপীতে কপিরাইটার হিসেবে। ১৯৭৪ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ওই বছরই বেগমজাদি মেহেরুন্নেসার সঙ্গে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের একমাত্র সন্তান মইনুল হাসানের মৃত্যু হয় অল্প বয়সেই।
মধ্যযুগের বাংলা নাট্যরীতি নিয়ে গবেষণা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন সেলিম আল দীন। বাংলাদেশে একমাত্র বাংলা নাট্যকোষেরও তিনি প্রণেতা। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকেন্দ্রিক নিও এথনিক থিয়েটারেরও তিনি উদ্ভাবনকারী। ‘উপন্যাসের মঞ্চভ্রমণ’ শিরোনামে তিনি ‘কাঁদো নদী কাঁদো’সহ কয়েকটি উপন্যাসকে মঞ্চে এনেছিলেন। বাংলা নাটকের শিকড় সন্ধানী এ নাট্যকার ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের বিষয় ও আঙ্গিক নিজ নাট্যে প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলা নাটকের আপন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের প্রথম কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠা লাভ করে সেলিম আল দীনের হাত ধরেই। তার সম্পাদনায় ‘থিয়েটার স্ট্যাডিজ’ নামে পত্রিকা প্রকাশিত হতো নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে। তার অধীনে অনেক গবেষক গবেষণা করে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সেলিম আল দীন ১৯৮১-৮২ সালে নাট্য নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফকে সাথি করে গড়ে তোলেন বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার। গ্রাম থিয়েটারের প্রথম সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলেন মানিকগঞ্জের ‘তালুকনগর থিয়েটার’।
তিনি শুধু নাটক রচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বাংলা ভাষার একমাত্র নাট্যবিষয়ক কোষগ্রন্থ ‘বাংলা নাট্যকোষ’ সংগ্রহ, সংকলন, প্রণয়ন ও সম্পাদনা করেছেন। তার রচিত ‘হরগজ’ নাটকটি সুয়েডীয় ভাষায় অনূদিত হয় এবং এ নাটকটি ভারতের রঙ্গকর্মী নাট্যদল হিন্দি ভাষায় মঞ্চায়ন করেছে।
নিজের নাটক সম্পর্কে সেলিম আল দীন বলেন, ‘আমার কাছে সবসময় মনে হয়েছে, বাংলা কবিতার চেয়ে নাটকের যে দীনতা, উপন্যাসের চেয়ে নাটকের যে সীমাবদ্ধতা, সেটাকে ঘোচাতে হবে। সেটা ঘোচাতে যদি যাই, তা হলে আমাকে নতুন ভূমি, নতুন মানুষ, নতুন শিল্প দর্শন আবিষ্কার করতে হবে। এই ভূমি আবিষ্কার করতে গিয়ে আমার কাছে প্রচলিত কাঠামোগুলোকে কঠোরভাবে বর্জন করতে হয়েছে। ফলে আমার লেখা পড়ে হুট করে নাটক মনে হয় না। কিন্তু এটাও তো সত্য যে, মূলত আমি নাটকই লিখতে চেয়েছি। আমার নাটকে নাটকই প্রাধান্য পেয়েছে, গীতলতা বা কাব্যালুতা নয়। মূলত দৈনন্দিনের গদ্যকে আমি জীবনের নিগূঢ় প্রবাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চাই।
আমি সরাসরি ইউরোপীয় রীতিতে লেখার অপপ্রয়াস কখনো করিনি। কাজেই ট্র্যাজেডি নাটকের সংলাপের স্থিতিস্থাপকতা আমার নাটকে অপ্রয়োজনীয়। ট্র্যাজেডি-পড়া কান দিয়ে বাংলাদেশি মনকে বোঝা যাবে না কখনো। বাংলা নাটকে ইউরোপীয় রীতির ট্র্যাজেডি করার প্রয়াস সর্বাংশে ব্যর্থ হয়েছে। আমার নাটক যদি এই বাংলাদশি জনপদের জীবনযুদ্ধ, বেদনা ও পতনকে গভীরভাবে ধারণ না করে থাকে, তবে তা অবশ্যই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। অন্য কোনো কারণে নয়।
আমি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ছেলে। একটি প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ও যুক্তিবাদী সমাজে গদ্যের যে রীতি, তা থেকে বাংলাদেশি গদ্যরীতি ভিন্ন হতে বাধ্য। আমাদের গদ্যে থাকবে হত্যার আর্তনাদ, তাজা রক্তের স্পন্দন। বাবুগদ্য নয়- পদ্মাপারের মানুষ যে ভাষায় আর্তনাদ করে সে ভাষা চাই নাটকে। উপরন্তু আমার জন্ম বঙ্গোপসাগরের তীরে। সমুদ্রের ঢেউ ও প্রলয়ের সঙ্গে পরিচয় জন্মাবধি। সুতরাং মোজাইক ড্রাই মনোটোনাস ইত্যাদি গদ্যরীতির অনুকৃতি আমার দ্বারা সম্ভব নয়।’
শিল্পের আন্তর্জাতিকতা প্রসঙ্গে সেলিম আল দীন বলেন : ‘কোনো শিল্পেরই আন্তর্জাতিক ফর্ম হয় না। কারণ শিল্প দেশ-কাল, ধর্ম-সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট ভূগোলের ওপর দাঁড়ানো। লাতিন আমেরিকান শিল্পরীতি আমাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। বৈশ্বিক হয়ে উঠতে পারে, তবে কাজ দেশ-কাজ ভূগোলের আশ্রয়ে সমূলিত।’
সেলিম আল দীনের লেখা নাটকের মধ্যে ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’, ‘শকুন্তলা’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘চাকা’, ‘হরগজ’, ‘প্রাচ্য’, ‘হাতহদাই’, ‘নিমজ্জন’, ‘ধাবমান’, ‘পুত্র’, ‘বনপাংশুল’ উল্লেখযোগ্য। ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে তার গবেষণাধর্মী নির্দেশনা ‘মহুয়া’ ও ‘দেওয়ানা মদিনা’। তার রচিত ‘চাকা’ ও ‘কীর্তনখোলা’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।
পাশ্চাত্য শিল্পের সব বিভাজনকে বাঙালির সহস্র বছরের নন্দনতত্ত্বের আলোকে অস্বীকার করে এক নবতর শিল্পরীতি প্রবর্তন করেন সেলিম আল দীন, যার নাম দেন ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’। দ্বৈতাদ্বৈতবাদী রীতিতে লেখা তার নাটকগুলোতে নীচুতলার মানুষের সামাজিক নৃতাত্ত্বিক পটে তাদের বহুস্তরিক বাস্তবতাই ওঠে আসে।
‘চাকা’ সেলিম আল দীনের অন্যতম আলোচিত একটি নাটক, যেটি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে। দেশ ছাড়িয়ে এটি ভারত, যুক্তরাষ্ট্রে মঞ্চায়িত হয়। ‘চাকা’ নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হয় যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০ সালে। সৈয়দ জামিল আহমেদ নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ করেন। ২০০৬ সালে ভারতে দিল্লিস্থ ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা ‘চাকা’ নাটকটি প্রযোজনা করে।
এ নাটকটি রচনার পেছনে একটি রাজনৈতিক ঘটনার প্রভাব রয়েছে। ১৯৮৭ সালের দিকে যখন বাংলাদেশে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন চলছিল তখন নূর হোসেন নামের প্রায় অচেনা অজানা এক যুবক বুকে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে রাস্তায় নেমেছিলেন। তিনি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। নূর হোসেন ১০ নভেম্বর আকস্মিকভাবে পুলিশের গুলিতে মারা যান। এ ঘটনাটি নাট্যকার সেলিম আল দীনের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। এ মরদেহের দায় কে নেবে? এই অজানা অচেনা যুবকের মরদেহটির কী হবে? কীভাবে পৌঁছে দেবে তার স্বজনের কাছে? রাষ্ট্রের এমন বিমূঢ় ঘটনায় নানাভাবে আন্দোলিত হয়ে ওঠেন নাট্যকার। নাটকটিতে নানা উক্তি, নানা বর্ণনায় সে শঙ্কার রূপই প্রতিভাত হয়ে ওঠে। নাটকটিতে যখন বলেন- ‘শহর থেকে একটি সরকারি লাশ এসেছে’, ‘কল্যাণমূলক রাষ্ট্র মানেই লাশের গন্তব্যে লাশকে পৌঁছানো’ বা ‘নয়ানপুর কলেজের ছাত্রী রেহানা (১৯) যে ছেলেটাকে ভালোবাসে গোপন একটি রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করে’, কিংবা ‘এখন করুণা জাগে তাদের জন্য যারা তাকে হত্যা করেছে, যারা তাকে ভুল ঠিকানার দিকে প্রেরণ করেছে- করুণা জাগে তাদের জন্য যারা পেট চিরেছে, হত্যার কারণ গোপন করেছে’ ইত্যাদি সংলাপ থেকে সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে নাট্যকার কোন বিষয়কে ইঙ্গিত করেছেন।
ফেনীর কৃতীসন্তান নাট্যাচার্য ড. সেলিম আল দীন ২০২৩ সালে সাহিত্যে (মরণোত্তর) স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন। উল্লেখ্য, সেলিম আল দীনের আসল নাম ড. মুহাম্মদ মঈনুদ্দিন আহমেদ। সেলিম আল দীন নামে লেখালেখি করতেন বলেই তিনি এ নামেই সমধিক পরিচিত।
স্বাধীনতা পদক, একুশে পদক, বাংলা একাডেমি ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত ড. সেলিম আল দীন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলাদেশের নাট্যজগতে নেমে আসে নিকষ কালো আঁধার। তিনি মৃত্যু প্রসঙ্গে তার ‘ধাবমান’ নাটকের এক স্থানে লিখেছেনর: ‘সে মৃত্যু কষ্টজয়ী হোক, সে দুঃখ জয়ী হোক/ শোক পারায়ে যাক সবল পায়ে...।’
সময়ের আলো/এনএ