আমরা সাধারণত মনে করি, ভালো স্মৃতি মানে সবকিছু নিখুঁতভাবে মনে রাখা। ভুলে যাওয়া যেন দুর্বলতার লক্ষণ। কিন্তু আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের মতে, বাস্তবতা ঠিক উল্টো। ভুলে যাওয়াই আমাদের মস্তিষ্ককে সচল, নমনীয় ও কার্যকর রাখে।
স্নায়ুবিজ্ঞানী চারান রঙ্গনাথ তার বই Why We Remember-এ বলছেন, স্মৃতি কেবল অতীতের ঘটনা জমা রাখার আলমারি নয়। বরং এই স্মৃতির মাধ্যমেই আমরা নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলি, অন্য মানুষকে বুঝি এবং পৃথিবীকে দেখি।
ভুল করেই শেখে মস্তিষ্ক
আমাদের স্মৃতি তৈরি হয় মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে সংযোগের মাধ্যমে। কিন্তু এই সংযোগগুলো সব সময় নিখুঁত হয় না। যখন আমরা কোনো তথ্য মনে করার চেষ্টা করি, তখন একটু-আধটু ভুল হয়ই। আর সেই ভুল থেকেই শেখে মস্তিষ্ক।
ভুল স্মৃতিকে বাস্তব তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে মস্তিষ্ক অপ্রয়োজনীয় সংযোগ দুর্বল করে দেয়, আর দরকারি সংযোগগুলোকে আরও শক্ত করে। তাই শুধু পড়া নয়, নিজে মনে করার চেষ্টা করাই শেখার সবচেয়ে ভালো উপায়। মানচিত্র দেখে রাস্তা মুখস্থ করার চেয়ে নিজে পথ খুঁজে গেলে যেমন রাস্তা বেশি মনে থাকে।
ভুলে যাওয়া কেন দরকার?
ভাবুন তো, যদি আমরা কিছুই ভুলে না যেতাম তবে কী হতো? মস্তিষ্ক ভরে যেত অপ্রয়োজনীয় তথ্যের জঞ্জালে। কোনটা দরকার, কোনটা নয় তা খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে যেত।
হোটেলে থাকার সময় যে ঘর নম্বর মনে রাখেন, দুসপ্তাহ পর সেটি মনে রাখার কোনো দরকার নেই। রাস্তায় দেখা অগণিত মানুষের মুখও মনে রাখার প্রয়োজন নেই। ভুলে যাওয়ার ক্ষমতাই আমাদের মস্তিষ্ককে হালকা রাখে।
যে কারণে বয়স বাড়লে ভুল বেশি হয়
বয়সের সঙ্গে স্মৃতি তৈরির ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে যায় এমন নয়। বরং আমরা যেগুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ সেগুলোর দিকে মনোযোগ কম দিতে শুরু করি। অপ্রয়োজনীয় তথ্য ঢুকে পড়ে ফলে দরকারি স্মৃতি চাপা পড়ে যায়।
স্মৃতি ভালো রাখতে যা করা যায়
স্নায়ুবিজ্ঞানীরা কয়েকটি সহজ কৌশলের কথা বলেন—
১. আলাদা করে ভাবা
যে স্মৃতির সঙ্গে রং, শব্দ, গন্ধ বা অনুভূতি জড়িয়ে থাকে, সেটাই বেশি দিন টিকে যায়।
২. গোছানো স্মৃতি
নতুন তথ্যকে পরিচিত কোনো বিষয় বা জায়গার সঙ্গে মিলিয়ে নিলে তা সহজে মনে থাকে।
৩. সংকেত তৈরি করা
কোনো গান শুনে হঠাৎ পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে এটাই সংকেতের কাজ। দৈনন্দিন কাজেও এমন সংকেত তৈরি করা যায়।
কেন ভুল স্মৃতি আসে?
আমরা সবকিছু আলাদা আলাদা করে মনে রাখি না। আগে থেকে জানা কিছু ছক বা ধারণার ভেতরেই নতুন অভিজ্ঞতা ঢুকিয়ে দিই। এতে স্মৃতি সহজ হয়, কিন্তু কখনো কখনো ভুল তথ্যও ঢুকে পড়ে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতি বদলায়ও। কল্পনা আর বাস্তবের সীমা ধীরে ধীরে মিশে যেতে পারে।
স্মৃতি একা নয়
আমরা যখন স্মৃতি অন্যের সঙ্গে ভাগ করি, তখন সেটিও বদলে যায়। গল্প বলতে বলতে, অন্যের প্রতিক্রিয়া শুনতে শুনতে স্মৃতি নতুন রূপ নেয়। অনেক সময় অন্যের বলা কথাও আমাদের নিজের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।
> রঙ্গনাথের মতে, নিখুঁত স্মৃতি আদর্শ নয়। বরং খানিকটা ভুল, খানিকটা ফাঁক এই অসম্পূর্ণতাই আমাদের মানুষ করে তোলে। ভুলে যাওয়া তাই কোনো দুর্বলতা নয়, বরং বুদ্ধিমত্তারই অংশ।
সময়ের আলো/এমএইচজে/