দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক মানচিত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এক অস্বস্তিকর অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদন সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ২০২৫ সালে যেখানে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে ২০২৬ সালে তা কমলেও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চই থাকবে; এমন পূর্বাভাস নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কারণ মূল্যস্ফীতি কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়; এটি সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নীরব চাপ, যা ধীরে ধীরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনমান ক্ষয়ে দেয়।
দৈনন্দিন বাজারে এখন ক্রমাগত এক ধরনের চাপা নীরবতা থাকে। আগের মতো দরদাম করে হাসাহাসি নেই, পরিচিত দোকানদারের সঙ্গে খোশগল্পও কমে গেছে। মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে, দাম শোনে, একটু থামে, তারপর অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে কম জিনিস কিনে ফিরে যায়। যেন বাজার নয়, প্রতিদিনই এক ধরনের অঘোষিত হিসাব-নিকাশের পরীক্ষা চলছে। এই দৃশ্য শুধু রাজধানীর নয়, জেলা শহর থেকে শুরু করে গ্রামের হাটেও একই রকম। কারণ গত তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশে আর কোনো সাময়িক অর্থনৈতিক শব্দ নয়; এটি মানুষের নিত্যদিনের জীবনের স্থায়ী বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ি ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তার আগের মাস নভেম্বরে ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ টানা দুই মাস মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। সংখ্যার হিসাবে এটি হয়তো বড় কোনো লাফ নয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব প্রবল। কারণ এখানে প্রশ্ন শুধু শতাংশের নয়; প্রশ্ন হলো মানুষের সংসার চলে কি না, মাস শেষে ধার করতে হয় কি না, কিংবা সন্তানের খাবারের থালায় কিছু কমে গেল কি না।
মূল্যস্ফীতির আলোচনা আমরা প্রায়ই অর্থনীতিবিদদের ভাষায় শুনি, যেখানে প্রসঙ্গ থাকে মুদ্রানীতি, রিজার্ভ, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় ইত্যাদি। কিন্তু এসব কিছুর শেষ গন্তব্য একটাই : মানুষের বাজারের থলে। আজকের বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি মানে শুধু চাল-ডালের দাম বাড়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডলারের দর, রেমিট্যান্সের উত্থান, রফতানি খাতের দুর্বলতা এবং অর্থনীতির টানাপড়েন।
ডলারের বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে যে নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে, তা মূল্যস্ফীতির আলোচনায় আলাদা গুরুত্ব পাওয়ার মতো। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ১৫টি ব্যাংক থেকে ২০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কিনেছে, প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৩০ পয়সা দরে। শুধু ২০২৬ সালে জানুয়ারির এই কদিনেই কেনা হয়েছে মোট ৩ হাজার ৭৫২ দশমিক ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর উদ্দেশ্যও পরিষ্কার; তা হলো ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানো এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা আনয়ন।
নীতিগতভাবে এটি একটি সাহসী ও সক্রিয় পদক্ষেপ। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশ ব্যাংক এমন খোলামেলা হস্তক্ষেপে যেত না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ডলার কেনার সুফল কি বাজারে পণ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে? এখনও সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে স্বস্তির ছাপ পাচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রেই মনে হচ্ছে, ডলারের দরে সাময়িক স্থিরতা এলেও ভোগ্যপণ্যের দামে তার প্রতিফলন আসতে সময় লাগছে বা আদৌ আসছে না।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। জানুয়ারির প্রথম সাত দিনেই দেশে এসেছে ৯০ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। একইদিনে ৭ জানুয়ারি, প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে এসেছে ১ হাজার ৭১৭ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা বছর ব্যবধানে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।
এর আগে ডিসেম্বর মাসে দেশে এসেছে ৩২২ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার, যা চলতি অর্থবছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং দেশের ইতিহাসে এক মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। পুরো ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স।
উল্লিখিত এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। কারণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে রেমিট্যান্স অনেক বড় ভূমিকা রাখে। রিজার্ভে স্বস্তি এলে ডলারের বাজার স্থিতিশীল হয়, আমদানিতে কিছুটা শ্বাস নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু এখানেই আসে বড় প্রশ্ন; রেমিট্যান্স বাড়লেও মূল্যস্ফীতি কেন কমছে না?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে তাকাতে হবে অর্থনীতির আরেকটি স্তম্ভের দিকে; আর তা হলো পণ্য রফতানি। যেখানে রেমিট্যান্স ইতিবাচক ধারায় আছে, সেখানে রফতানি খাত টানা পাঁচ মাস ধরে নেতিবাচক প্রবণতায়। সদ্য সমাপ্ত ডিসেম্বরে পণ্য রফতানি কমেছে ১৪ শতাংশ, যা গত দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পতন। এ মাসে রফতানি হয়েছে ৩৯৭ কোটি ডলারের পণ্য, যেখানে আগের অর্থবছরের একই মাসে হয়েছিল ৪৬২ কোটি ডলার।
দেশে রফতানি কমার এই প্রবণতা শুধু একটি মাস বা একটি খাতের গল্প নয়। আগস্ট মাস থেকে নভেম্বর পর্যন্ত টানা চার মাস তৈরি পোশাক খাতের রফতানি কমেছে। অথচ বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকেই। ফলে পোশাক খাতে সামান্য ধাক্কা লাগলেই পুরো রফতানি আয়ে তার প্রতিফলন দেখা যায়।
রফতানিকারকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে সে দেশের বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে, ফলে প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রয়াদেশ আসছে না। অন্যদিকে চীন ও ভারতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপের প্রভাবে ওই দুই দেশের উদ্যোক্তারা তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। এই প্রতিযোগিতার চাপ সরাসরি গিয়ে পড়ে কারখানার উৎপাদন, শ্রমিকের কর্মঘণ্টা এবং মজুরির ওপর।
একটি দেশের রফতানি কমে গেলে তার প্রভাব কেবল ডলার আয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। ডলার আয় কমলে আমদানিতে চাপ বাড়ে। কাঁচামাল, জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্য আমদানির খরচ বেড়ে যায়। সেই বাড়তি খরচ উৎপাদন পর্যায়ে যোগ হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাঁধে এসে পড়ে। এভাবেই রফতানি খাতের দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।
গত ডিসেম্বরে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ আর খাদ্যবহির্ভূত খাতে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ায় শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াতের মতো খাতে খরচ বেড়েছে। এই খরচগুলো এমন যে এড়িয়ে চলাও কঠিন। ফলে মানুষ অন্য জায়গায়, যেমনÑ খাবার বা সঞ্চয়ে কাটছাঁট করে।
এই বাস্তবতার প্রতিফলন পাওয়া যায় সাধারণ মানুষের কথায়। রাজধানীর মিরপুরের এক রিকশাচালক আবদুল আজিজ বলেন, ‘আগে দিনে যা আয় হতো, তাতে তিনবেলা খাওয়া-পরা কোনোমতে চলে যেত। এখন একই আয় দিয়ে দুই বেলা টেনেটুনে খাওয়াই মুশকিল। মাঝেমধ্যে তো ধারদেনাও করতে হয়।’
কদিন আগেই রাজধানীর শ্যামলীর একটি বাজারে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী নাসির উদ্দীনের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘আগে মাসের বাজারে ৮-৯ হাজার টাকায় মোটামুটি চলত। এখন ১২ হাজার টাকাতেও কুলায় না। বাচ্চাদের পড়াশোনা, বাসা ভাড়া, যাতায়াত- সব মিলিয়ে সঞ্চয়ের কথা ভাবাই যায় না। নিজের চিকিৎসাটাও দিনদিন পিছিয়ে দিচ্ছি।’ গ্রামাঞ্চলেও মূল্যস্ফীতির চাপ স্পষ্ট। পাবনার এক কৃষিশ্রমিক লুৎফর রহমান বললেন, ‘মজুরি দিনে ৫০০ টাকা, কিন্তু বাজারে সেই টাকার দাম আর আগের মতো নেই। চাল কিনতেই অর্ধেক টাকা চলে যায়। মাছ-মাংস তো এখন বিলাসিতা।’
মধ্যবিত্তের গল্পও খুব আলাদা নয়। সিলেটের হবিগঞ্জ সদরে গৃহিণী রাশেদা বেগম জানান, আগে সপ্তাহে এক দিন মাছ কিনতাম, এখন দুই সপ্তাহে একবার কিনলেও ভাবতে হয়। বাচ্চাদের দুধ-ডিম সব কমিয়ে দিতে হচ্ছে। এই কমিয়ে দেওয়াই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে নির্মম দিক, যা মানুষের পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের ওপর নীরবে প্রভাব ফেলে। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে এভাবেই এর সামাজিক প্রভাব গভীর হয়। পুষ্টিহীনতা বাড়ে, শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার ঝুুঁকি বাড়ে। চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এসব ক্ষতি কোনো বাজেট বক্তৃতায় ধরা পড়ে না, কিন্তু সমাজের ভেতরে নীরবে জমতে থাকে।
এ পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া। শুধু ডলার কেনা বা সুদের হার বাড়ানো দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, সিন্ডিকেট ভাঙা, কৃষিপণ্যের সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করা ইত্যাদি জায়গায় কার্যকর নজরদারি দরকার। একই সঙ্গে রফতানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করতে না পারলে ভবিষ্যতেও একই সংকট ফিরে ফিরে আসবে।
এ ছাড়া রেমিট্যান্স অবশ্যই আশার জায়গা। কিন্তু শুধু প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে একটি অর্থনীতি টেকসই হতে পারে না। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে সামান্য পরিবর্তন এলেই রেমিট্যান্সে ধাক্কা লাগতে পারে। তাই রফতানি, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও কর্মসংস্থান- এই তিনটি স্তম্ভকে একত্রে শক্তিশালী করাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, মূল্যস্ফীতি এখন আর কোনো সাময়িক ঝড় নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী চাপ। রেমিট্যান্সের সুখবর মানুষকে সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু বাজারে ঢুকলেই বা সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করলেই সেই স্বস্তি উবে যায়। অর্থনৈতিক নীতির সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষ বাজারে গিয়ে হিসাব করতে গিয়ে ভয় পাবে না; যখন মাস শেষে ধার নয়, সঞ্চয়ের কথা ভাবতে পারবে। দেশের অর্থনীতি যদি সত্যিই মানুষের জন্য হয়, তবে মানুষের এই নীরব দীর্ঘশ্বাসই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়