একবিংশ শতকে বিশ্ব
অর্থনীতির নতুন দর্শন হলো ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক
ট্রাইব্যুনালের রায়ের ফলে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার বিশাল
সমুদ্রসীমা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নীল সম্পদের এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ
করেছে। মৎস্য, খনিজ, জ্বালানি ও পর্যটনের মতো খাতগুলো জাতীয় অর্থনীতিতে
বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনা সরাসরি
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এই
অঞ্চলে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো প্রধান শক্তিগুলোর কৌশলগত
প্রতিযোগিতা বঙ্গোপসাগরের স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এমন
প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য জাতীয় সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে নীল
অর্থনীতির বিকাশ নিশ্চিত করা এক জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হলো-
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বিদ্যমান এই শক্তি-প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিরাপত্তার
চাপ মোকাবিলায় বাংলাদেশ তার নীল সম্পদ রক্ষা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কতটা
প্রস্তুত? ব্লু ইকোনমি কেবল সম্পদ আহরণের বিষয় নয়, এটি দেশের সামগ্রিক
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম অবলম্বন। বাংলাদেশের অর্থনীতি
এখনও মূলত কৃষিনির্ভর এবং সীমিত স্থল সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। এই
প্রেক্ষাপটে, সমুদ্রের অনাবিষ্কৃত সম্পদ দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় নতুন
দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
মৎস্য সম্পদ বর্তমানে জিডিপিতে প্রায় ৩.৫
শতাংশ অবদান রাখলেও, তেল-গ্যাস, মূল্যবান খনিজ বালি ও সামুদ্রিক পর্যটনের
মাধ্যমে এই হার বহুগুণ বৃদ্ধি করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের
তলদেশে গ্যাস হাইড্রেট বা মিথেন গ্যাসের যে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, তা
ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন ভরসা হতে পারে।
অতএব,
মেরিটাইম স্বার্থ সংরক্ষণ বলতে কেবল সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নয়, এটি খাদ্য,
জ্বালানি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে জাতীয় আকাক্সক্ষার সঙ্গেও
গভীরভাবে যুক্ত। এই বিশাল স্বার্থ যখন বৈশ্বিক কৌশলগত অঞ্চলের কেন্দ্রে
অবস্থান করছে, তখন একে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ইন্দো-প্যাসিফিক
অঞ্চলে শক্তির প্রতিযোগিতা দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এই অঞ্চলটি বিশ্বের মোট
সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের প্রবেশপথ। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত
অবস্থান এই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করেছে। চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড
ইনিশিয়েটিভ’ ও অন্যান্য মেরিটাইম উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণার
মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এই প্রতিযোগিতা
বাংলাদেশের জন্য এক জটিল কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ বিদেশি ট্রলার
কর্তৃক বাংলাদেশের জলসীমা থেকে অবৈধভাবে মৎস্য সম্পদ আহরণ দেশের
মৎস্যজীবীদের জীবন ও জীবিকাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সমুদ্রের পানির
উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক
দুর্যোগ ব্লু ইকোনমির টেকসই বিকাশে বড় প্রতিবন্ধকতা। বিভিন্ন পরাশক্তির
কাছ থেকে সামরিক ও অর্থনৈতিক জোটে যোগ দেওয়ার চাপ বাংলাদেশের ‘সবার সঙ্গে
বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ পররাষ্ট্রনীতিকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা কঠিন
করে তুলছে।
প্রথমত নৌবাহিনীকে আধুনিক ও ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে
গড়ে তোলার উদ্যোগ বাস্তবায়নাধীন। সাবমেরিন সংযোজন, নতুন ফ্রিগেট ও করভেট
ক্রয় এবং মেরিটাইম ডোমেইন অ্যাওয়ারনেস সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সমুদ্র
নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে। এতে অনুপ্রবেশ, জলদস্যুতা ও মৎস্য চুরি
নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এই সক্ষমতা কেবল সার্বভৌমত্ব রক্ষাই নয়, বরং সমুদ্রপথে
নিরাপদ বাণিজ্য নিশ্চিত করছে।
দ্বিতীয়ত বাংলাদেশ কূটনৈতিক
ভারসাম্যের নীতিতে অটল থেকে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’-
এই মূলনীতি অনুসরণ করছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট
করেছে যে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হবে না, বরং অর্থনৈতিক
অংশীদারত্ব ও আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতেই জোর দেবে। চীন, ভারত, জাপান,
যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে
বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যাতে কোনো একক শক্তির ওপর
নির্ভরতা তৈরি না হয়।
তৃতীয়ত সরকার ইতিমধ্যে ব্লু ইকোনমি
বাস্তবায়নের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছে। এর আওতায় গভীর সমুদ্রের মৎস্য
আহরণ, সামুদ্রিক অ্যাকোয়াকালচার, উপকূলীয় পর্যটন অবকাঠামো ও অফশোর
নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হচ্ছে।
পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেরিটাইম স্টাডিজ বিভাগ স্থাপন করে গবেষণা ও
দক্ষ মানব সম্পদ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুতরাং সমুদ্রভিত্তিক
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ এখন একটি সমন্বিত ও দূরদর্শী প্রস্তুতি
নিয়েছে, যেখানে প্রতিরক্ষা, কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা একে অপরের
পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশের এই প্রস্তুতিকে আরও কার্যকর ও
টেকসই করতে কিছু কৌশলগত পদক্ষেপ জরুরি- সমুদ্রের তলদেশের সম্পদ (বিশেষত
গ্যাস হাইড্রেট ও খনিজ বালি) ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে দেশীয় গবেষণা সক্ষমতা
বাড়াতে হবে। বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ
উদ্যোগ অপরিহার্য।
মহাসাগর বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনা বয়ে
এনেছে, তবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির পরিবর্তনশীল ভারসাম্য আমাদের
সামনে এনেছে জটিল ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায়, নীল অর্থনীতিকে
সুরক্ষিত ও বিকশিত করার একমাত্র পথ হলো বিচক্ষণ কূটনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর
মেরিটাইম নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
‘সাগর বিজয়’ এখন ‘সাগর সুরক্ষা’
এবং ‘মেরিটাইম স্বার্থ সংরক্ষণ’-এর এক বৃহত্তর জাতীয় দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।
এই সংগ্রামে সফল হতে হলে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি অর্থনীতিবিদ, বিজ্ঞানী,
কূটনীতিক ও সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। এই সুসংহত
প্রয়াসই ইন্দো-প্যাসিফিকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমি
স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে এবং দেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।
লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ
সময়ের আলো/এসকে/