একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তি, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি শুধু মূলধন প্রবাহের উৎস নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযোগের অন্যতম সেতু। বাংলাদেশ গত এক দশকে মোট দেশজ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও সেই অনুপাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, ভারত তো বটেই, এমনকি তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশ মালদ্বীপ এবং শ্রীলঙ্কাও বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে। এই বৈপরীত্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুণগত দিক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে এবং বিনিয়োগ পরিবেশের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বছরে গড়ে মাত্র ২.৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে। এই সময়ে অর্থনীতির আকার বেড়েছে, রফতানি আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, অবকাঠামো উন্নয়নের নানা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, কিন্তু বিনিয়োগ প্রবাহ সেই হারে বাড়েনি। ২০২৩ সালে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নেমে আসে তিন বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় চৌদ্দ শতাংশ কম। আরও উদ্বেগজনক হলো, ২০১৮ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে নিট বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ সামগ্রিকভাবে প্রায় ৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি নেতিবাচক সংকেত।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আরও গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। গত কয়েক মাসে কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকেই বকেয়া প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ কমে গেছে। বিনিয়োগকারীরা মূলধন প্রত্যাহার বা পুনর্বিন্যাসের পথে হাঁটছেন, যা আস্থার সংকটেরই প্রতিফলন। যদিও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় উনিশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১.৬৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে সরকারি সংস্থাগুলো দাবি করছে, তবু গভীরে তাকালে দেখা যায় এই প্রবৃদ্ধির গুণগত মান প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ এই অর্থের বড় অংশই এসেছে পুনঃবিনিয়োগকৃত মুনাফা এবং বিদ্যমান কোম্পানির আন্তঃঋণ থেকে, নতুন বিনিয়োগকারীদের সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্রটি উঠে আসে ইকুইটি মূলধনের প্রবাহে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইকুইটি মূলধন প্রায় সতেরো শতাংশ কমে গেছে। এই মূলধনই নতুন কারখানা স্থাপন, শিল্প সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি হালনাগাদ এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি। যখন এই অংশটি সংকুচিত হয়, তখন বোঝা যায় নতুন বিনিয়োগকারীরা প্রবেশ করতে আগ্রহী নন। মোট বিনিয়োগ সামান্য বাড়লেও ইকুইটি মূলধনের এই পতন মূলত বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতার প্রতিফলন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে কাঠামোগত সমস্যাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্পসংস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাণিজ্য সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, অপ্রতুল অবকাঠামো, জটিল নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং বিনিয়োগ-পরবর্তী সেবার অভাব বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ মানব সম্পদ, আধুনিক আর্থিক বাজার এবং স্বচ্ছ কর ব্যবস্থার ঘাটতিও একটি বড় বাধা। বিনিয়োগকারীরা শুধু বাজারের আকার দেখেন না, তারা দেখেন ঝুঁকি, লাভের স্থায়িত্ব এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতি ও নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের অন্যতম বড় দুর্বলতা। হঠাৎ করে নীতিমালা পরিবর্তন, অনুমোদন পেতে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কঠিন করে তোলে। বন্দর ব্যবস্থাপনা, পণ্য পরিবহন এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে দীর্ঘ সময় লাগায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বড় বাধা। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেখানে একক জানালা সেবা ও দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনও বহু ধাপের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় আটকে আছে।
২০২৪ সালেও অর্থনীতিতে স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে মুদ্রার অবমূল্যায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে। অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী এই সময়ে অপেক্ষা করো এবং দেখ নীতি গ্রহণ করেন। দেশের ঋণমান কমে যাওয়া এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ মহলে নেতিবাচক বার্তা দেয়। ২০২৫ সালের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই অনিশ্চয়তার প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
বহুজাতিক কোম্পানির কর্মকর্তারা বারবার অভিযোগ করেছেন যে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক আচরণ বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনুমোদন, সংযোগ কিংবা নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় অঘোষিত অর্থ দাবি একটি নীরব বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজির অভিযোগও নতুন নয়। কিন্তু বিদেশি কোম্পানির জন্য এসব অনানুষ্ঠানিক লেনদেন শুধু আইনগত ঝুঁকিই নয়, বরং তাদের বৈশ্বিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে প্রবেশের আগেই বিকল্প গন্তব্য খুঁজে নেন।
আধুনিক বিদেশি বিনিয়োগের একটি বড় অংশ এখন উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে একটি বড় ধরনের দক্ষতা-ব্যবধান বিদ্যমান। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন উন্নত প্রযুক্তির কারখানা স্থাপন করতে চান, তখন তারা স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন প্রকৌশলী বা দক্ষ টেকনিশিয়ান খুঁজে পান না। ফলে তাদের উচ্চ বেতনে বিদেশ থেকে জনবল আনতে হয়, যা প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রম তৈরি না করলে কেবল সস্তা শ্রমের দোহাই দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে মানসম্পন্ন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে না।
কর নীতির অস্থিরতাও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন যে কর আইন ও বিধিমালা ঘন ঘন পরিবর্তিত হয় এবং পূর্বাভাসের সুযোগ কম। কর নির্ধারণে স্বচ্ছতা ও ধারাবাহিকতার অভাব বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আইনি নিরাপত্তা এবং দ্রুত বিচার ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে কোনো বাণিজ্যিক বিরোধ দেখা দিলে তা নিরসনে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়, যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আতঙ্কের কারণ। আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ এবং দেওয়ানি আদালতগুলোর ধীরগতি বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একজন বিনিয়োগকারী যখন দেখেন যে তার মেধাস্বত্ব বা চুক্তির আইনি সুরক্ষা পেতে দীর্ঘ আইনি লড়াই করতে হবে, তখন তিনি বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে যান। তাই বিনিয়োগবান্ধব বিশেষ আদালত গঠন এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
শিল্পায়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিশ্চয়তা। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ালেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং গ্যাসের সংকটে অনেক বিদেশি কোম্পানি তাদের পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। শিল্পাঞ্চলগুলোতে লোডশেডিং এবং লো-ভোল্টেজের সমস্যা যন্ত্রপাতির ক্ষতি করে এবং উৎপাদন সূচি ব্যাহত করে। এ ছাড়া জ্বালানির দামের ঘন ঘন পরিবর্তন উৎপাদন ব্যয় সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন করে তোলে।
সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে। বিদেশি কোম্পানিগুলো তাদের অর্জিত মুনাফা বা লভ্যাংশ নিজ দেশে পাঠাতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। যখন কোনো বহুজাতিক কোম্পানি তাদের লাভ বিদেশে নিতে পারে না, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় এবং নতুন বিনিয়োগকারীরা প্রবেশের সাহস হারান। মুদ্রার বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা আনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের প্রক্রিয়া সহজ না করলে বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে গণ্য করতে থাকবেন।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু কম মজুরি নয়, বরং দক্ষতা, প্রযুক্তি অবকাঠামো, ডিজিটাল সংযোগ এবং সবুজ শিল্পনীতির দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। বাংলাদেশ এই রূপান্তরের সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ থাকলেও নীতিগত প্রস্তুতির অভাব সেই সম্ভাবনাকে সীমিত করছে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। নীতি প্রণয়নের সময় শিল্প খাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগকারীদের মতামত গুরুত্ব পেতে হবে। শুধু প্রচার নয়, বাস্তব সংস্কারই বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যেসব দেশ ধারাবাহিক সংস্কার করেছে, তারাই বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশকেও সেই পথেই হাঁটতে হবে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ কোনো একক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণার ফল নয়, এটি দীর্ঘদিনের আস্থা, স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনের সমষ্টিগত ফলাফল। বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার অভাব নেই, আছে বিশাল বাজার, তরুণ জনশক্তি এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে নীতিগত সাহস, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের প্রতি বিশ্বাসযোগ্য আচরণ জরুরি। অন্যথায়, প্রবৃদ্ধির গল্প কেবল সংখ্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তব শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের রূপ নেবে না।
এএডি/