রাষ্ট্রের তিন সংকট রাজনৈতিক নীরবতা

মো. শাহিন আলম, শিক্ষার্থী

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সভা-সমাবেশ, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও ক্ষমতার

2026-01-18T00:12:42+00:00
2026-01-18T00:12:42+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
রাষ্ট্রের তিন সংকট রাজনৈতিক নীরবতা
মো. শাহিন আলম, শিক্ষার্থী
প্রকাশ: রোববার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:১২ এএম 
ফাইল ছবি
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সভা-সমাবেশ, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের ভিড়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে, রাষ্ট্রের সবচেয়ে গভীর তিন সংকট তথা দুর্নীতি, বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর আদৌ কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ আছে, নাকি এবারের নির্বাচনও জনগণের এই মৌলিক সংকটগুলোকে পাশ কাটিয়েই পার হয়ে যাবে?

সংকটের কেন্দ্র নিয়ে যদি আলোচনায় আসি, তা হলে প্রথমেই বলতে হয় দুর্নীতি নিয়ে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের করাপশন পারসেপশন ইনডেক্স ২০২৪ অনুযায়ী বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১তম অবস্থানে রয়েছে এবং স্কোর মাত্র ২৩, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই সূচক কেবল আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ইঙ্গিত নয়; বরং এটি দেখায় যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের শাসন কার্যকরভাবে কাজ করছে না। বিশ্বব্যাংকের গভর্ন্যান্স সূচকেও বাংলাদেশের ‘রুল অব ল’ ও ‘কন্ট্রোল অব করাপশন’ সূচক দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের নিচে অবস্থান করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর। উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যাংকিং খাত, নিয়োগ ব্যবস্থা সব খানেই দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। যদিও রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা বলে কিন্তু কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রশ্নে তাদের নীরবতা থাকে চোখে পড়ার মতো। কিন্তু দুর্নীতিবিরোধী বক্তৃতা আর দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্র তো এক বিষয় নয়। যতদিন দুর্নীতি দমন কমিশন, নিয়োগ ব্যবস্থা ও বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হবে, ততদিন দুর্নীতি সূচকে উন্নতি ঘটবে না, বরং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থাই ক্রমাগত ক্ষয়ে যেতে থাকবে।

দুর্নীতির এই প্রাতিষ্ঠানিক বিস্তারের সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিণতি হলো বিনিয়োগ পরিবেশের ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন নীতিনির্ধারণী স্বচ্ছতা ও আইনি সুরক্ষা নিয়ে সন্দিহান থাকে, তখন শিল্পায়ন মন্থর হয়ে পড়ে। এর ফল ভোগ করে শ্রমবাজার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি এবং বেকারত্বের হার প্রায় ৪.৪৮ শতাংশ। তবে এই গড় পরিসংখ্যানের আড়ালে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো শিক্ষিত বেকারত্ব। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ থেকে ১৪ শতাংশের কাছাকাছি, যা একটি ‘জবলেস গ্রোথ’-এর স্পষ্ট লক্ষণ। অর্থাৎ অর্থনীতি আকারে বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। যেখানে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া রফতানিনির্ভর শিল্পায়নের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে পেরেছে, সেখানে বাংলাদেশে শিল্পায়নের বড় অংশ এখনও কম কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে সীমাবদ্ধ। শিল্পায়নের গুণগত দুর্বলতা, দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্য এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতে কাঠামোগত সহায়তার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু কোন খাতে কী পরিমাণ বিনিয়োগে এবং কত বছরে কত চাকরি দেবে এ ধরনের পরিমাপযোগ্য ও সময়নির্দিষ্ট পরিকল্পনা খুব কমই সামনে আসে। ফলে বেকারত্ব ধীরে ধীরে একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের উৎসে পরিণত হচ্ছে।

এই গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটে দ্রব্যমূল্যের বাজারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে অবস্থান করেছে, যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বহু সময় ১০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় যেভাবে বাড়ছে, তার তুলনায় ব্যয়ের চাপ অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার প্রায়শই বৈশ্বিক বাজার, যুদ্ধ পরিস্থিতি বা ডলার সংকটকে মূল্যস্ফীতির কারণ হিসেবে তুলে ধরলেও অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সিন্ডিকেট সংস্কৃতি, মজুদদারি ও প্রতিযোগিতা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রশ্নে কার্যকর রাজনৈতিক উদ্যোগ খুব একটা দৃশ্যমান নয়। গবেষণা বলছে, দুর্নীতি যখন বাজার তদারকি ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে, তখন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। দুর্নীতি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করে, বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়, আর কর্মসংস্থান সংকুচিত হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে দ্রব্যমূল্যের চাপ আরও অসহনীয় হয়ে ওঠে। এই দুষ্টচক্রই আজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার মূল বৈশিষ্ট্য।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক নীরবতা সবচেয়ে উদ্বেগজনক। এখানে নীরবতা বলতে বক্তব্যের অনুপস্থিতি নয়, বরং বাস্তবসম্মত নীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের অভাবই মূল কথা। যদিও আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে এসেছে, কিন্তু দুর্নীতি দমনে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বেকারত্ব কমাতে খাতভিত্তিক কর্মসংস্থান পরিকল্পনা এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি বাজার সংস্কারের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ রাজনৈতিক আলোচনায় খুব কমই উঠে আসছে বরং প্রতিপক্ষকে দোষারোপ ও অতীত সাফল্যের বয়ানই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। তবে সাধারণ জনগণ কেবল প্রতিশ্রুতিই শুনতে চায় না; তারা জানতে চায় কোন দল কী করবে, কখন করবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় করবে। যদিও ভোটাররা এখন আগের চেয়ে যথেষ্ট সচেতন; তারা জানে একজন সৎ ও দক্ষ জনপ্রতিনিধি পুরো এলাকার চেহারা বদলে দিতে পারেন। তা ছাড়া তরুণ ভোটারদের বড় একটি অংশ এবার বেশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছে, যাদের কাছে স্লোগানের চেয়ে কর্মসংস্থান, ন্যায্যতা ও সংস্কারের বয়ানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সুতারাং যে রাজনৈতিক দল এসব সংকটের টেকসই রোডম্যাপ দিতে পারবে কিংবা পারছে জনগণের আস্থা স্বাভাবিকভাবে সেদিকেই যাবে। ছাত্র-জনতার সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর মানুষের মনোজগতে যে পরিবর্তন এসেছে, রাজনৈতিক দলগুলোকে সেটি উপলব্ধি করতে হবে। তাদের নীতি-পরিকল্পনায় পরিবর্তনটা ধারণ করতে হবে। বুঝতে হবে যেনতেনভাবে একটা নির্বাচনই শেষ কথা নয়। রাষ্ট্র যদি উপর্যুক্ত তিন সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল হিসেবেই সীমিত থাকবে। সাধারণ জনগণ ও তরুণ ভোটারদের বাস্তব চ্যালেঞ্জ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায্যতা তখন অপরিবর্তিত থাকবে এবং এসব সংকটের চাপের মিলিত প্রভাব সমাজে হতাশা ও অস্থিরতা আরও বাড়াবে। তাই রাজনৈতিক দলগুলোকে বাস্তবসম্মত নীতি ও পরিমাপযোগ্য রোডম্যাপসহ সংস্কারের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। 



Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: