সংগৃহীত ছবিভারতীয় সুতা আমদানির লাগাম টানার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ জন্য প্রতিবেশী দেশটি থেকে কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
দেশের স্পিনিং মিল মালিকরাও চান না এ সুবিধা আর বহাল থাকুক। মিল মালিকদের দাবির সঙ্গে একমত জানয়েছে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও (বিটিটিসি)।
সব দিক বিবেচনা করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এনবিআরকে ওই চিঠি দেয়। যাতে ভারত থেকে কম দামে নিম্ন মানের সুতা বাংলাদেশে আসা বন্ধ হয়। কারণ নিম্নমানের ভারতীয় সুতার প্রভাবে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে দেশীয় বস্ত্রকলগুলো।
এদিকে সরকারের এ সিদ্ধান্তের চরম বিরোধিতা করছেন তৈরি পোশাক রফতানিকারকরা। কারণ বন্ড সুবিধায় ভারত থেকে কম দামে সুতা আমদানি করে তারা পোশাক রফতানি করেন। এই বন্ড সুবিধার সুতা আমদানি বন্ধ হলে তারা ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে মনে করছেন।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান জানিয়ে এবং ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরে পোশাক রফতানিকারকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ আজ সোমবার এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে।
জানা যায়, রফতানিমুখী পোশাক খাতকে উৎসাহিত করতে ও প্রতিযোগিতা সক্ষম রাখতে আশির দশক থেকে সুতা আমদানিতে বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার। তবে বন্ড সুবিধা থাকবে কি থাকবে না এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ১২ জানুয়ারি এনবিআরকে চিঠি দিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অবশ্য সব ধরনের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার চায়নি, চেয়েছে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতার ওপর। বন্ডের আওতায় এ দুই ধরনের সুতাই বেশি আমদানি হয়ে থাকে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) প্রথমে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ও পরে ২৯ ডিসেম্বর দুই দফা আবেদন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে বিটিটিসি, যা সংস্থাটি গত ৬ জানুয়ারি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছে।
এনবিআরকে পাঠানো চিঠিতে এ কথাও উল্লেখ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অবশ্য এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠির বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ করছি। সব দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, দেশের যে ৮৪ শতাংশ রফতানি আয় আসে বস্ত্র ও পোশাক খাত থেকে, তার ৫৫ শতাংশ অবদান নিট পোশাকের। নিট পোশাকের অন্যতম কাঁচামাল হচ্ছে এই ১০ থেকে ৩০ কাউন্ট সুতা, যা আমদানি করা হয় মূলত প্রতিবেশী দেশ (ভারত) থেকে।
বিটিএমএ বলছে, দেশে এক কেজি সুতার উৎপাদন খরচ ৩ ডলার। অন্যদিকে একই মানের সুতা ভারত উৎপাদন করে ২ ডলার ৮৫ সেন্ট থেকে ৯০ সেন্টে। ভারত সেই সুতা বাংলাদেশে এখন ২ দশমিক ৫ ডলারে রফতানি করছে।
কাউন্ট কী : সুতার সূক্ষ্মতা বোঝাতে ‘কাউন্ট’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। কোন সুতা কতটা হালকা বা ভারী, তা বোঝা যায় ওই সুতা কত কাউন্টের তা দিয়ে। কাউন্ট নম্বর বেশি হলে সুতা চিকন হবে, আর কাউন্ট নম্বর কম হলে সুতা হবে মোটা।
বন্ড সুবিধা কেন : রফতানিমুখী পোশাকশিল্পকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখতে সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা দেয় বাংলাদেশ। এ ব্যবস্থায় শুল্ক ও কর ছাড় পেয়ে কম খরচে কাঁচামাল আনতে পারেন উদ্যোক্তারা, যা উৎপাদন ব্যয় কমায় এবং রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। আমদানি করা সুতা দিয়ে তৈরি পণ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রফতানি করতে হয়। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত বন্ডেড গুদামে সুতা সংরক্ষণ করা যায়।
দেশি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত কীভাবে : বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এনবিআরকে জানিয়েছে, বন্ড সুবিধায় সুতার আমদানি দুই অর্থবছরে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ফলে কমে গেছে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত সুতার বিক্রি। দেশীয় সুতা কারখানাগুলো বর্তমানে তাদের উৎপাদন ক্ষমতার ৬০ শতাংশ সুতা উৎপাদন করছে। তবে আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে ৫০টি কারখানা। বিদ্যমান ধারা অব্যাহত থাকলে চালু কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে বলে উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা।
চালু কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাবও এনবিআরের কাছে তুলে ধরেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয় বলেছে, এতে নিকট ভবিষ্যতে নিট পোশাক উৎপাদনকারী কারখানাগুলো আমদানি করা সুতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এর প্রভাবে দেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে, লিড টাইম বাড়বে, মূল্য সংযোজনের পরিমাণ কমবে ও কমবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ।
বিটিএমএর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির সদস্য ১ হাজার ৮৬৯, যার মধ্যে সুতা উৎপাদনকারী সদস্য ৫২৭। প্রাথমিক বস্ত্র খাতে তাদের বিনিয়োগ ২ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসেবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এ বিনিয়োগের বর্তমান বাজারদর প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান ১৩ শতাংশের বেশি।
মূল্য সংযোজন লাগবে ৪০ শতাংশ : চলতি ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে এ কথা উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়েছে, উত্তরণের পর বাংলাদেশি পণ্যের প্রধান রফতানি গন্তব্যস্থলগুলো থেকে শুল্ক-সুবিধা একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর বন্ধ হয়ে যাবে। প্রধান গন্তব্যগুলো হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ইত্যাদি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এনবিআরকে জানিয়েছে, শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে গেলে রফতানি পণ্যের উৎপাদন খাতে মূল্য সংযোজনের হার হতে হবে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের বেশি। ক্ষেত্রবিশেষে দ্বি-স্তরবিশিষ্ট মূল্য সংযোজনও (প্রথমে একটি রূপান্তর, পরে তার ওপর আরেকটি রূপান্তর) করতে হবে।
আর অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য-সুবিধা (জিএসপি) প্লাস সুবিধা পেতে গেলেও মূল্য সংযোজনের দরকার পড়বে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ। এসব বিবেচনায় নিট পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আমদানি করা সুতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে ভবিষ্যতে রফতানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়বে।
গত ২৮ ডিসেম্বর গুলশান ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিটিএমএ জানিয়েছিল, ৫০টি কল বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে বস্ত্রকলগুলোয় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত। চলতি অর্থবছরের বাজেটে একদিকে বস্ত্রশিল্পের প্রধান কাঁচামাল তুলা আমদানিতে শুল্ক বসিয়েছে, অন্যদিকে করপোরেট কর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭ শতাংশ করেছে। এ ছাড়া নগদ সহায়তা ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে করেছে ১ দশমিক ৫ শতাংশ। অথচ ভারত নানাভাবে এ খাতকে প্রণোদনা দিয়ে উজ্জীবিত রেখেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে যা বলা আছে : গত ১২ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেল-২ থেকে এক চিঠিতে এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) আহ্বানের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে শিল্পের সুরক্ষা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কাস্টমস ট্যারিফের এইচএস হেডিং ৫২.০৫, ৫২.০৬ ও ৫২.০৭-এর আওতায় ১০ ও ৩০ কাউন্টের সুতায় বন্ড সুবিধা থাকায় গত কয়েক বছরে আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসব এইচএস হেডিংয়ের আওতায় সুতা আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৬ হাজার মেট্রিকটন, যার মূল্য ছিল প্রায় ১ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪১ হাজার মেট্রিকটনে এবং মূল্য ছাড়িয়ে যায় প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দিকের প্রবণতাও ঊর্ধ্বমুখী, যেখানে আমদানির পরিমাণ ও মূল্য দুটিই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বন্ড সুবিধা বন্ধের ব্যাখ্যায় চিঠিতে বলা হয়েছে, বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কে আমদানি করা নিম্ন কাউন্টের সুতা দেশীয় বাজারে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে, ফলে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। বর্তমানে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে তারা মাত্র ৬০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করে উৎপাদন চালাচ্ছে, যা শিল্পটির আর্থিক টেকসই অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, মনে করে বন্ড সুবিধা অব্যাহত থাকলে দেশীয় শিল্পে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে এবং উৎপাদন ব্যয় ও লিড টাইম বেড়ে যাওয়ার কারণে রফতানি খাতের সামগ্রিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পাবে। বিপরীতে নিম্ন কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে দেশীয় স্পিনিং শিল্পে ভারসাম্য ফিরে আসবে, স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সুরক্ষিত হবে।
কী বলছেন পোশাক শিল্প মালিকরা : এ বিষয়ে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহ-সভাপতি মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ভারতীয় সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে দেশটির সরকার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে নিতে পারে। তাতে উভয় দেশের সম্পর্কের আরও অবনতির আশঙ্কা আছে। ইতিমধ্যে আমরা স্থলপথে সুতা আমদানি বন্ধ করলেও লাভ হয়নি। উল্টো ভারতীয় সুতা আমদানি বেড়েছে।
মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী আরও বলেন, বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা ১৫-১৬ শতাংশ কমে গেছে। টি-শার্ট উৎপাদনে দেড় ডলার খরচ হলেও বিদেশি ক্রেতারা সেই দাম দিতে চাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন উৎস থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে কাঁচামাল আমদানি করে টিকে আছি। সেই সুযোগ বন্ধ হলে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।
তার প্রশ্ন, তখন কার কাছে সুতা বিক্রি করবে দেশীয় স্পিনিং মিল। ফলে পরিস্থিতি সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে বিটিএমএর সহ-সভাপতি মো. শামীম ইসলাম বলেন, ‘সরকার যদি সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করে, তা হলে বস্ত্র খাত কিছুটা নিষ্কৃতি পাবে। সাধারণত ভারতের সঙ্গে প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে ১০ থেকে ১৫ সেন্টের ব্যবধান থাকে। এ ব্যবধান এখন হয়ে গেছে ৫০ সেন্ট। আমরা চাই আপাতত বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার হোক। সরকার চাইলে পরে আবার পর্যালোচনা করতে পারে।’
সময়ের আলো/এআর