ব্যাংকার সুজনের ছাদবাগানের গল্প

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

শহরে থাকতে থাকতে আমরা অনেকে টেরই পাই না, ধীরে ধীরে প্রকৃতি আমাদের জীবন থেকে সরে যাচ্ছে। চারদিকে কংক্রিটের দেয়াল, লোহার

2026-01-20T03:40:25+00:00
2026-01-20T03:40:25+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬,
২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
ব্যাংকার সুজনের ছাদবাগানের গল্প
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:৪০ এএম   (ভিজিট : ২৯৩)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
শহরে থাকতে থাকতে আমরা অনেকে টেরই পাই না, ধীরে ধীরে প্রকৃতি আমাদের জীবন থেকে সরে যাচ্ছে। চারদিকে কংক্রিটের দেয়াল, লোহার গ্রিল আর যান্ত্রিক ব্যস্ততায় ভরা এক জীবন, যেখানে খোলা আকাশ বা সবুজের জন্য জায়গা দিন দিন কমে আসছে। 

এ বাস্তবতার মধ্যেই রাজশাহীর সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা আহমুদুর রহমান সুজন নিজের ছাদে একটি বাগান গড়ে তুলেছেন। তার এই উদ্যোগ দেখায়, শহরে থেকেও প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব। ইচ্ছে আর যত্ন থাকলে কংক্রিটের শহরেও সবুজ জায়গা তৈরি করা যায়।

আমরা প্রায়ই দেখি, শহরের ছাদ বলতে বোঝায় অব্যবহৃত জায়গা বা অগোছালো একটি স্টোররুম। খুব কম মানুষই ভাবেন এ ছাদ থেকেই খাবার উৎপাদন হতে পারে, মানসিক স্বস্তি মিলতে পারে কিংবা পরিবেশের জন্যও ভালো কিছু করা সম্ভব। সুজন ঠিক সেই অল্পসংখ্যক মানুষের একজন, যিনি ছাদকে দেখেছেন ভিন্ন চোখে। 

রাজশাহী শহরের কয়েরদাড়া এলাকায়, সেনানিবাসের কাছেই নিজের বাড়ির ছাদে প্রায় ১৬০০ বর্গফুট জায়গায় তিনি গড়ে তুলেছেন একটি ছাদবাগান। সেখানে বিশ্বের ২০টি দেশের ৬০টিরও বেশি জাতের আনার বা বেদানা নিয়মিত ফলছে। 

এটি শুধু শখের কাজ নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের ফল। পুরো ছাদটি তিনি সবুজ রঙের পানি প্রতিরোধী রঙে সাজিয়েছেন, যা একে আরও সুন্দর করে তুলেছে। ড্রোন থেকে দেখলে বোঝা যায়, এটি সাধারণ কোনো ছাদ নয়, এখানে একজন মানুষের রুচি, পরিকল্পনা আর কাজের ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কংক্রিটে ঘেরা শহরের মাঝে এই সবুজ ছাদ তার প্রকৃতিপ্রেমের সরল প্রকাশ।

বেদানা বা আনার আমাদের কাছে শুধু একটি ফল নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্য, ঐতিহ্য আর সৌন্দর্যের ভাবনা। অনেক দিন ধরেই আমাদের মধ্যে একটি ধারণা ছিল যে বাংলাদেশের মাটিতে ভালোমানের বেদানা হয় না। আর হলেও তার বীজ শক্ত হয়, স্বাদও তেমন ভালো নয়। এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন সুজন। 

তিনি দেখিয়েছেন, সঠিক জাত বাছাই, ধৈর্য ধরে পরিচর্যা আর জৈব পদ্ধতিতে চাষ করলে দেশি ও বিদেশি উন্নত জাতের বেদানা আমাদের মাটি ও আবহাওয়ায় ভালোভাবেই ফলতে পারে। তার বাগানে ঝুলে থাকা টকটকে লাল ও রসালো বেদানাগুলো সেই সত্যের স্পষ্ট প্রমাণ।

রাজশাহী যেহেতু বরেন্দ্রভূমির অংশ এবং গ্রীষ্মকালে এখানে তাপমাত্রা অনেক সময় ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে যায়, তাই অনেকে মনে করেন এ এলাকায় ছাদবাগান করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সুজনের বাগান সেই প্রচলিত ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, প্রকৃতি আসলে এতটা কঠোর নয়।

সব মিলিয়ে বলতে হয়, তার ছাদবাগান কেবল ফল উৎপাদনের জায়গা নয়— এটি একটি জীবন্ত গবেষণাগার। এখানে প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ফল যেন একেকটি পরীক্ষার ফলাফল। তিন থেকে চার বছরের ধারাবাহিক পরীক্ষার পর তিনি প্রায় ৮০টির বেশি প্রজাতির আনারের মধ্য থেকে ৬০টির মতো প্রজাতিতে স্থিতিশীল ও ভালো ফলন পেয়েছেন। আমাদের দেশে যেখানে দ্রুত ফল পাওয়ার মানসিকতা প্রবল, সেখানে এই ধৈর্য সত্যিই বিরল। এখানেই সুজন অন্যদের থেকে আলাদা।

তিনি বোঝেন যে কৃষি মানে শুধু বীজ বপন নয়, কৃষি মানে সময় দেওয়া এবং ব্যর্থতাকে শেখার সুযোগ হিসেবে নেওয়া।
তার ছাদবাগানের বিস্তার কেবল আনারে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে রয়েছে অন্তত ৮০ জাতের সাইট্রাস গাছ, যা যেকোনো বাগানপ্রেমীর জন্য বিস্ময়ের বিষয়। 

কাশ্মিরি কেনু, মরক্কোর মাল্টা, সুইট ম্যান্ডারিন, এফোরার ম্যান্ডারিন, রোডে রেড ও ট্রিপল ক্রস ম্যান্ডারিন প্রতিটি জাতই আলাদা স্বাদ, রং ও গুণে অনন্য। এ কারণেই শুধু ‘আনার কিং’ নয়, সুজন এখন ধীরে ধীরে পুরো শহরজুড়ে ‘সাইট্রাস সম্রাট’ নামেও পরিচিত হয়ে উঠছেন। তার সংগ্রহে আছে ১৮ জাতের দুর্লভ লংগান গাছ, যা বাংলাদেশে খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। তার ছাদবাগানে রয়েছে বিশ্বের সেরা কিছু আঙুরের জাত যেমন— ভেলেজ, বাইকুনুর, গোল্ডেন ফিঙ্গার, শাইন মাস্কাট ও মুন ড্রপসের মতো বিরল ও উচ্চমূল্যের আঙুর, যেগুলো স্বাদ ও সৌন্দর্যে একেবারেই আলাদা। এসব ফল প্রমাণ করে, ছাদের ওপরও বিশ্বমানের উৎপাদন সম্ভব।

তার বাগানে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি শুধু শৌখিন কোনো উদ্যোগ নয়। এখানে প্রতিটি গাছের পেছনে আছে জ্ঞান, হিসাব আর আগাম পরিকল্পনা। পুরো ছাদটিই যেন আধুনিক কৃষি ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ। বেদানার পাশাপাশি আহমুদুর রহমান সুজনের ছাদবাগানে রয়েছে সফেদার উন্নত শংকর জাত ‘রোজ সাপোটে’ ও ‘হোয়াইট সাপোটে’। এসব ফল স্বাদে অত্যন্ত মিষ্টি, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং দেখতে আকর্ষণীয়। যেসব ফল সাধারণত উন্নত দেশের বিশেষায়িত বাগানে দেখা যায়, সেগুলো এখন রাজশাহীর একটি ছাদে নিয়মিত ফলছে। এই বাস্তবতা আমাদের চেনা কৃষি ধারণাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

সুজনের সৃজনশীলতার পরিধি এখানেই থেমে নেই। সবশেষ তিনি যুক্ত করেছেন এক অনন্য ‘ছাদপুকুর’ প্রকল্প। ছাদের এক পাশে ‘ছাদপুকুর’ নামে সাজানো এই আয়োজন যেন শহরের বুকে হঠাৎ পাওয়া এক টুকরো জলজ স্বর্গ। 

পুকুরের সামনে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে রঙিন মাছের অবিরাম ছুটে চলা, বিশাল অ্যাকুয়ারিয়ামে জলজ উদ্ভিদ আর নানা রঙের মাছের মিছিল। স্বচ্ছ পানির ভেতর মাছগুলো লুটোপুটি খেলায় মেতে থাকে, যেন কংক্রিটের শহর ভুলে প্রকৃতির নিজস্ব রাজ্যে ঢুকে পড়েছে। ফলের গাছ, পাখির ডাক আর পানির ভেতর মাছের নড়াচড়া মিলিয়ে পুরো ছাদটিই হয়ে উঠেছে একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র।

ব্যাংকের জটিল হিসাব, কঠিন অডিট ফাইল আর দায়িত্বের চাপ সামলে ছুটির দিনে সুজনের ঠিকানা হয়ে ওঠে তার ছাদবাগান। নিজের হাতে লাগানো গাছের নিচে একটি আরাম কেদারায় বসে তিনি যেন অন্য মানুষ। মাথার ওপরে নির্মল অক্সিজেন, চারপাশে পাখির কলতান, পাতার ফাঁক দিয়ে আসা নরম বাতাস— এ পরিবেশেই তিনি পরের কর্মদিবসের জন্য মানসিক শক্তি সঞ্চয় করেন। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, জীবনে আর কীই বা চাওয়া থাকতে পারে।

আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই বিশাল আয়োজন তিনি গড়ে তুলেছেন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি জিও ব্যাগ ব্যবহার করে। শহরের সীমাবদ্ধ জায়গায় কীভাবে সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যায়, তার এক বাস্তব উদাহরণ এটি। 

নান্দনিক নকশায় গড়ে তোলা চার ও পাঁচ তলা মিলিয়ে পুরো ছাদটিকেই তিনি এক স্বপ্নিল বাগানে রূপান্তর করেছেন। নান্দনিক ওয়াল ল্যাম্পের আলোয় রাত নামলেই বাগানটি আলোকিত হয়ে ওঠে আর তখন মনে হয় পুরো বাগানটি শহরের সব ঘুমন্ত মানুষের জন্য অক্সিজেন জোগানোর কাজে নীরবে নিয়োজিত।

রাজশাহীর তীব্র গরমের কথা মাথায় রেখে তিনি আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সংযুক্ত স্বয়ংক্রিয় পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। মাত্র কয়েক মিনিটেই ২৫০টি টব ও বড় ড্রামে পানি পৌঁছে যায়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, পুরো এই স্বয়ংক্রিয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থাটি তিনি গড়ে তুলেছেন মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকার মধ্যে।

এই ছাদবাগানটি দেখে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত হচ্ছেন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষরা, বিশেষ করে যারা অবসর জীবনে কীভাবে সময় কাটাবেন তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। সুজন তাদের সামনে একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেছেন। 

এই বাগান শুধু সময় কাটানোর জায়গা নয়। এখানে কাজ করতে গিয়ে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়, শরীরও সক্রিয় থাকে আর চাইলে বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি হয়। অনেকেই এখন তার কাছ থেকে চারা নিচ্ছেন, পরামর্শ নিচ্ছেন এবং নিজের ছাদে বাগান করার সাহস পাচ্ছেন। নগরায়ণের কারণে আমরা যে পরিমাণ সবুজ হারিয়েছি, তার কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ যদি থাকে, তা হলে ছাদবাগানই হতে পারে সে দায় শোধের একটি পথ। এটি কোনো আইনের বাধ্যবাধকতা নয়, বরং নিজের বিবেকের তাগিদ। আহমুদুর রহমান সুজনের ছাদবাগান মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির কাছ থেকে নেওয়ার পাশাপাশি তাকে কিছু ফিরিয়ে দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব।

এই ছাদবাগান শুধু একজন ব্যাংক কর্মকর্তার শখের গল্প নয়। এটি আমাদের সময়ের জন্য একটি জরুরি বার্তা। উন্নয়ন মানে শুধু বড় বড় স্থাপনা নয়, উন্নয়ন মানে মানুষের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন। আমরা যদি শহরের ছাদকে কেবল কংক্রিটের ভার না ভেবে সবুজের সম্ভাবনা হিসেবে দেখি, তা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া সম্ভব। এই ছাদবাগান তাই অনুপ্রেরণা দেয়, শেখায় এবং আশা জাগায়।

লেখক : শোয়েব সাম্য সিদ্দিক, ব্যাংকার এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।

এফআর


  বিষয়:   সম্পাদকীয়  রাজশাহী  সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা  আহমুদুর রহমান সুজন  ছাদ বাগান 


Loading...
Loading...
- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: