এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইর যুগ। সর্বত্র এর রমরমা ব্যবহার। কোথাও কোথাও মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তির এই কৃত্রিম ক্যারিশমা। নানা খাতে এর সুফলও মিলেছে। কিন্তু ইতিমধ্যে এআইর ব্যবহার কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক সংকটও তৈরি করেছে।
এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিনকে রাত আর রাতকে দিন হিসেবে উপস্থাপন করছে। সত্যকে মিথ্য বা মিথ্যাকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করা হচ্ছে। এতে খোদ সত্যই মিথ্যার সাগরে হারিয়ে যেতে বসেছে।
আর কদিন পর আমাদের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রবল বেগে বইছে নির্বাচনি হাওয়া। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতো ভোটের, জোটের হিসাবের ছক কষছে। কিন্তু এই নির্বাচনি ডামাডোলের মধ্যেই প্রচারে দেখা যাচ্ছে এআইর দৌরাত্ম্য। ভুয়া ভিডিও তৈরি করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা চলছে।
এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার কারণে বেশিরভাগ সময় সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না— এগুলো আসল নাকি নকল। লোকে বলে— সত্যের চেয়ে মিথ্যা দ্রুতগতিতে ছড়ায়। এ ক্ষেত্রেও তাই দেখা যাচ্ছে।
এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে দেশের আনাচে-কানাচে। ছড়িয়ে পড়ছে গুজবের ডালপালা। এ নিয়ে তৈরি হচ্ছে রাজনৈতিক বিরোধ— এই বিরোধ গড়াচ্ছে সহিংসতা ও রক্তপাতের মতো ঘটনাতেও।
দেশের গণমাধ্যমে সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পর্যবেক্ষক মহল। বড় শঙ্কার বিষয় হলো— এআইর দৌরাত্ম্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু এটি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অপ্রতুল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— সম্প্রতি বেশ কয়েকটি এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ব্যাপকমাত্রায় ছড়িয়ে পড়েছে।
এর মধ্যে একটি ভিডিও রয়েছে, যেখানে সেনাবাহিনীর পোশাক পরে এক ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট দলের হয়ে ভোট চাইতে দেখা গেছে। কয়েক দিনেই ভিডিওটি ১০ লাখের বেশি ভিউ হয়েছে। প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন প্রায় ৮৯ হাজার লোক। ভাবা যায়— এআইর শিকার হয়েছে খোদ সেনাবাহিনীও। তা হলে সাধারণ মানুষের অবস্থা কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো— সেনাবাহিনী থেকে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করা হয়েছে; একই সঙ্গে কড়া সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কড়া বার্তার চার দিন পরও সেই ভিডিওটি সরানো হয়নি।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা আছে— নির্বাচনে ভোটারকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে এআই দিয়ে তৈরি মিথ্যা, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল এবং মানহানিকর কোনো কনটেন প্রচার বা শেয়ার করা নিষিদ্ধ। কিন্তু হতাশাজনক হলো— এই আইনের প্রয়োগ আমরা দেখছি না।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নাগরিকদের কাছ থেকে অভিযোগ গ্রহণের জন্য চারটি ই-মেইল ও একটি হটলাইন চালু করা হয়েছে। যা আমাদের কাছে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল মনে হয়েছে। এ ছাড়া বিষয়টি অনেকে জানেনও না যে, কোথায় কীভাবে অভিযোগ দায়ের করতে হবে। আর অভিযোগ জানানোর পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে— সেটিও যৌক্তিক অবস্থান নয়। মূলত ভুয়া ভিডিও রোধ করতে হবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ১২ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন— এআই দিয়ে তৈরি অপতথ্য রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখছি না— আমাদের আরও উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলেছে।
এবারের নির্বাচন নিয়ে দেশের মানুষ অনেক আশা দেখছে। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে— এই স্বপ্ন এখন সবার। কিন্তু অপতথ্য, ভুয়া ভিডিও নির্বাচনি পরিবেশে যেন বিঘ্ন না ঘটায় তা নিশ্চিত করতে হবে এখনই। আর এই কাজে সরকারকে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতন হতে হবে; যেন একটি ভিডিও দেখামাত্রই সঠিক না মনে করে সেটির সত্যতা যাচাই করতে হবে।
এফআর