ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মাধ্যমে নির্বাচন নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ, জল্পনা-কল্পনা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটতে চলেছে- এমন একটি সহজ হিসাব করা যেতেই পারে। সে হিসেবেই দেশের মানুষ এখন নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। অতীতের তিন তিনটি নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। সেসব নির্বাচনের অবাধ ও নিরপেক্ষ চরিত্র ছিল না।
নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সীমাহীন প্রভাব ও ভোট বর্জনের ঘটনা ঘটেছে। মোটকথা নির্বাচনগুলো স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূূলক ছিল না। ‘একদলীয় ভোট’, ‘নিশি রাতের ভোট’, ‘আমি ডামি ভোট’- এসব নামে ডাকা হয়েছে ওইসব নির্বাচনকে। এবারের নির্বাচন নিয়ে মানুুষের আশা-আকাক্সক্ষার অন্ত নেই। আগামী নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে তা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবু এ নির্বাচনকে একটি কাক্সিক্ষত নির্বাচন বলতে হবে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি পাঠাবে জাতীয় সংসদে এবং জনপ্রতিনিধিরা একটি জনবান্ধব ও দায়িত্বশীল সরকার গঠন করবে। আমরা আশাবাদী হতে চাই এই ভেবে যে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা বুঝতে পারবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করবে। জনগণ সরাসরি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। ফলে জনগণ মনে করতে পারে যে, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে গঠিত সরকারটি তাদের নিজেদের সরকার।
তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন নিয়ে জনমনে কোনো সংশয় থাকার কথা নয়। তফসিল ঘোষণা মানে নির্বাচনি ট্রেনের যাত্রা শুরু হয়ে যাওয়া। কিন্তু যাত্রা শুরু হলেও গন্তব্যে পৌঁছা নিয়ে দেখা যাচ্ছে নানা সংশয়। এ সংশয় সৃষ্টির পেছনে দৃশ্যমান কোনো কারণ নেই। তবু কেন এমন শঙ্কা? এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তবে অনেক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও বলছেন নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি নামক রাজনৈতিক দলটিকে নানা বিবেচনায় সাধারণ মানুষ সরকার সমর্থিত রাজনৈতিক দল বলেই মনে করে। এই দলের অনেক নেতা এখনও বলছেন নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। কী কারণে অনেকেই এমন কথা বলছেন সেটিও অস্পষ্ট। এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে একেবারে শঙ্কামুক্ত হতে পারছে না। অতীতে নানা কারণে তফসিল ঘোষণার পরেও ভোটগ্রহণের তারিখ পেছাতে দেখা গেছে।
যুক্তিসংগত ও দৃশ্যমান কোনো কারণ দেখা দিলে নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়াটাকে কেউ অস্বাভাবিক মনে করবে না। কিন্তু অদৃশ্য কারণে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে জনমনে শঙ্কা দেখা দিলে সে শঙ্কা দূর হওয়াটাও কঠিন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সে রকম কোনো অঘটন ঘটবে না বলে মনে করি। আবার প্রত্যাশার বিপরীতে মনের কোণে এক ধরনের শঙ্কাও কাজ করে। আগেই বলেছি এ শঙ্কার পেছনে দৃশ্যমান কোনো কারণ নেই। তবে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর গতিবিধি, তাদের কারও কারও বক্তৃতা-বিবৃতি সাধারণ মানুষকে শঙ্কিত করে।
আর একটি বিষয় হলো, এবার সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিনেই একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রশ্নে এ গণভোট। অতীতে আলাদাভাবে গণভোট হতে দেখা গেছে। এবার একসঙ্গে হচ্ছে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। স্বাভাবিকভাবেই প্রার্থী ও তার সমর্থকরা নিজেদের ভোট নিয়েই ব্যস্ত থাকবেন। ফলে গণভোট একটি গৌণ বিষয়ে পরিণত হয়ে যেতে পারে। এবারের গণভোটের অনেক বিষয় সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। যাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে তারাও এ গণভোটকে জটিল বিষয় বলেই মনে করছেন। কারণ, যে ৪৮টি বিষয়ে গণভোট হবে সেগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করে একটি প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। ফলে ‘হ্যাঁ-ভোট’ মানে একসঙ্গে ৪৮টি বিষয়ে একমত হওয়া। একজন ভোটারের কিছু বিষয়ে ভিন্নমত থাকলেও সেখানে ভিন্নমত দেওয়ার সুযোগ থাকছে না।
ফলে গণভোট নিয়েও এক ধরনের বেকায়দায় পড়ে গেছে সাধারণ মানুষ। সরকার হ্যাঁ-ভোটের পক্ষে ইতিমধ্যেই পরোক্ষ প্রচার শুরু করে দিয়েছে। কিছু রাজনৈতিক দলও হ্যাঁ-ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়া জরুরি। হ্যাঁ বিজয়ী না হলে সংস্কার প্রক্রিয়া মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি বেশকিছুু বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। ফলে তারা গণভোটের পুরো প্যাকেজকে হ্যাঁ বলতে রাজি নন। এমতাবস্থায় জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেও বিএনপি হ্যাঁ-ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের বেকায়দায় পড়ে গেছে।
অন্যদিকে দেশে কিছু বিচ্ছিন্ন ও সহিংস ঘটনা এমনভাবে ঘটেছে যা দেখে মানুষ শঙ্কামুক্ত থাকতে পারছে না। ভোটগ্রহণের তারিখ ঘনিয়ে এলে আরও বেশি সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করছে সচেতন মহল। নির্বাচন কমিশন এসব সহিংস ঘটনাকে আমলে নিচ্ছে না। নির্বাচনের আগে কিছু সহিংস ঘটনা ঘটতে পারে বলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজে মতপ্রকাশ করেছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রার্থীদের নিরাপত্তার জন্য গানম্যান দিয়েছে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। সবমিলে পরিবেশকে সন্তোষজনক বলা চলে না। সরকারের দায়িত্বশীল পদে আসীন ব্যক্তিদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য এ আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করা যায়। তফসিল ঘোষণার পরে একটি দলের শীর্ষ নেতা বিশেষ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পাওয়ায় নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। এর ফলে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে কিছু রাজনৈতিক দল শেষ পর্যন্ত এ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নাও করতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতেও অনেক রাজনৈতিক দল অন্তর্বর্র্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনে নাও আসতে পারে। এসব কিছুর বিবেচনা থেকেই আসন্ন নির্বাচন নিয়ে মানুষ শঙ্কামুক্ত হতে পারছে না। যারা বলছেন নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়ে যেতে পাওে, তাদের কথাকেও উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সাধারণ মানুষ সবসময়ই প্রত্যাশা করে একটি অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক দায়িত্বশীল সরকার গঠিত হোক। তাই তফসিল ঘোষণার পর সবাই এখন নির্বাচনের দিকেই তাকিয়ে আছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, একটি নির্বাচনের মাধ্যমেই গঠিত হয় জনগণের সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাচন ইস্যুতে একটি অস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছিল। তখন থেকেই অনেকের মুখে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। বিচার ও সংস্কার নিয়ে সরকার যে কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছিল তার ব্যাপকতা দেখেও অনেকে নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল। উপদেষ্টাদের এলোপাতাড়ি কথাবার্তায় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে এবং তফসিল অনুযায়ী সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। তারপরও জনমনে শঙ্কা থাকছেই।
পথে-ঘাটে, হোটেল-রেস্তোরাঁয় ও বন্ধুমহলের আলাপচারিতায় নির্বাচন নিয়ে অনেক কথার ফাঁকে যে কথাটি মৃদুস্বরে একবার হলেও উচ্চারিত হয় তা হলো- শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হবে কি? কেন জনমনে এ শঙ্কা, এ সংশয়? জানি এর কোনো উত্তর নেই। তবে এ আশঙ্কা সৃষ্টির দায় সরকার ও রাজনৈতিক দল- উভয়কেই নিতে হবে। জনগণকে শঙ্কামুক্ত রাখার দায়িত্ব সরকারের। সরকার কি সে দায়িত্ব পালন করতে পারছে? ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ওসমান হাদি ও পোশাক কর্মী দিপু চন্দ্র দাসের নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের আতঙ্কিত করেছে। এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুর্বৃত্তরা শাস্তির আওতায় না আসায় শঙ্কা আরও বাড়ছে। অনেকের মুখে নির্বাচনের আগে আরও ‘টার্গেট কিলিং’-এর সম্ভাবনার কথা শুনে দেশের মানুষ ভীত ও শঙ্কিত হচ্ছে। তাই আমরা নির্বাচন নিয়ে আশাবাদী হলেও শঙ্কামুক্ত নই। যেকোনো মূল্যে সরকারকে শঙ্কামুক্ত নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
সময়ের আলো/এনএ